
নিউজ ডেস্ক: গঙ্গার জলস্তর ফের ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় মালদহের মানিকচকে তৈরি হয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। নদীর জল ইতিমধ্যেই চরম বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। তার মধ্যেই উত্তরচণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার কেশরপুরে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় হু হু করে জল ঢুকতে শুরু করেছে বিস্তীর্ণ এলাকায়। একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় কার্যত জলবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে খবর, মানিকচকের কেশরপুর এলাকায় বাঁধ ভাঙার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। গঙ্গার জল ঢুকে পড়েছে আশপাশের একাধিক গ্রামে। দুর্লভটোলা, ভুবনটোলা, কেদারটোলা, মানিকনগর-সহ ২৫টিরও বেশি গ্রাম বর্তমানে জলমগ্ন। বহু বাড়িঘরেও ঢুকে পড়েছে জল। কোথাও রাস্তাঘাট জলের তলায়, কোথাও আবার বসতবাড়ির চারপাশে শুধুই জল।
সব মিলিয়ে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ জলবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। অনেক পরিবার বাড়ির ভিতরেই আটকে রয়েছেন। আবার বেশ কিছু পরিবার অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গা কিংবা বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়েছেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার এবং ত্রাণকাজ শুরু করা হয়েছে।
এর মধ্যেই নতুন করে চিন্তা বাড়াচ্ছে বৃষ্টি। বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গার জলস্তরও ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। ফলে নদী তীরবর্তী এলাকায় তৈরি হয়েছে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা। শুধু প্লাবন নয়, নদীভাঙনও শুরু হওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। নদীর জল বাড়তে থাকলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি বসতভিটে এবং কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই মানিকচক এলাকায় প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। খোলা হয়েছে ৭টি ত্রাণ শিবির। বাঁধের উপর আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৪০০টি পরিবারের কাছে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জলবন্দি বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তবে উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে প্রশাসনের সামনে রয়েছে আরও একটি সমস্যা। অনেক বাসিন্দাই এখনও নিজেদের বাড়ি ছেড়ে যেতে চাইছেন না। দীর্ঘদিনের বসতভিটে ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়ার বিষয়ে তাঁদের মধ্যে অনীহা রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে কী ভাবে দ্রুত তাঁদের নিরাপদ জায়গায় সরানো হবে, তা নিয়েও প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন।
প্রশাসনের আশঙ্কা, আগামী সময়ে গঙ্গার জলস্তর আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সেই কথা মাথায় রেখে প্রয়োজন হলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানোর প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে। জলবন্দি মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তরের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
মানিকচকেই থেকে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরা এবং স্থানীয় প্রশাসনের আধিকারিকেরা। নদীর জলস্তর, বাঁধের পরিস্থিতি এবং প্লাবিত এলাকাগুলির অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকা নদীর একেবারে কাছাকাছি, সেগুলিতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
গঙ্গার জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরপর নতুন গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় স্বাভাবিক জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত। বহু জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। জলবন্দি বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন খাবার, পানীয় জল এবং নিরাপদ আশ্রয়। দীর্ঘক্ষণ জলমগ্ন থাকলে বিদ্যুৎ এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়েও সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে নদীভাঙনের আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। গঙ্গার স্রোত বাড়লে নদীর পাড়ের মাটি আলগা হয়ে নতুন করে ভাঙন দেখা দিতে পারে। ফলে ইতিমধ্যেই প্লাবনের মুখে পড়া গ্রামগুলির পাশাপাশি নদী তীরবর্তী আরও বেশ কিছু এলাকাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—গঙ্গার জলস্তর আর কতটা বাড়বে? জল যদি ফের বাড়তে থাকে, তাহলে ইতিমধ্যেই প্লাবিত এলাকাগুলির পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ সকলেই।
মালদহের মানিকচকে তাই এখন একটাই ছবি—জলের তলায় বিস্তীর্ণ এলাকা, ঘরবন্দি হাজার হাজার মানুষ, বাঁধের উপর আশ্রয় নেওয়া পরিবার এবং সামনে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা। গঙ্গার এই ভয়াল রূপের সঙ্গে আপাতত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments