
নিউজ ডেস্ক : বর্ষার মরসুমে ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে ডেঙ্গির আশঙ্কা। রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে মঙ্গলবার স্বাস্থ্য দফতরে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়-সহ স্বাস্থ্য দফতরের একাধিক আধিকারিক। তবে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাঁর দাবি, গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ শতাংশেরও বেশি কম।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সেপ্টেম্বর মাসকে ডেঙ্গি সচেতনতার মাস হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে মশাবাহিত রোগের সংক্রমণ রুখতে পুরসভা, প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য দফতরকে একাধিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জমা জল পরিষ্কার করা, নির্মাণস্থলে নজরদারি এবং মশার লার্ভা ধ্বংস করার কাজে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর এই সময় রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭ হাজারের বেশি। এ বছর সেই সংখ্যা ৪ হাজারের কিছু বেশি। বর্তমানে রাজ্যে ১৪৮ জন ডেঙ্গি পজিটিভ রোগী রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
তবে কয়েকটি এলাকায় একসঙ্গে একাধিক মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হওয়ায় স্থানীয় স্তরে পরিস্থিতির দিকে বিশেষ নজর রাখছে প্রশাসন। নদিয়ার চাকদহে বেশ কয়েকজনের একসঙ্গে ডেঙ্গি আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি বৈঠকে উঠে আসে। কলকাতাতেও পুরসভার ১২টি ওয়ার্ডে কয়েক জন ডেঙ্গি আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্য, আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আত্মতুষ্টির কোনও জায়গা নেই। বরং বর্ষার বাকি সময়টুকুতে আরও সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে যে পরিবারগুলিতে ডেঙ্গি আক্রান্ত রোগী রয়েছেন, সেই পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জ্বরকে কোনও ভাবেই হালকা ভাবে না নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর নির্দেশ, কারও দু’দিনের বেশি জ্বর থাকলে দ্রুত ডেঙ্গি পরীক্ষা করাতে হবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষার কিট পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। সরকারি ব্যবস্থায় বিনামূল্যে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার সময়ে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষত ডেঙ্গির মতো মশাবাহিত রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যে ১৪৮ জন বর্তমানে ডেঙ্গি পজিটিভ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, তাঁদের বাড়ির সদস্যদেরও সতর্ক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তির বাড়ির আশপাশে মশার প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে কি না, সে দিকেও নজর দিতে বলা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন এলাকায় তরল লার্ভানাশক ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে চিকিৎসকদের অনুমতি নিয়ে সীমিত পরিসরে ফগিং মেশিন ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ অকারণে ব্যাপক ফগিং না করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উপরেই জোর দেওয়া হচ্ছে।
ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির একটি হল নির্মাণাধীন এলাকা। নির্মাণস্থলে পড়ে থাকা বিভিন্ন পাত্র, গর্ত বা অন্যান্য জায়গায় জল জমে থাকলে সেখানে এডিস মশার লার্ভা জন্মাতে পারে। তাই সমস্ত নির্মাণ এলাকায় যাতে জল জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে কলকাতা ও শহরতলির বিভিন্ন নির্মাণ এলাকায় নিয়মিত নজরদারির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। জল জমে থাকার খবর পাওয়া গেলে দ্রুত তা পরিষ্কার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে আগামী ৩, ৪ এবং ৫ সেপ্টেম্বর বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষ করে KMDA এলাকার আওতাধীন বিভিন্ন জায়গায় সর্বাত্মক সাফাই অভিযান চালানোর কথা বলা হয়েছে।
পুরসভা ও প্রশাসনের কর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় স্তরেও সচেতনতা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রাম, টব কিংবা অন্য কোনও জায়গায় যাতে জল জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গি প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বস্তি এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী মশারি পৌঁছে দেওয়ার জন্য পুরসভাগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মশার উপদ্রব কমাতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও লার্ভানাশক ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে সতর্কতা কোনও ভাবেই কমানো যাবে না। তাঁর দাবি, স্বাস্থ্য দফতর পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
এ দিনের সাংবাদিক বৈঠক থেকে রাজ্যের পূর্বতন তৃণমূল সরকারের সময় ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক আক্রমণও শানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে ডেঙ্গি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করতেও অনেকে ভয় পেতেন। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি বদলেছে বলে দাবি করেন তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্য, রোগের সংখ্যা বাড়লে তা নিয়ে তথ্য গোপন না করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই সরকারের দায়িত্ব। আগামী বছর আরও উন্নত ভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য চলতি বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে বলেও জানান তিনি।
ডেঙ্গি বৈঠকের পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত আরও কিছু বিষয় নিয়েও কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। একটি শিশুর অস্ত্রোপচারের জন্য সরকারি সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকার কোনও ব্যক্তি, দল বা ধর্মের ভিত্তিতে পার্থক্য করে না। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের পাশে থাকার বার্তাই দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
সব মিলিয়ে, বর্ষার শেষ পর্যায়ে ডেঙ্গি সংক্রমণ যাতে নতুন করে বড় আকার না নেয়, সে জন্য একাধিক পদক্ষেপ শুরু করেছে প্রশাসন। বিশেষ সাফাই অভিযান থেকে শুরু করে পরীক্ষার কিটের ব্যবস্থা, আক্রান্তদের পরিবারের উপর নজরদারি, লার্ভানাশক প্রয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মশারি পৌঁছে দেওয়া—সব দিকেই একসঙ্গে নজর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন সেপ্টেম্বরের বিশেষ অভিযানে মশার প্রজননস্থল কতটা নির্মূল করা যায়, তার উপরেই অনেকটা নির্ভর করছে আগামী দিনের ডেঙ্গি পরিস্থিতি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments