Homeপশ্চিম মেদিনীপুরবেলদাবাপের বাড়িতে রক্তাক্ত অবস্থায় মহিলার দেহ, গ্রেফতার যুবক! বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের টানাপড়েনের তত্ত্ব পুলিশের

বাপের বাড়িতে রক্তাক্ত অবস্থায় মহিলার দেহ, গ্রেফতার যুবক! বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের টানাপড়েনের তত্ত্ব পুলিশের

নিউজ ডেস্ক; বাপের বাড়ির ঘর থেকে এক মহিলার রক্তাক্ত দেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল নয়াগ্রামে। ঘটনার দু’দিনের মধ্যেই তদন্তে অগ্রগতি
resizeplus_6HDRO6B7JNCUXCNCGNOWQM5LJY

নিউজ ডেস্ক; বাপের বাড়ির ঘর থেকে এক মহিলার রক্তাক্ত দেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল নয়াগ্রামে। ঘটনার দু’দিনের মধ্যেই তদন্তে অগ্রগতি দাবি করল পুলিশ। মঙ্গলবার ভোরে বেলদা থানা এলাকা থেকে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে নয়াগ্রাম থানার পুলিশ। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, ওই মহিলার সঙ্গে ধৃত যুবকের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের টানাপড়েন থেকেই খুনের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। যদিও খুনের প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে ধৃত যুবকের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তদন্ত এখনও চলছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতের নাম সুশান্ত সিং। তাঁর বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশিয়াড়ি থানার ভসরা গ্রামে। মঙ্গলবার তাঁকে ঝাড়গ্রাম আদালতে হাজির করানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে খুন এবং প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। আদালত ধৃতকে সাত দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার একাধিক দিক খতিয়ে দেখার চেষ্টা করা হবে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

ঘটনার সূত্রপাত রবিবার সকালে। নয়াগ্রাম থানার বড়ঝরিয়া গ্রামের একটি বাড়ি থেকে নিরুপমা সিং (৩০)-এর রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হয়। বাড়ির লোকজনই প্রথম তাঁকে ওই অবস্থায় দেখতে পান। খবর পেয়ে নয়াগ্রাম থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। পাশাপাশি ঘটনার তদন্তও শুরু হয়।

নিরুপমার বাড়ি নয়াগ্রাম থানার টোটাসাই গ্রামে। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁর স্বামী কর্মসূত্রে ভিন্‌রাজ্যে থাকেন। তিনি পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। দম্পতির এক ছেলে এবং এক মেয়ে রয়েছে। দু’জনেই নাবালক এবং হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে। অন্য দিকে, নিরুপমা বেশ কিছু দিন ধরে বড়ঝরিয়া গ্রামে তাঁর বাপের বাড়িতে থাকতেন।

রবিবার সকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভিতরে নিরুপমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি দেখে সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হয় থানায়। পুলিশ এসে দেহ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। ঘটনার পর মৃতার বাবা যামিনী সিং থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

তদন্তে নেমে পুলিশ প্রথম থেকেই পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং ঘটনার আগের রাতের গতিবিধি খতিয়ে দেখতে শুরু করে। মৃতার বাবার বয়ানেই তদন্তকারীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পান বলে জানা গিয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, রবিবার রাতে সুশান্ত সিং নামে এক যুবক তাঁদের বাড়িতে এসেছিলেন। তিনি নিরুপমার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় বলেও পরিবার সূত্রে জানা যায়। রাতে তিনি ওই বাড়িতেই ছিলেন বলে অভিযোগ।

কিন্তু পরের দিন সকালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য রকম দেখা যায়। নিরুপমাকে ঘরের মধ্যে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেলেও সুশান্ত সেখানে ছিলেন না। তাঁর কোনও সন্ধানও পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, নিরুপমার মোবাইল ফোনটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে পুলিশকে জানানো হয়।

এই দুই বিষয়—রাতে সুশান্তের ওই বাড়িতে থাকা এবং সকালে তাঁর অনুপস্থিতি—তদন্তকারীদের নজর কাড়ে। এরপরই পুলিশ তাঁর সন্ধানে তল্লাশি শুরু করে। সম্ভাব্য বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ চালানোর পাশাপাশি তাঁর পরিচিতদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

তদন্তকারী অফিসার অর্ণব মণ্ডলের নেতৃত্বে পুলিশ গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশি চালায়। শেষ পর্যন্ত বেলদা থানা এলাকার একটি জায়গা থেকে সুশান্তের সন্ধান পাওয়া যায়। মঙ্গলবার ভোরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাঁকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে নিরুপমার সঙ্গে সুশান্তের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এসেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, সেই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে কোনও ধরনের টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। তারই জেরে খুন হয়ে থাকতে পারেন নিরুপমা। তবে এটি পুলিশের প্রাথমিক অনুমান। সম্পর্কের প্রকৃতি, খুনের সম্ভাব্য কারণ, ঘটনার সময় ঠিক কী হয়েছিল এবং ধৃত যুবকের ভূমিকা কী—এসব বিষয় এখনও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, প্রাথমিক ভাবে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের টানাপড়েনের জেরেই এই খুন হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। ধৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য তথ্য সামনে আনার চেষ্টা চলছে।

নিরুপমার মোবাইল ফোনটি এখনও তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। ফোনটি কোথায় গেল, ঘটনার আগে বা পরে কারও সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল কি না, শেষবার কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল—এসব তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফোন উদ্ধার করা গেলে তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলে পুলিশের আশা।

একই সঙ্গে রবিবার রাতে বড়ঝরিয়ার ওই বাড়িতে কী ঘটেছিল, তা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে পুলিশ। সুশান্ত কখন বাড়িতে এসেছিলেন, তাঁর সঙ্গে নিরুপমার দেখা বা কথা হয়েছিল কি না, রাতের কোনও সময় বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন কি না এবং সকালে তিনি কোথায় চলে যান—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।

পুলিশের কাছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ঘটনাস্থল থেকে কী কী তথ্য পাওয়া গিয়েছে। খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত কোনও অস্ত্র বা অন্যান্য সামগ্রী সেখানে ছিল কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ফরেন্সিক এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টও তদন্তের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ঘটনার পর বড়ঝরিয়া গ্রামে স্বাভাবিক ভাবেই চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বাপের বাড়িতে থাকা এক মহিলার এ ভাবে রক্তাক্ত অবস্থায় দেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে রাতে এক যুবকের বাড়িতে থাকার বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই তাঁকে ঘিরে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না পুলিশ।

পরিবারের পরিস্থিতিও এই ঘটনার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। নিরুপমার স্বামী ভিন্‌রাজ্যে কাজ করেন এবং তাঁদের দুই সন্তান হস্টেলে পড়াশোনা করে। ফলে পরিবারের মধ্যে এই মৃত্যুর অভিঘাত গভীর। অন্য দিকে, মৃতার বাবার অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ তদন্ত শুরু করে দ্রুত এক জনকে গ্রেফতার করেছে।

আদালতের নির্দেশে আগামী সাত দিন পুলিশ হেফাজতে থাকবেন সুশান্ত। এই সময়ের মধ্যে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার আসল কারণ জানার চেষ্টা করবে তদন্তকারী দল। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থল, ময়নাতদন্ত এবং অন্যান্য তথ্যের মিল রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হবে।

এখন তদন্তের কেন্দ্রে একাধিক প্রশ্ন—নিরুপমার মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল, তাঁর সঙ্গে সুশান্তের সম্পর্কের প্রকৃতি কী ছিল, কোনও বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ হয়েছিল কি না, খুনের নেপথ্যে অন্য কেউ যুক্ত ছিল কি না এবং নিখোঁজ মোবাইল ফোনটির কী হল। সব প্রশ্নের উত্তর মিললেই পরিষ্কার হবে নয়াগ্রামের এই রহস্যমৃত্যুর প্রকৃত ছবি।

এই মুহূর্তে পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করলেও তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। ধৃত যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ, ফরেন্সিক তথ্য, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে। ফলে পুলিশের ‘বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের টানাপড়েন’-এর তত্ত্বই শেষ কথা কি না, তার উত্তর মিলবে তদন্ত এগোনোর পরেই।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved