Homeপূর্ব মেদিনীপুরতমলুক৩৯ বছরে ছুটি মাত্র ১১ দিন! অবসরের ৮ বছর পরেও রোজ স্কুলে যান তৃপ্তি, নিখরচায় পড়ান ১১৮ পড়ুয়াকে

৩৯ বছরে ছুটি মাত্র ১১ দিন! অবসরের ৮ বছর পরেও রোজ স্কুলে যান তৃপ্তি, নিখরচায় পড়ান ১১৮ পড়ুয়াকে

নিউজ ডেস্ক : অবসর নিয়েছেন প্রায় আট বছর আগে। সরকারি খাতায় তাঁর শিক্ষকতার চাকরি শেষ হয়েছে ২০১৮ সালেই। কিন্তু শিক্ষকতা
Untitled Design (4)

নিউজ ডেস্ক : অবসর নিয়েছেন প্রায় আট বছর আগে। সরকারি খাতায় তাঁর শিক্ষকতার চাকরি শেষ হয়েছে ২০১৮ সালেই। কিন্তু শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার কথা ভাবেননি তৃপ্তি বক্সী। বয়স ৬৮ পেরোলেও প্রতিদিন নিয়ম করে স্কুলে যান তিনি। হাতে নেই কোনও সরকারি দায়িত্ব, নেই বেতন পাওয়ার বাধ্যবাধকতাও। তবু সকাল হলেই স্কুলের পথে হাঁটা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কারণ, তাঁর কাছে শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, এক ধরনের নেশা। আর পড়ুয়াদের সঙ্গে সময় কাটানোই যেন অবসর জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।

তমলুকের শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকের বাড়খোষখানা এলাকার বাসিন্দা তৃপ্তি বক্সীর এই অধ্যবসায়ের গল্প এখন স্থানীয় এলাকায় আলোচনার বিষয়। দীর্ঘ ৩৯ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি মোটে ১১ দিন ছুটি নিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। সরকারি নিয়মে অবসর নেওয়ার পরেও সেই নিয়মানুবর্তিতায় কোনও ছেদ পড়েনি। বরং অবসর গ্রহণের পরের দিন থেকেই ফের স্কুলে যাওয়া শুরু করেন তিনি। আজও প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছে পড়ুয়াদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা।

স্থানীয় খুষ্টিকরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব সামলেছেন তৃপ্তিদেবী। ২০১৮ সালে বয়স ও সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী তাঁর অবসর হয়। সেই সময় বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে বিদায় সংবর্ধনাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিদায়ের মুহূর্তে পড়ুয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা ভাবেননি তিনি। বরং জানিয়েছিলেন, চাকরি শেষ হলেও ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর টান তাঁকে স্কুলে ফিরিয়ে আনবে।

কথা রেখেছেন তৃপ্তিদেবী।

অবসরের পরদিন থেকেই নিয়ম করে স্কুলে আসছেন তিনি। দিনের শুরুতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিদ্যালয়ে পৌঁছে যান। তারপর ক্লাসরুমে ঢুকে পড়ুয়াদের পড়াশোনায় সাহায্য করেন। কখনও পাঠ বোঝান, কখনও খাতায় ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে দেন, কখনও আবার ছোটদের সঙ্গে বসে তাঁদের পড়ার অভ্যাস তৈরি করেন। স্কুল ছুটির সময় হলে বাড়ির পথ ধরেন। পরের দিন আবার একই রুটিন।

এই পুরো কাজের বিনিময়ে তিনি কোনও পারিশ্রমিক নেন না।

অবসরের পরে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁকে সাম্মানিক দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা গিয়েছে। কিন্তু তৃপ্তিদেবী সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। তাঁর বক্তব্য, পড়ুয়াদের পড়াতে পারাটাই তাঁর কাছে যথেষ্ট। অর্থের বিনিময়ে নয়, ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি এই কাজ করে চলেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষও।

তৃপ্তিদেবীর নিজের কথাতেও ধরা পড়েছে শিক্ষকতার প্রতি তাঁর গভীর টান। তিনি জানিয়েছেন, বাড়িতে বসে থাকতে তাঁর ভাল লাগে না। শিক্ষকতা তাঁর কাছে নেশার মতো। পড়ুয়াদের মধ্যে থাকতেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। শরীর যত দিন সুস্থ থাকবে, তত দিন নিয়ম করে স্কুলে আসার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।

বর্তমানে ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুশ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় ১১৮। ছোট ছোট পড়ুয়াদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তাঁদের পাশে দাঁড়ানোকে নিজের দায়িত্ব বলেই মনে করেন তৃপ্তিদেবী। তাঁর উপস্থিতিও যে পড়ুয়াদের কাছে আলাদা উৎসাহ তৈরি করে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

শুধু পড়ানো নয়, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো নিয়েও চিন্তিত তৃপ্তিদেবী। তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থলের স্কুল ভবনের বর্তমান অবস্থা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ভবনটি ভগ্নপ্রায় বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার পরিবেশের কথা মাথায় রেখে স্কুল ভবনটি দ্রুত সংস্কারের আবেদন জানিয়েছেন তিনি। অবসর নেওয়ার পরেও যে বিদ্যালয়ের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এতটুকু কমেনি, এই আবেদনই তার আরেকটি উদাহরণ।

তৃপ্তিদেবীর জীবনযাত্রার আর একটি দিকও স্থানীয়দের বিশেষ ভাবে ভাবিয়েছে। সাধারণত চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর মানুষ নিজের মতো করে সময় কাটানোর পরিকল্পনা করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর বিশ্রাম নেওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তৃপ্তিদেবীর ক্ষেত্রে ছবিটা একেবারেই আলাদা। প্রায় চার দশক শিক্ষকতা করার পরও তিনি শ্রেণিকক্ষ ছাড়তে পারেননি।

৩৯ বছরের চাকরিজীবনে মাত্র ১১ দিনের ছুটি নেওয়ার তথ্যও তাঁর নিয়মানুবর্তিতার পরিচয় বহন করে। তবে অবসর-পরবর্তী আট বছরে তিনি যে ভাবে বিনা পারিশ্রমিকে স্কুলে গিয়ে পড়াচ্ছেন, সেটিই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে স্থানীয়দের।

এলাকাবাসীর একাংশের মতে, বর্তমান সময়ে যখন পেশাগত জীবনে কাজের চাপ, অবসর এবং ব্যক্তিগত সময় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হয়, সেখানে তৃপ্তিদেবীর মতো মানুষের দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন শিক্ষকের সঙ্গে পড়ুয়ার সম্পর্ক কেবল চাকরির মেয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শ্রেণিকক্ষের বাইরেও সেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছেও তৃপ্তিদেবী এখন অনুপ্রেরণার নাম। অবসর নেওয়ার পরেও তিনি যে নিষ্ঠা নিয়ে পড়ুয়াদের জন্য সময় দিচ্ছেন, তা তাঁদের কাছেও শিক্ষণীয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বয়স তাঁর কাছে যেন কোনও বাধাই নয়। বরং বছরের পর বছর ধরে অর্জন করা অভিজ্ঞতাকে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়াকেই জীবনের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন তিনি।

তৃপ্তি বক্সীর গল্প তাই শুধু একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকার স্কুলে যাওয়ার গল্প নয়। এটি শিক্ষকতার প্রতি দায়বদ্ধতা, পড়ুয়াদের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের পেশাকে জীবনের অংশ করে নেওয়ার এক অনন্য নজির। সরকারি চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে আট বছর আগে, কিন্তু তাঁর শিক্ষকসত্তার অবসর এখনও হয়নি। যত দিন শরীর সঙ্গ দেবে, তত দিন চক-খাতা আর পড়ুয়াদের নিয়েই তাঁর সকাল শুরু হবে—এটাই যেন তাঁর জীবনের নিয়ম।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved