Homeপশ্চিম মেদিনীপুরখড়্গপুরএসি কামরায় টিকিট কেটে যাত্রী সেজে চুরি! খড়্গপুরে গ্রেপ্তার তিন ‘পেশাদার’ চোর

এসি কামরায় টিকিট কেটে যাত্রী সেজে চুরি! খড়্গপুরে গ্রেপ্তার তিন ‘পেশাদার’ চোর

নিউজ ডেস্ক; রেলপুলিশের নজর এড়াতে অভিনব কৌশল নিয়েছিল তারা। সাধারণ চোরের মতো স্টেশন চত্বরে ঘোরাঘুরি নয়, বরং ঝকঝকে পোশাকে বৈধ
resizeplus_AI চিত্র (1)

নিউজ ডেস্ক; রেলপুলিশের নজর এড়াতে অভিনব কৌশল নিয়েছিল তারা। সাধারণ চোরের মতো স্টেশন চত্বরে ঘোরাঘুরি নয়, বরং ঝকঝকে পোশাকে বৈধ টিকিট কেটে দূরপাল্লার এক্সপ্রেস এবং সুপারফাস্ট ট্রেনের এসি-টু টায়ারে উঠে পড়ত তিন জন। যাত্রীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রথমে নজর রাখত কে কোথায় ব্যাগ রেখেছেন, কার কাছে দামি মোবাইল, ল্যাপটপ, গয়না বা নগদ টাকা রয়েছে। তার পরে সুযোগ বুঝে চেন কেটে ব্যাগ সরিয়ে ফেলত। কখনও আবার যাত্রী ওঠানামার সময় ভিড়ের সুযোগ নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে গা-ঢাকা দিত। খড়্গপুর রেলপুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিন যুবককে জেরা করে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে বলে দাবি তদন্তকারীদের।

বুধবার খড়্গপুর রেলপুলিশ মহম্মদ মজিদ চাঁদ, মহম্মদ গিয়াসউদ্দিন এবং পারভেজ আখতার নামে তিন জনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, তিন জনই ওডিশার সুন্দরগড় জেলার রৌরকেল্লা শহরের বাসিন্দা। তাঁদের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, দীর্ঘদিন ধরে দূরপাল্লার ট্রেনকে চুরির জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছিল এই দল। ওডিশার রৌরকেল্লা, সম্বলপুরের পাশাপাশি খড়্গপুর এবং আশপাশের রেলপথেও তাঁদের বিরুদ্ধে চুরি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে।

খড়্গপুরের রেলওয়ে পুলিশ সুপার জয়ন্ত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ধৃতদের জেরা করে একাধিক চুরি-ছিনতাইয়ের কথা জানা গিয়েছে। পুলিশ সুপারের বক্তব্য অনুযায়ী, খড়্গপুর, রৌরকেল্লা, সম্বলপুর-সহ বিভিন্ন এলাকায় হিরে, সোনা, মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপ চুরির কথা স্বীকার করেছে অভিযুক্তেরা। ধৃতদের বাড়িতে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি এই চক্রের সঙ্গে আরও কারা যুক্ত, কোথা থেকে তারা কাজ চালাত এবং চুরি করা সামগ্রী কোথায় পাচার করা হত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রেলপুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতেরা সাধারণত এসি-টু টায়ার কামরাকেই বেছে নিত। কারণ, এই কামরায় যাতায়াতকারী যাত্রীদের কাছে তুলনামূলক ভাবে বেশি দামের সামগ্রী থাকার সম্ভাবনা থাকে। যাত্রীরা অনেক সময় ব্যাগ সিটের নীচে, মাথার উপরের লাগেজ র‌্যাকে কিংবা বার্থের পাশে চেন দিয়ে বেঁধে রাখেন। অভিযুক্তেরা প্রথমে সেই ব্যবস্থাই খুঁটিয়ে দেখত। কোন ব্যাগে কী ধরনের তালা বা চেন রয়েছে, কী ভাবে সেটি দ্রুত কাটা যায় এবং কোন সময় যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি অসতর্ক থাকেন—সব কিছু আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করত তারা।

তদন্তকারীদের দাবি, ধৃতদের সঙ্গে চেন কাটার যন্ত্রও থাকত। যাত্রীরা ঘুমিয়ে পড়লে কিংবা মোবাইলে ব্যস্ত থাকলে একজন ব্যাগের কাছে যেত, অন্য জন সেটি সরিয়ে তৃতীয় জনের হাতে তুলে দিত। পরে নির্দিষ্ট কোনও স্টেশনে নেমে তিন জন আলাদা হয়ে যেত। অনেক সময় ট্রেন স্টেশনে দাঁড়ানোর পরে যাত্রী ওঠানামার ভিড়কেও কাজে লাগানো হত। দরজার কাছে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থেকে ব্যাগ, হার বা মোবাইল ছিনিয়ে দ্রুত প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়ত তারা।

বৈধ টিকিট থাকার কারণে তাঁদের আচরণ নিয়ে সহজে সন্দেহ করতেন না সহযাত্রী বা ট্রেনের কর্মীরা। পুলিশের মতে, এই বিষয়টিই ছিল অভিযুক্তদের সবচেয়ে বড় সুবিধা। যাত্রী সেজে এসি কামরায় ওঠায় তাঁদের দেখে সাধারণ চোর বলে মনে হত না। ফলে অপারেশন শেষ করে নেমে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁরা প্রায় নির্বিঘ্নেই চলাফেরা করতে পারত।

শেষবার ‘ক্রিয়াযোগ’ এক্সপ্রেসে ল্যাপটপ চুরির অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে এই তিন জনের সন্ধান পায় রেলপুলিশ। শরদ আচার্য নামে এক যাত্রী ট্রেন থেকে ল্যাপটপ চুরি যাওয়ার অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। বিভিন্ন সূত্র খতিয়ে দেখে অভিযুক্তদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। পরে ল্যাপটপ-সহ তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার হওয়া সামগ্রী তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

তবে এই গ্রেপ্তারই সাম্প্রতিক সময়ে খড়্গপুর রেলপুলিশের একমাত্র সাফল্য নয়। গত কয়েক দিনে ট্রেন ও স্টেশন চত্বরে ছিনতাইয়ের অভিযোগে আরও কয়েক জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত সোমবার শিশুকে কোলে নিয়ে ট্রেন এবং স্টেশনে ছিনতাই করার অভিযোগে এক মহিলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর কাছ থেকে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ এবং নগদ টাকা উদ্ধার হয়। তদন্তকারীদের বক্তব্য, কোলে শিশু থাকা অবস্থায় কোনও মহিলা ছিনতাই করতে পারেন—এমনটা সাধারণত যাত্রীরা ভাবেন না। সেই মানসিকতার সুযোগ নিয়েই ওই মহিলা কাজ করতেন বলে অভিযোগ।

সম্প্রতি বেলদা থেকেও ছিনতাইয়ের অভিযোগে তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কখনও খবরের কাগজ পড়ার অছিলায়, কখনও ট্রেনের দরজার কাছে ভিড় তৈরি করে যাত্রীদের হার, মোবাইল ফোন এবং ব্যাগ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। রেলপুলিশ জানিয়েছে, গত এক মাসে উলুবেড়িয়া, পাঁশকুড়া এবং বেলদা এলাকায় প্রায় দশটি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনার কিনারা করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে সোনার হার, ল্যাপটপ এবং মোবাইল ফোন।

এ দিন ‘ইস্টকোস্ট’ এক্সপ্রেস থেকেও সফি মোমিন নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে ২২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। সফির দাবি, অন্ধ্রপ্রদেশের রাজামুন্ড্রি থেকে ওই ফোনগুলি হাওড়ায় এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নিয়ে আসছিলেন তিনি। তবে উদ্ধার হওয়া ফোনগুলির বিষয়ে উপযুক্ত কোনও নথি দেখাতে পারেননি বলে দাবি রেলপুলিশের। ফলে ফোনগুলি চুরি করা কি না, কিংবা এর পিছনে কোনও বড় পাচারচক্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রেলপুলিশের তরফে যাত্রীদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, দূরপাল্লার ট্রেনে যাত্রার সময় ব্যাগ ও দামি সামগ্রী সুরক্ষিত রাখতে হবে। অপরিচিত কাউকে অতিরিক্ত বিশ্বাস না করা, ঘুমোনোর আগে ব্যাগের অবস্থান পরীক্ষা করা এবং সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলে দ্রুত রেলপুলিশ বা রেল সুরক্ষা বাহিনীকে জানানো জরুরি। তদন্তকারীদের মতে, যাত্রীদের সামান্য অসতর্কতাই অনেক সময় চোরেদের বড় সুযোগ করে দেয়।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved