Homeপুরুলিয়াপুরুলিয়ার মাটির নীচে বিরল খনিজের ভাণ্ডার, শিল্পের সম্ভাবনার সঙ্গে পরিবেশ নিয়ে সতর্কবার্তা

পুরুলিয়ার মাটির নীচে বিরল খনিজের ভাণ্ডার, শিল্পের সম্ভাবনার সঙ্গে পরিবেশ নিয়ে সতর্কবার্তা

নিউজ ডেস্ক; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গুপ্তধন’ গল্পে সন্ন্যাসীর দেওয়া সাঙ্কেতিক চিহ্ন অনুসরণ করে গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছিলেন হরিহর। পুরুলিয়ার মাটির নীচে বিরল
resizeplus_resizeplus_images (5)

নিউজ ডেস্ক; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গুপ্তধন’ গল্পে সন্ন্যাসীর দেওয়া সাঙ্কেতিক চিহ্ন অনুসরণ করে গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছিলেন হরিহর। পুরুলিয়ার মাটির নীচে বিরল খনিজের সন্ধান পাওয়ার ঘটনাতেও যেন সেই গল্পেরই ছায়া। তবে এ গুপ্তধন কোনও কল্পকাহিনির নয়। ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে উত্তর পুরুলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় মাটির নীচে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান একাধিক বিরল খনিজের সম্ভাবনা। এই আবিষ্কারকে ঘিরে যেমন নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান এবং রাজস্ব বৃদ্ধির আশা তৈরি হয়েছে, তেমনই খনন শুরু হলে পরিবেশের উপর তার প্রভাব নিয়েও সতর্ক থাকার দাবি উঠেছে।

জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বা জিএসআই এবং অ্যাটমিক মিনারেলস ডিরেক্টরেট বা এএমডি-র যৌথ ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে এই খনিজ সম্পদের সন্ধান মিলেছে। ঝাড়খণ্ড সীমানা লাগোয়া ঝালদা-২ ব্লকের বেলামু পাহাড় থেকে শুরু করে নওয়াহাতু, কালাপাথর, রঘুডি, রঘুনাথপুর হয়ে বাঁকুড়ার ছাতনা এবং পুরুলিয়ার কাশীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। উত্তর পুরুলিয়ার চ্যুতিরেখা বা শিয়ার জ়োন বরাবর মাটির নীচে সঞ্চিত রয়েছে বিভিন্ন বিরল খনিজ—এমনই তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।

দক্ষিণ পুরুলিয়ার চ্যুতিরেখা এলাকাতেও খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তবে সেই সংক্রান্ত রিপোর্ট এখনও প্রকাশিত হয়নি। ফলে আপাতত উত্তর পুরুলিয়ার খনিজ ভাণ্ডার নিয়েই আলোচনা বেশি। ভূতাত্ত্বিকদের একাংশের মতে, পূর্ব ভারতের খনিজ মানচিত্রে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যের প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় সরকার সংসদে জানায়, পুরুলিয়ার একটি ব্লকে ১.৭৮ লক্ষ টন আকরিকের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। সেই আকরিকে প্রায় ০.৪ শতাংশ সিজিয়াম, ০.৩ শতাংশ লিথিয়াম এবং ০.০১ শতাংশ রুবিডিয়াম রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই ওই এলাকাকে নিলামের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। রেলপথের কাছাকাছি অবস্থান এবং রাঁচি বিমানবন্দরের তুলনামূলক নৈকট্য এই প্রকল্পকে অর্থনৈতিক দিক থেকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

শুধু একটি ব্লক নয়, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া মিলিয়ে আরও ১০টি বিরল খনিজ প্রকল্প বর্তমানে গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। জিএসআই ইতিমধ্যেই জি-২ স্তরের উন্নত অনুসন্ধান শুরু করেছে। অর্থাৎ, প্রাথমিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের পর আরও বিস্তারিত ভাবে খনিজের অবস্থান, পরিমাণ এবং গুণমান নির্ধারণের কাজ চলছে। এই অনুসন্ধান শেষ হলে কোন এলাকায় কতটা খনিজ রয়েছে এবং বাণিজ্যিক ভাবে উত্তোলন কতটা সম্ভব, তা আরও স্পষ্ট হবে।

পুরুলিয়ার কালাপাথর-রঘুডি অঞ্চলে ল্যান্থানাইড এবং ইট্রিয়াম-সহ মোট ১৬টি ধাতুর উপস্থিতির কথা জানা গিয়েছে। ওই এলাকায় প্রায় ৬.৭০ লক্ষ টন রেয়ার আর্থ উপাদান থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দু’টি চ্যুতিরেখা বরাবর অ্যালকালাইন কার্বোনাটাইট পাথরের স্তর থেকেও লিথিয়াম, ফসফরাস এবং মোনাজাইট প্লেসার্স পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞেরা।

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে এই খনিজগুলির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ এবং বিভিন্ন শক্তি সঞ্চয়কারী ব্যাটারি তৈরিতে লিথিয়াম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। সিজিয়াম ব্যবহার করা হয় পারমাণবিক গবেষণা, জিপিএস ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট ধরনের উচ্চপ্রযুক্তি সরঞ্জামে। রেয়ার আর্থ উপাদান ব্যবহৃত হয় ইলেকট্রনিক্স, প্রতিরক্ষা, শক্তি সঞ্চয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আধুনিক শিল্পের নানা ক্ষেত্রে। ফলে পুরুলিয়ায় এই খনিজের সন্ধান দেশের আমদানি-নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক এবং পরিবেশকর্মী বিশ্বজিৎ বেরা মনে করছেন, খনিজের নিলাম ও পরবর্তী খনন শুরু হলে রাজ্যে নতুন শিল্পের সম্ভাবনা তৈরি হবে। তাঁর মতে, স্থানীয় ভাবে কর্মসংস্থান বাড়তে পারে, রাজস্ব বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বিদেশ থেকে বিরল খনিজ আমদানির উপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

কারণ, বিরল খনিজ উত্তোলনের ক্ষেত্রে খনন, আকরিক প্রক্রিয়াকরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া খনন শুরু হলে মাটি, জল এবং বাতাস দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। স্থানীয় কৃষিজমি, জলাধার, বনাঞ্চল এবং মানুষের বসবাসের উপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই পরিবেশগত সমীক্ষা, স্থানীয় মানুষের মতামত এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেই প্রকল্প এগোনো উচিত বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা।

ঝালদার বাসিন্দা তথা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের গবেষক পড়ুয়া প্রশান্ত মণ্ডল এই আবিষ্কারকে গবেষক ও স্থানীয় শিক্ষিত যুবসমাজের জন্য আশার খবর বলে মনে করছেন। তাঁর বক্তব্য, পুরুলিয়ায় বিরল খনিজের সন্ধান মেলার ফলে ভূগোল, ভূতত্ত্ব, খনিবিদ্যা এবং পরিবেশবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে গবেষণার সুযোগ বাড়তে পারে। স্থানীয় ছেলেমেয়েদের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে তাঁর।

তবে খনিজ সম্পদকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন পরিকল্পনা করার সময় স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। খনন প্রকল্প হলে জমি, জল, জীবিকা এবং পরিবেশের উপর সম্ভাব্য প্রভাব আগে থেকে মূল্যায়ন করা জরুরি। শিল্পের সুফল যেন শুধু বাইরের সংস্থা বা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, স্থানীয় বাসিন্দারাও যেন তার অংশীদার হন—সেই দাবিও উঠছে।

পুরুলিয়ার মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা এই বিরল খনিজ ভাণ্ডার আগামী দিনে রাজ্যের শিল্প মানচিত্রে নতুন অধ্যায় খুলতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে নিলাম, অনুসন্ধান, খনন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। উন্নয়ন এবং পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই এই ‘গুপ্তধন’কে কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved