
নিউজ ডেস্ক; কারখানার ধোঁয়া, পাথরের গুঁড়ো আর শিল্পবর্জ্যের দূষণে এবার প্রাণঘাতী সিলিকোসিসের আতঙ্ক ছড়িয়েছে পুরুলিয়ায়। জেলার একাধিক শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছে দুটি পরিবেশ ও বিজ্ঞান সংগঠন। তাদের দাবি, কোয়ার্টজ় গুঁড়ো, পাথর খাদান, সিমেন্ট এবং স্পঞ্জ আয়রন কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। শুধু অসুস্থতার অভিযোগ নয়, গত কয়েক বছরে একাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে।
‘ব্রেক থ্রু সায়েন্স সোসাইটি’ এবং ‘রঘুনাথপুর মহকুমা দূষণ বিরোধী ও প্রাণ প্রকৃতি রক্ষা মঞ্চ’-এর দাবি, নিতুড়িয়া ব্লকেই গত তিন বছরে পাথর খাদান, সিমেন্ট ও স্পঞ্জ আয়রন কারখানায় কর্মরত অন্তত ১৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নিতুড়িয়ার দিঘা এলাকায় কোয়ার্টজ় গুঁড়ো তৈরির কারখানায় কাজ করতেন এমন ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর মিলেছে বলে সংগঠনগুলির দাবি। মৃতদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট-সহ একই ধরনের উপসর্গ দেখা গিয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সংগঠনগুলির তরফে স্বদেশপ্রিয় মাহাতো জানান, সম্প্রতি আরও দু’টি মৃত্যুর ঘটনা তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাঁর দাবি, গত ১৯ অগস্ট ইনানপুর গ্রামের কানাই বাউড়ির মৃত্যু হয়। এর কয়েক দিন পর, ২৩ অগস্ট বিন্দুইডি গ্রামের অক্ষয় দাসের মৃত্যু হয়েছে। অক্ষয় দাস পেশায় শ্রমিক ছিলেন এবং শিল্পাঞ্চলে কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে সংগঠনগুলির দাবি। তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরিবারের কাছেও স্পষ্ট তথ্য নেই বলে অভিযোগ।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই গত ২১ অগস্ট পুরুলিয়া দেবেন মাহাতো সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে সিলিকোসিস ডিটেকশন বোর্ড বসেছিল। সেখানে জেলার বিভিন্ন এলাকার ২১ জন শ্রমিক হাজির হয়েছিলেন বলে সংগঠনগুলির দাবি। তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও সেই বোর্ডের রিপোর্ট এখনও প্রকাশ্যে আসেনি বলে অভিযোগ। সংগঠনগুলির দাবি, ওই ২১ জনের মধ্যে ১৬ জনের শরীরে সিলিকোসিস ধরা পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অক্ষয় দাসের মৃত্যুর ঘটনা। সংগঠনগুলির বক্তব্য, ২১ অগস্ট সিলিকোসিস শনাক্তকরণ বোর্ডের সামনে হাজির হয়েছিলেন অক্ষয়। তার মাত্র দু’দিন পরেই তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর পরিবারকে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানানো হয়নি বলে অভিযোগ। স্বদেশপ্রিয় মাহাতোর বক্তব্য, ওই শ্রমিকের শারীরিক উপসর্গ এবং কর্মক্ষেত্রের ইতিহাস বিবেচনা করে তাঁদের আশঙ্কা, সিলিকোসিসের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। যদিও মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি ও সরকারি রিপোর্ট প্রয়োজন।
সিলিকোসিস মূলত দীর্ঘদিন ধরে সিলিকা ধুলোর সংস্পর্শে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুতর ফুসফুসের রোগ। পাথর কাটা, পাথর গুঁড়ো করা, কোয়ার্টজ় প্রক্রিয়াকরণ এবং ধুলিকণাযুক্ত বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে কাজ করা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে সূক্ষ্ম ধুলিকণা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করলে ধীরে ধীরে ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে শ্বাসকষ্ট-সহ নানা জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পুরুলিয়ার ক্ষেত্রে তাই শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন গ্রামের শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংগঠনগুলির দাবি, নিতুড়িয়া, সাঁতুড়ি, রঘুনাথপুর, পাড়া, পুরুলিয়া মফস্সল, সাঁওতালডিহি-সহ একাধিক এলাকায় বিভিন্ন ধরনের শিল্প ও পাথর-ভিত্তিক কারখানা রয়েছে। সেই সব শিল্পাঞ্চলের আশপাশের গ্রামগুলিতে দূষণের প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ। বলরামপুর, বরাবাজার, কেন্দা এবং বান্দোয়ান থানা এলাকার কয়েকটি জায়গাতেও কোয়ার্টজ়-সংক্রান্ত কাজ ও শিল্পদূষণের কারণে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বাড়ছে বলে সংগঠনগুলির দাবি।
পরিবেশকর্মীদের বক্তব্য, শুধু কারখানার ভিতরে কর্মরত শ্রমিকরাই নন, শিল্পাঞ্চলের আশপাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষও ধুলিকণা ও দূষণের প্রভাবে সমস্যায় পড়তে পারেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ধুলোর সংস্পর্শে থাকা শ্রমিকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পৌঁছন। তার আগেই দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন।
এই পরিস্থিতিতে সংগঠন দু’টি একাধিক দাবি সামনে এনেছে। তাদের দাবি, সিলিকোসিস ডিটেকশন বোর্ডের রিপোর্ট দ্রুত প্রকাশ করতে হবে। আক্রান্ত শ্রমিকদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তাঁদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দূষণ ছড়াচ্ছে এমন কারখানাগুলির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ করতে হবে। পাশাপাশি যে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিবেশগত বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া চলছে বলে অভিযোগ, তাদের বিষয়টিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
মৃত শ্রমিকদের মৃত্যুর কারণ নিয়েও তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনগুলি। তাদের বক্তব্য, পর পর একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু হলে বিষয়টি শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত নয়। কোথায় তাঁরা কাজ করতেন, কত দিন ধরে ওই পরিবেশে ছিলেন, তাঁদের শারীরিক অসুস্থতার ধরন কী ছিল এবং মৃত্যুর আগে তাঁদের কী ধরনের চিকিৎসা হয়েছিল— সব কিছু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এই সমস্ত দাবি নিয়ে বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেয় সংগঠন দু’টি। পুরুলিয়ার জেলাশাসক সুধীর কণ্ঠম জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে কিছু দাবি এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিলিকোসিস ডিটেকশন বোর্ডে উপস্থিত কয়েক জন শ্রমিকের শরীরে সিলিকোসিস শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য দপ্তরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অশোক বিশ্বাসও জানিয়েছেন, নিয়মিত ভাবে সিলিকোসিস শনাক্তকরণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, প্রতি দু’মাস অন্তর সিলিকোসিস ডিটেকশন বোর্ড বসবে। কয়েক জন শ্রমিকের সিলিকোসিসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তাঁদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে শ্রম দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের এই আশ্বাসের পরেও অবশ্য প্রশ্ন থাকছে শিল্পাঞ্চলের দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। কারখানাগুলির উৎপাদন চালানোর পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে যে সমস্ত শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে পাথর, কোয়ার্টজ় বা অন্যান্য ধুলিকণাযুক্ত পরিবেশে কাজ করছেন, তাঁদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও নজরদারি প্রয়োজন।
এক দিকে শিল্পের বিস্তার, অন্য দিকে দূষণের অভিযোগ— পুরুলিয়ায় সেই পুরনো দ্বন্দ্বের মধ্যেই এবার সামনে এসেছে সিলিকোসিসের আশঙ্কা। ২১ জন শ্রমিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট, তাঁদের মধ্যে আক্রান্তদের চিকিৎসা এবং সাম্প্রতিক মৃত্যুগুলির প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হলেই পরিস্থিতির পূর্ণ ছবি সামনে আসবে। আপাতত শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগের প্রধান কারণ, দূষণের প্রভাব কতটা গভীর এবং তার মূল্য কতটা দিতে হচ্ছে মানুষকে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments