Homeমালদাকাগজ নয়, পদ্মপাতায় ঘুগনি-মুড়ি! ১০ বছর ধরে অভিনব নজির মালদহে

কাগজ নয়, পদ্মপাতায় ঘুগনি-মুড়ি! ১০ বছর ধরে অভিনব নজির মালদহে

নিউজ ডেস্ক : রাস্তার ধারে ঘুগনি-মুড়ি খাওয়ার সঙ্গে বাঙালির নস্টালজিয়া জড়িয়ে। গরম মুড়ির সঙ্গে ঝাল ঘুগনি, তার উপর চপ কিংবা
Untitled Design (6)

নিউজ ডেস্ক : রাস্তার ধারে ঘুগনি-মুড়ি খাওয়ার সঙ্গে বাঙালির নস্টালজিয়া জড়িয়ে। গরম মুড়ির সঙ্গে ঝাল ঘুগনি, তার উপর চপ কিংবা সিদ্ধ ডিম—অল্প খরচে পেট ভরানোর এমন খাবারের জনপ্রিয়তা এখনও অটুট। কিন্তু সেই খাবার যদি পরিবেশন করা হয় কাগজের ঠোঙায় নয়, একেবারে প্রাকৃতিক পদ্মপাতায়? মালদহে এমনই অভিনব উদ্যোগ নিয়ে গত প্রায় এক দশক ধরে ব্যবসা করছেন এক ঘুগনি-মুড়ি বিক্রেতা। তাঁর এই উদ্যোগে যেমন রয়েছে স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা, তেমনই রয়েছে পরিবেশ রক্ষার ভাবনাও।

মালদহ শহরের দক্ষিণ বালুচর এলাকার বাসিন্দা সমর মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরে ঘুগনি-মুড়ির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন জেলা প্রশাসনিক ভবন এবং জেলা আদালত চত্বর সংলগ্ন এলাকায় তাঁর দোকানে ভিড় জমে। সকাল থেকে শুরু হয় ব্যস্ততা। অফিসযাত্রী, আদালতে আসা মানুষ, পথচলতি খাদ্যরসিক—অনেকেই তাঁর দোকানে দাঁড়িয়ে পছন্দের খাবার খান। তবে সমরের দোকানের বিশেষত্ব শুধু খাবারের স্বাদ বা দাম নয়। ক্রেতার হাতে খাবার তুলে দেওয়ার পদ্ধতিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

কাগজের ঠোঙা বা প্লাস্টিকের পরিবর্তে পদ্মপাতায় ঘুগনি-মুড়ি পরিবেশন করেন তিনি। প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি পদ্মপাতা তাঁর দোকানে ব্যবহার হয় বলে জানিয়েছেন সমর। সকাল ১০টা নাগাদ দোকান খোলার পর থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে। এই সময়ের মধ্যেই একের পর এক পদ্মপাতায় সাজিয়ে দেওয়া হয় ঘুগনি-মুড়ি এবং অন্যান্য খাবার।

খাবারের দামও রাখা হয়েছে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। মাত্র পাঁচ টাকা থেকে শুরু হচ্ছে তাঁর দোকানের খাবার। পছন্দ অনুযায়ী দাম বেড়ে ১৫ টাকা কিংবা সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা পর্যন্ত যায়। ঘুগনি-মুড়ির সঙ্গে ক্রেতারা চাইলে চপ, সিদ্ধ ডিম কিংবা বিভিন্ন ধরনের ভাজা যোগ করতে পারেন। ফলে অল্প টাকায় নিজের পছন্দমতো জলখাবার সেরে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সমরের এই পদ্মপাতায় খাবার পরিবেশনের পিছনে রয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্যও। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বাবা আগে একই ভাবে পদ্মপাতা ব্যবহার করে ঘুগনি-মুড়ি বিক্রি করতেন। বাবার কাছ থেকেই তিনি এই পদ্ধতি শিখেছেন। পরবর্তী সময়ে নিজে ব্যবসা শুরু করেও সেই পুরনো পদ্ধতি বদলাননি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিকেই নিজের ব্যবসার অন্যতম বৈশিষ্ট্য করে তুলেছেন।

প্রায় দশ বছর ধরে এই ভাবেই চলছে তাঁর দোকান। এতদিনে পদ্মপাতায় খাবার পরিবেশনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন স্থানীয় ক্রেতারাও। অনেকের কাছে এই পদ্ধতি একদিকে যেমন পুরনো দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, তেমনই পরিবেশের কথা ভাবতেও বাধ্য করে।

সমরের দাবি, প্রতিদিন তাঁর দোকান থেকে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকার খাবার বিক্রি হয়। অর্থাৎ ছোট পরিসরের ব্যবসা হলেও নিয়মিত ক্রেতার সংখ্যা কম নয়। প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি পদ্মপাতা ব্যবহার হওয়াও সেই জনপ্রিয়তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তাঁর দোকানে খাবার খেতে আসা এক ক্রেতা মহম্মদ সইদ আনোয়ারও এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কাজের সূত্রে তাঁকে প্রায়ই শহরে আসতে হয়। হালকা খিদে পেলেই তিনি এই দোকানে ঘুগনি-মুড়ি খেতে আসেন। পদ্মপাতায় খাবার পরিবেশনের বিষয়টি তাঁর ভাল লাগে। পরিবেশবান্ধব হওয়ার পাশাপাশি খাবারের স্বাদও বেশ ভাল বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে এই উদ্যোগের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে—খাবার পরিবেশনে সংবাদপত্রের ব্যবহার এড়ানো। রাস্তার ধারের বহু খাবারের দোকানে এখনও কাগজ বা সংবাদপত্রের পাতা দিয়ে খাবার মোড়ানোর চল রয়েছে। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাস নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। খাদ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশিকায় সংবাদপত্রের কাগজে সরাসরি খাবার রাখা বা মোড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ ছাপার কালিতে থাকা রাসায়নিক উপাদান খাবারের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

এই জায়গাতেই পদ্মপাতার মতো প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। অবশ্য পদ্মপাতা ব্যবহার করলেই যে কোনও খাবার স্বয়ংক্রিয় ভাবে সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে যায়, এমন দাবি করা যায় না। পাতাটি পরিষ্কার রাখা, সঠিক ভাবে ব্যবহার করা এবং খাবার পরিবেশনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সমরের উদ্যোগের ক্ষেত্রে মূল আকর্ষণ হল, কাগজ বা প্লাস্টিকের পরিবর্তে একটি প্রাকৃতিক উপাদানকে পরিবেশনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়া।

পরিবেশের দিক থেকেও এই উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিদিন খাবার বিক্রির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাগজ, প্লাস্টিক বা অন্যান্য প্যাকেজিং বর্জ্য তৈরি হতে পারে। রাস্তার ধারের খাবারের দোকানে সেই বর্জ্য যথাযথ ভাবে সংগ্রহ না হলে তা নর্দমা বা রাস্তার পাশে জমে পরিবেশের সমস্যা তৈরি করতে পারে। সেই জায়গায় প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার বর্জ্য কমানোর ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসে।

তবে পদ্মপাতার ব্যবহারকে কেন্দ্র করে সমরের দোকানের পরিচিতি শুধু পরিবেশবান্ধব উদ্যোগেই আটকে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর বাবার কাছ থেকে পাওয়া ব্যবসার ঐতিহ্য। অর্থাৎ পুরনো দিনের একটি স্থানীয় খাদ্য পরিবেশনের পদ্ধতিকে তিনি এখনও ধরে রেখেছেন। আধুনিক প্যাকেজিংয়ের যুগেও সেই পদ্ধতি ক্রেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়াই তাঁর উদ্যোগের বিশেষত্ব।

বর্তমানে খাদ্য ব্যবসায় স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে মানুষের সচেতনতা ক্রমশ বাড়ছে। খাবার কোথায় তৈরি হচ্ছে, কী ভাবে রাখা হচ্ছে, কীসে পরিবেশন করা হচ্ছে—সবকিছু নিয়েই ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়েছে। ফলে সমরের মতো ছোট বিক্রেতাদের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগও সাধারণ মানুষের নজর কাড়ছে।

একই সঙ্গে এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, পরিবেশ রক্ষার জন্য সব সময় বড় কোনও প্রকল্পের প্রয়োজন হয় না। দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অভ্যাসেও পরিবর্তন আনা সম্ভব। খাবারের একটি ঠোঙার পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করার মতো ছোট সিদ্ধান্তও পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দিতে পারে।

মালদহের সমর মণ্ডলের দোকান তাই শুধু ঘুগনি-মুড়ি বিক্রির জায়গা নয়। সেখানে একসঙ্গে মিশেছে বাঙালির চেনা স্ট্রিট ফুড, পারিবারিক ঐতিহ্য, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং পরিবেশ রক্ষার ভাবনা। প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি পদ্মপাতায় খাবার পরিবেশন করে তিনি যে বার্তাটি দিচ্ছেন, তা খুবই সহজ—খাবারের স্বাদ যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি খাবার পরিবেশনের পদ্ধতি এবং চারপাশের পরিবেশের কথাও ভাবা।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved