
নিউজ ডেস্ক; পশ্চিমবঙ্গে স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার জন্য আরও সময় পেল রাজ্য। মোট ৩৫,৬৫৪টি শূন্যপদে নিয়োগের কাজ শেষ করতে আগামী বছরের ৩১ মে পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তবে এই সময়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, এর পরে আর কোনও অতিরিক্ত সময় দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতেই হবে এসএসসিকে।
সোমবার বিচারপতি সঞ্জয় কুমার এবং বিচারপতি সঞ্জীব সচদেবের বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়েছে। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে সেই নির্দেশ আপলোড হওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। আদালতের নির্দেশে শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি গ্রুপ–সি এবং গ্রুপ–ডি পদে নিয়োগও আগামী বছরের মে মাসের মধ্যেই শেষ করার কথা স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। এই দুই শ্রেণির নিয়োগের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে আর সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে আদালত।
এসএসসি-র নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে যে দীর্ঘ আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে এই সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। একদিকে যেমন নবম–দশম এবং একাদশ–দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের কাজ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে, অন্যদিকে গ্রুপ–সি ও গ্রুপ–ডি পদে নিয়োগ এখনও অপেক্ষাকৃত প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে কমিশনের সামনে বড়সড় কর্মযজ্ঞ অপেক্ষা করছে।
এসএসসি সূত্রের খবর, নবম–দশম এবং একাদশ–দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে। একাধিক ক্ষেত্রে কাউন্সেলিংও শেষ হয়েছে। ফলে নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে গিয়ে কমিশনকে বিশেষ কিছু প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিশেষ করে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসি সংরক্ষণের কাঠামোয় পরিবর্তন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। আগে যেখানে ওবিসি সংরক্ষণের হার ১৭ শতাংশ ছিল, বর্তমানে তা কমে ৭ শতাংশ হওয়ায় মেধাতালিকা ও সংরক্ষিত আসনের হিসাব নতুন করে সামলাতে হচ্ছে কমিশনকে। ইতিমধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ার একাধিক ধাপ সম্পন্ন হয়ে যাওয়ায় এই পরিবর্তনের প্রভাব সামগ্রিক নিয়োগ ব্যবস্থার উপর পড়ছে।
ফলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং-সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ শেষ করেও পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ধারিত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সময় লাগছে। এই কারণেই সুপ্রিম কোর্টের কাছে নিয়োগ সম্পূর্ণ করার জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
শীর্ষ আদালত সেই আবেদন মেনে সময়সীমা বাড়ালেও একইসঙ্গে একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—এটাই শেষ সুযোগ। আগামী বছরের ৩১ মে-র মধ্যে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে। এরপর আর সময় বৃদ্ধির আবেদন গ্রহণ করা হবে না বলেই কার্যত আদালতের নির্দেশে ইঙ্গিত মিলেছে।
শিক্ষক নিয়োগের তুলনায় গ্রুপ–সি ও গ্রুপ–ডি পদে নিয়োগের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। এই দুই বিভাগ মিলিয়ে প্রায় সাড়ে আট হাজার শিক্ষাকর্মী নিয়োগ হওয়ার কথা। ইতিমধ্যেই এই পদগুলির জন্য লিখিত পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
এসএসসি সূত্রে খবর, পুজোর আগেই সেই পরীক্ষার ফল প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। ফল প্রকাশের পর শুরু হবে নিয়োগের পরবর্তী ধাপ। প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্টারভিউ এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিয়োগের দিকে এগোবে কমিশন।
এই নিয়োগে এখনও লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর্যায় বাকি থাকলেও শিক্ষক নিয়োগের মতো একাধিক ধাপ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন নেই। ফলে তুলনামূলক ভাবে কম জটিলতার মধ্যেই গ্রুপ–সি ও গ্রুপ–ডি নিয়োগ শেষ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আদালতের নির্ধারিত সময়সীমা মাথায় রেখে কমিশনকে দ্রুত কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কারণ আগামী বছরের ৩১ মে-র মধ্যে শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, গ্রুপ–সি এবং গ্রুপ–ডি নিয়োগও সম্পূর্ণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এসএসসির বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়ার পটভূমিতে রয়েছে নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত দীর্ঘ আইনি লড়াই। গত বছর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী মিলিয়ে প্রায় ২৬ হাজার নিয়োগ বাতিল করে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই রায়ের পর যোগ্য প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা।
পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, যাঁদের যোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে, তাঁদের নতুন করে নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দায়িত্ব পড়ে এসএসসির উপর।
এখন সেই নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়াই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে কমিশন। আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশ সেই প্রক্রিয়াকে আরও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিয়ে এল।
দেখতে গেলে আগামী বছরের মে মাস পর্যন্ত এখনও বেশ কয়েক মাস সময় রয়েছে। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একাধিক প্রশাসনিক ধাপ, সংরক্ষণ সংক্রান্ত পরিবর্তন, মেধাতালিকা তৈরি, কাউন্সেলিং এবং নিয়োগপত্র দেওয়ার মতো বিষয় রয়েছে। ফলে প্রতিটি ধাপ শেষ করতে কমিশনকে সময় ধরে এগোতে হবে।
অন্যদিকে গ্রুপ–সি ও গ্রুপ–ডি নিয়োগে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পরবর্তী বাছাই, প্রয়োজনীয় ইন্টারভিউ এবং নিয়োগ সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। দুই ধরনের নিয়োগের কাজ একই সময়সীমার মধ্যে শেষ করার নির্দেশ থাকায় এসএসসির উপর চাপ যে যথেষ্ট, তা বলাই যায়।
তবে কমিশনের তরফে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া অনেকটা এগিয়ে যাওয়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। গ্রুপ–সি ও গ্রুপ–ডি ক্ষেত্রেও লিখিত পরীক্ষা ইতিমধ্যেই হয়ে যাওয়ায় একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে না। তাই আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার ক্ষেত্রে কমিশন কত দ্রুত কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, এখন সেদিকেই নজর চাকরিপ্রার্থীদের।
সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এসএসসির নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য একটি চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারিত হয়ে গেল। আগামী বছরের ৩১ মে-র মধ্যে ৩৫,৬৫৪টি পদে নিয়োগ সম্পূর্ণ করাই এখন কমিশনের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আদালতের এই নির্দেশে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে যেমন নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছ ও দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার দাবিও আরও জোরালো হচ্ছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments