
নিউজ ডেস্ক: রবিবার ভোরে বড়সড় দুর্ঘটনার হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেল আলিপুরদুয়ার-দিল্লিগামী মহানন্দা এক্সপ্রেস। বিহারের আরা স্টেশনের কাছে আচমকাই লাইনচ্যুত হয় ট্রেনটি। ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও এখনও পর্যন্ত কোনও যাত্রীর প্রাণহানি বা গুরুতর আহত হওয়ার খবর মেলেনি। তবে ইঞ্জিন-সহ একাধিক কোচ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রেল পরিষেবায় বড় প্রভাব পড়ে।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৫৪৮৩ নম্বর মহানন্দা এক্সপ্রেস রবিবার ভোর প্রায় ৪টা ১২ মিনিটে আরা স্টেশনে পৌঁছয়। সেখানে নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষে দিল্লির উদ্দেশে ট্রেনটি রওনা দেয়। কিন্তু স্টেশন থেকে মাত্র প্রায় ২০০ মিটার দূরেই ঘটে বিপত্তি। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, দিল্লিমুখী লাইনে যাওয়ার পরিবর্তে ট্রেনটি ভুল করে সাসারামমুখী লাইনে ঢুকে পড়ে। এরপরই ইঞ্জিন-সহ ট্রেনের কয়েকটি অংশ লাইনচ্যুত হয়।
ঘটনার আকস্মিকতায় ট্রেনের ভিতরে থাকা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যদিও বড় কোনও হতাহতের ঘটনা না ঘটায় আপাতত স্বস্তি রেলের। প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় ইঞ্জিন, SLR এবং H1 কোচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রেলের তরফে জানানো হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সীমিত এবং এখনও পর্যন্ত কোনও প্রাণহানির খবর নেই।
তবে কী ভাবে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন নির্ধারিত দিল্লিমুখী লাইনের পরিবর্তে অন্য লাইনে ঢুকে গেল, তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে। প্রাথমিক ভাবে সিগন্যাল সংক্রান্ত ত্রুটির সম্ভাবনা সামনে এসেছে। তবে এটিই দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। সিগন্যাল ব্যবস্থা, রুট সেটিং এবং স্টেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরই ঘটনাস্থলে পৌঁছন রেলের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা। দানাপুর রেল বিভাগের DRM বিনোদ কুমার-সহ ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের আধিকারিকরা দ্রুত আরা স্টেশনের কাছে পৌঁছে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। শুরু হয় লাইনচ্যুত কোচ সরানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত ট্র্যাক মেরামতির কাজ। একইসঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করার জন্য প্রাথমিক তদন্তও শুরু হয়।
ঘটনার সরাসরি প্রভাব পড়ে দিল্লি-হাওড়া রেলপথে। গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় একাধিক ট্রেনকে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় দেরিতে চলতে হয়েছে। বিভিন্ন স্টেশনে বেশ কিছু ট্রেন আটকে পড়ে। বন্দে ভারত, বিভূতি, গান্ধীধাম এবং ক্যাপিটাল এক্সপ্রেস-সহ একাধিক ট্রেনের পরিষেবায় এর প্রভাব পড়েছে বলে রেল সূত্রে জানা গিয়েছে।
ফলে রবিবার সকাল থেকেই যাত্রীদের মধ্যে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। কখন ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন বহু যাত্রী। ব্যস্ত দিল্লি-হাওড়া রুটে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে রেলকর্মীদের দ্রুত তৎপর হতে হয়।
এর মধ্যেই প্রশাসনিক স্তরেও পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আরা স্টেশনের ম্যানেজার এন কে রাইকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে খবর। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে স্টেশন পরিচালনায় কোনও গাফিলতি বা দায়িত্বে ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার জন্য নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তি বা ব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়নি।
রেলের তরফে জানানো হয়েছে, লাইনচ্যুত কোচ ও অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সরানোর কাজ দ্রুত শুরু করা হয়। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামতির কাজও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিষেবা স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করেন রেলকর্মীরা।
এই ঘটনায় বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে রেলের সিগন্যালিং এবং রুট সেটিং ব্যবস্থা নিয়ে। একটি ট্রেন কোন লাইনে যাবে, সেই সিদ্ধান্তে সিগন্যালিং ব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে কোনও প্রযুক্তিগত ত্রুটি হয়েছিল, নাকি মানবিক ভুলের কারণে ট্রেন ভুল লাইনে ঢুকে পড়েছিল—তা এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়।
একই সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে ট্রেনটি স্টেশন ছাড়ার আগে সংশ্লিষ্ট রুট সঠিক ভাবে সেট করা হয়েছিল কি না। সিগন্যালের নির্দেশ এবং ট্রেনের গতিপথের মধ্যে কোনও অসঙ্গতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে।
সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয়, এত বড় বিপত্তির পরও প্রাণহানি বা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু সামান্য এদিক-ওদিক হলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিতে পারত বলে আশঙ্কা। যাত্রীবাহী ট্রেনটি ভুল লাইনে ঢুকে পড়ার পর লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় তাই স্বাভাবিক ভাবেই রেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এখন নজর তদন্তের রিপোর্টের দিকে। সিগন্যালের গাফিলতি, রুট সেটিংয়ে ভুল, নাকি অন্য কোনও প্রযুক্তিগত বা মানবিক ত্রুটি—কোন কারণে মহানন্দা এক্সপ্রেস ভুল লাইনে ঢুকে লাইনচ্যুত হল, সেই উত্তরই খুঁজছে রেল। তদন্ত শেষ হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ আরও স্পষ্ট হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments