
নিউজ ডেস্ক; ভুয়ো নথি ব্যবহার করে চিকিৎসা এবং অস্ত্রোপচার চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে আট বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ দিল বারাসত আদালত। বুধবার বারাসত আদালতের অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জাজ তৃতীয় কোর্টের বিচারক বজলুর রহমানকে এই সাজা শোনান। একই সঙ্গে তাঁকে ৩ লক্ষ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে আদালত নির্দেশ দিয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, বজলুর রহমান নিজেকে স্পাইন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা করতেন। শুধু রোগী দেখা নয়, মেরুদণ্ড এবং মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারও করতেন তিনি। অভিযোগ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের বৈধ যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও জাল শংসাপত্র এবং অন্য চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে এই কাজ চালিয়ে যেতেন বজলুর।
সরকারি আইনজীবীর দাবি, বজলুর রহমান আদ্যোপান্ত একজন ভুয়ো চিকিৎসক। তাঁর ভুল চিকিৎসার কারণে বিভিন্ন জেলার শতাধিক রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলেও আদালতে দাবি করা হয়েছে। যদিও এই বৃহত্তর অভিযোগগুলির সবক’টির বিচার এই মামলায় হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে বারাসতের একটি নির্দিষ্ট রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাতেই বুধবার তাঁকে সাজা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, কলকাতার চিনার পার্ক সংলগ্ন এলাকায় কয়েক বছর আগে ‘আরিয়ান হাসপাতাল’ নামে একটি নার্সিংহোম খুলেছিলেন বজলুর। সেখানে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করতেন তিনি। অভিযোগ, ওই নার্সিংহোমে ভুল চিকিৎসার কারণে প্রায় ১৫০ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ জমা পড়েছিল। এ ছাড়াও বর্ধমান, আসানসোল-সহ বিভিন্ন জেলার একাধিক নার্সিংহোমে গিয়ে অস্ত্রোপচার করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, বজলুর নিজেকে মেরুদণ্ডের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ বলে পরিচয় দিতেন। রোগীদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য চিকিৎসকের মতো পোশাক, জাল শংসাপত্র এবং অন্য চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করতেন। এমনকি যে চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করা হত, তাঁদের কেউ মৃত, কেউ আবার চিকিৎসা পেশা থেকে সরে গিয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি পুলিশের।
এই মামলার সূত্রপাত ২০২০ সালে। বারাসতের নপাড়ার বাসিন্দা নিখিল চন্দ্র রায়ের অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, বজলুরের ভুল অস্ত্রোপচারের কারণেই নিখিলের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের মেয়ে অর্চনা রায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে বারাসত থানার পুলিশ। পরে বজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তের সময় তাঁর বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুনের অভিযোগে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা, জাল নথি ব্যবহার করার অভিযোগে ৪৭১ ধারা এবং প্রতারণার অভিযোগে ৪২০ ধারায় মামলা রুজু করা হয়। তদন্তকারীরা তাঁর ব্যবহৃত নথি, চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অস্ত্রোপচারের সঙ্গে যুক্ত তথ্য খতিয়ে দেখেন। সেই তদন্তের ভিত্তিতেই মামলাটি আদালতে গড়ায়।
গত সোমবার এই মামলায় বজলুর রহমানকে দোষী সাব্যস্ত করেন বিচারক। বুধবার সাজা ঘোষণা করা হয়। আদালতের এই রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছে মৃত রোগীর পরিবার। তাঁদের বক্তব্য, নিখিলের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন। আদালতের রায় অন্তত তাঁদের সেই লড়াইয়ে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।
মামলার সরকারি আইনজীবী সন্দীপ ভট্টাচার্য আদালতে দাবি করেন, বজলুর রহমান এক জন ভুয়ো চিকিৎসক এবং তাঁর চিকিৎসার কারণে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, চিকিৎসার মতো সংবেদনশীল পেশায় জাল নথি ব্যবহার করে মানুষের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। আদালতের এই সাজা ভবিষ্যতে এমন অপরাধের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলেও মনে করছেন তিনি।
তদন্তকারীদের অনুমান, বজলুর একা এই কাজ চালাতেন না। জাল শংসাপত্র তৈরি, চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর সংগ্রহ, নার্সিংহোমে অস্ত্রোপচারের সুযোগ পাওয়া এবং রোগী জোগাড়ের পিছনে আরও কেউ যুক্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর সঙ্গে যুক্ত নার্সিংহোম, চিকিৎসাকর্মী এবং দালালচক্রের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশ আধিকারিকেরা।
এই ঘটনা সামনে আসার পর চিকিৎসা করানোর আগে রোগীদের আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা। কোনও চিকিৎসকের ডিগ্রি, রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা পরিষেবার বৈধতা যাচাই না করে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জটিল অস্ত্রোপচারের আগে চিকিৎসকের যোগ্যতা, হাসপাতালের অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করা জরুরি।
বারাসত আদালতের রায় আপাতত একটি নির্দিষ্ট মামলায় বজলুর রহমানের বিরুদ্ধে দোষ প্রমাণ করেছে। তবে বিভিন্ন জেলার রোগীমৃত্যুর অভিযোগগুলি নিয়ে তদন্ত কতদূর এগোয়, আরও কোনও মামলা হয় কি না এবং এই চক্রের সঙ্গে অন্য কারা জড়িত, এখন সেদিকেই নজর তদন্তকারীদের।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments