
নিউজ ডেস্ক; পুর এলাকার পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং শহরকে আরও পরিচ্ছন্ন রাখতে একাধিক কড়া নিয়ম চালু করল রাজ্যের পুর দপ্তর। মঙ্গলবার থেকে রাজ্যের পুরসভা এলাকাগুলিতে সিঙ্গল-ইউজ় প্লাস্টিক বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১২৫ মাইক্রনের নীচের প্লাস্টিক ব্যাগ এবং প্লাস্টিক কাপ ব্যবহার করা যাবে না। নিয়ম ভাঙলে দিতে হবে সরাসরি ২০০ টাকা জরিমানা।
শুধু প্লাস্টিক ব্যবহারেই নয়, পুর এলাকার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে প্রকাশ্যে থুতু ফেলা এবং যত্রতত্র মূত্রত্যাগের বিরুদ্ধেও আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা করেছে পুর দপ্তর। নির্দেশিকা অনুযায়ী, জনসমক্ষে মূত্রত্যাগ করলে ২০০ টাকা এবং প্রকাশ্যে থুতু ফেললে ১০০ টাকা জরিমানা করা হবে। অর্থাৎ, শহরের রাস্তাঘাট, ফুটপাত কিংবা জনবহুল এলাকায় পরিচ্ছন্নতা নষ্ট করে এমন আচরণের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি পকেটে চাপ ফেলতে চাইছে প্রশাসন।
নতুন নিয়ম কার্যকর করার পাশাপাশি জরিমানা আদায়ের জন্য রাজ্যের প্রতিটি পুরসভাকে ওয়ার্ডভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতি ওয়ার্ডে পাঁচ জন করে কর্মী নিয়ে একটি দল গঠন করার কথা বলা হয়েছে। ওই দল পুর দপ্তরের নির্দেশিকা অনুযায়ী নিষিদ্ধ প্লাস্টিক ব্যবহার এবং অপরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত নিয়মভঙ্গের ঘটনা নজরে রাখবে। প্রয়োজন হলে নিয়মভঙ্গকারীদের কাছ থেকে জরিমানাও আদায় করবে।
তবে পুরমন্ত্রীর বক্তব্য, এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে সরকারি রাজস্ব বাড়ানো নয়। বরং জরিমানাকে নাগরিকদের আচরণ পরিবর্তনের একটি মাধ্যম হিসেবেই দেখছে সরকার।
পুর দপ্তরের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, মঙ্গলবার থেকে রাজ্যের পুরসভা এলাকাগুলিতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ১২৫ মাইক্রনের নীচের প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের কাপের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে।
প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বাজার, রাস্তা, নিকাশি নালা থেকে শুরু করে জলাশয়—বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক জমে থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ব্যাগ নিকাশি ব্যবস্থায় আটকে জল জমার সমস্যাও বাড়ায়। বর্ষার সময়ে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
পুর দপ্তরের লক্ষ্য, একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে ধীরে ধীরে পুর এলাকায় একটি পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। সেই লক্ষ্যেই এবার নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অমান্য করে নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের ব্যাগ কিংবা প্লাস্টিক কাপ ব্যবহার করলে ২০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে সরাসরি মাঠে প্রয়োগ করতে চাইছে পুর দপ্তর।
এর জন্য প্রতিটি পুরসভাকে নিজেদের এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওয়ার্ডভিত্তিক পাঁচ সদস্যের দল গঠন করে নিয়মভঙ্গের ঘটনা চিহ্নিত করার পাশাপাশি জরিমানা আদায়ের কাজও করা হবে।
প্রশাসনের আশা, নিয়মিত নজরদারি এবং জরিমানার ফলে নিষিদ্ধ প্লাস্টিক ব্যবহারের প্রবণতা কমবে। বিশেষ করে দোকান, বাজার এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক এলাকায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের জোগান ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
তবে শুধু ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই যে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না, সেই প্রশ্নও ইতিমধ্যে উঠছে। নিষিদ্ধ প্লাস্টিক বাজারে কোথা থেকে আসছে, কারা তা সরবরাহ করছে এবং কোথায় তা মজুত হচ্ছে—সেই বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মীরা।
প্লাস্টিকের পাশাপাশি নাগরিকদের আরও কয়েকটি অভ্যাসের বিরুদ্ধেও কড়া হচ্ছে পুর দপ্তর। প্রকাশ্যে থুতু ফেলা এবং যত্রতত্র মূত্রত্যাগের মতো আচরণকে শহরের পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন নিয়মে যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করলে ২০০ টাকা এবং জনসমক্ষে থুতু ফেললে ১০০ টাকা জরিমানা নেওয়া হবে। এর ফলে রাস্তাঘাট, ফুটপাত, সরকারি জায়গা এবং অন্যান্য জনসাধারণের ব্যবহারের এলাকাকে অপরিচ্ছন্ন করার প্রবণতা কমবে বলে আশা প্রশাসনের।
দীর্ঘদিন ধরে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে রাস্তার ধারে, গলির মুখে, দেওয়ালের পাশে কিংবা ফুটপাতের কোণে প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে পান-গুটখা খাওয়ার পর প্রকাশ্যে থুতু ফেলার ঘটনাও বহু জায়গায় দেখা যায়। নতুন নিয়মে এই ধরনের আচরণের বিরুদ্ধেও সরাসরি আর্থিক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নিয়ম চালু করাই শেষ কথা নয়। তা কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তাই পুর দপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্যের প্রতিটি পুরসভাকে ওয়ার্ডভিত্তিক নজরদারি দল তৈরি করতে বলা হয়েছে।
প্রতি ওয়ার্ডে পাঁচ জন করে সদস্য নিয়ে দল তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাঁরা সংশ্লিষ্ট এলাকায় ঘুরে নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের ব্যবহার, প্রকাশ্যে থুতু ফেলা, যত্রতত্র মূত্রত্যাগ-সহ বিভিন্ন নিয়মভঙ্গের ঘটনা নজরে রাখবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে জরিমানাও আদায় করবেন।
এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে পুর এলাকার পরিচ্ছন্নতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের পাশাপাশি নির্দিষ্ট একটি নজরদারি কাঠামো তৈরি হবে। ফলে কোনও এলাকায় নিয়মিত নিয়মভঙ্গ হচ্ছে কি না, সেই বিষয়েও পুর কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হবে।
পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল অবশ্য জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য নয়। তাঁর বক্তব্য, এই পদক্ষেপকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে হবে।
পুরমন্ত্রীর মতে, কোনও শহরকে শুধু সরকারি কর্মী বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। নাগরিকদের নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যদি মনে করেন, শহরের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং তাঁদেরও দায়িত্ব, তা হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সম্ভব।
তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, নাগরিকদের মধ্যে এমন একটি উপলব্ধি তৈরি করা প্রয়োজন যে, শহরটি তাঁদের নিজেদেরও। তাই জরিমানাকে মূল লক্ষ্য না করে মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য বলে জানানো হয়েছে।
তবে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার প্রথম দিনেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় মিশ্র ছবি দেখা গিয়েছে। উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতা—বিভিন্ন জায়গায় নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের সামগ্রী বিক্রি এবং ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে প্রকাশ্য জায়গায় থুতু ফেলার মতো ঘটনাও চোখে পড়েছে।
অর্থাৎ, সরকারি নির্দেশিকা কার্যকর হলেও তার প্রভাব একদিনে নাগরিক জীবনে পড়েনি। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কতটা কার্যকর করা যায়, তার উপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সাফল্য।
পরিবেশকর্মী সোমেন্দ্র মোহন ঘোষের মতে, শুধুমাত্র নিয়ম জারি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নজরদারি যাতে ধারাবাহিক থাকে, সেদিকে প্রশাসনকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের জোগান বন্ধ করাও জরুরি। বাজারে যদি নিয়মিত নিষিদ্ধ প্লাস্টিক পৌঁছতে থাকে, তা হলে শুধু ব্যবহারকারীদের জরিমানা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা কঠিন।
পরিবেশবিদদের একটি বড় অংশের বক্তব্য, প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে চাহিদার পাশাপাশি জোগানের দিকটিও দেখা প্রয়োজন। দোকানদার কিংবা ক্রেতা নিষিদ্ধ প্লাস্টিক ব্যবহার করছেন কি না, তার উপর নজরদারি যেমন প্রয়োজন, তেমনই কোথা থেকে ওই প্লাস্টিক বাজারে আসছে, সেই বিষয়েও প্রশাসনিক নজরদারি জরুরি।
কারণ, কোনও পণ্য বাজারে সহজলভ্য থাকলে শুধু জরিমানার ভয় দেখিয়ে তার ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। বিকল্প পরিবেশবান্ধব সামগ্রী সহজলভ্য করা, ব্যবসায়ীদের সচেতন করা এবং নিষিদ্ধ প্লাস্টিক সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পদক্ষেপও একইসঙ্গে প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, রাজ্যের পুর এলাকাগুলিতে পরিচ্ছন্নতা এবং পরিবেশ রক্ষায় নতুন করে কড়া অবস্থান নিয়েছে পুর দপ্তর। সিঙ্গল-ইউজ় প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে ২০০ টাকা জরিমানা, প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগে ২০০ টাকা এবং থুতু ফেললে ১০০ টাকা জরিমানার পাশাপাশি প্রতি ওয়ার্ডে পাঁচ সদস্যের নজরদারি দল—এই তিনটি ব্যবস্থাকে সামনে রেখে অভিযান শুরু হয়েছে।
এখন দেখার, প্রথম দিনের অভিযানের পর আগামী কয়েক সপ্তাহে নিয়মভঙ্গের ঘটনা কতটা কমে এবং নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের জোগান ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন কতটা সফল হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত জরিমানার সংখ্যা নয়, শহরের রাস্তাঘাট কতটা পরিষ্কার হচ্ছে এবং নাগরিকদের অভ্যাসে কতটা পরিবর্তন আসছে—সেটিই হবে এই নতুন ব্যবস্থার সাফল্যের আসল মাপকাঠি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments