Homeকলকাতাবর্ষাতেই শীতের দূষণ রুখতে প্রস্তুতি কলকাতা পুরসভার, নজরে নির্মাণের ধুলো থেকে নাগরিকের অভ্যাস

বর্ষাতেই শীতের দূষণ রুখতে প্রস্তুতি কলকাতা পুরসভার, নজরে নির্মাণের ধুলো থেকে নাগরিকের অভ্যাস

নিউজ ডেস্ক; বর্ষার বৃষ্টিতে আপাতত অনেকটাই স্বস্তিতে কলকাতার বাতাস। বৃষ্টির কারণে বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ও বিভিন্ন দূষক কণার পরিমাণ তুলনামূলক
resizeplus_Screenshot 2026-09-02 113342_edited

নিউজ ডেস্ক; বর্ষার বৃষ্টিতে আপাতত অনেকটাই স্বস্তিতে কলকাতার বাতাস। বৃষ্টির কারণে বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ও বিভিন্ন দূষক কণার পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকায় মহানগরের বায়ুমান এখন সন্তোষজনক থেকে ভালো পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু বর্ষার এই স্বস্তিকে স্থায়ী ধরে নিয়ে বসে থাকতে নারাজ কলকাতা পুরসভা। বরং শীতের মরসুমে শহরের বাতাস যাতে ফের দূষিত হয়ে না ওঠে, তার জন্য এখন থেকেই সচেতনতামূলক প্রচারে জোর দিয়েছে পুর প্রশাসন।

পুরসভার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কলকাতার গড় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা বায়ুমান সূচক বর্তমানে ৪৭.২৩। পরিবেশগত মানদণ্ড অনুযায়ী এই মাত্রাকে ‘ভালো’ শ্রেণিতে রাখা হয়। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বসানো কন্টিনিউয়াস অ্যাম্বিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং স্টেশন বা নিরবচ্ছিন্ন বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলির তথ্যও আপাতত স্বস্তির ছবি তুলে ধরছে। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার কারণে পাওয়া এই সাময়িক স্বস্তি শীতের সময় কতটা বজায় রাখা যায়, সেটিই আসল চ্যালেঞ্জ।

কলকাতা শহরে বর্তমানে ছ’টি এমন বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। শনিবারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই কেন্দ্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে ভালো বায়ুমান নথিভুক্ত হয়েছে রবীন্দ্র সরোবর এলাকায়। সেখানে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ছিল ২৯.৯২। অর্থাৎ, ওই এলাকার বাতাস ছিল ‘ভালো’ শ্রেণির মধ্যে।

শহরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ছবিও মোটের উপর ইতিবাচক। ফোর্ট উইলিয়ামে বায়ুমান সূচক ছিল ৩৮.২১, বালিগঞ্জে ৩৮.৭৫ এবং যাদবপুরে ৪৫.২৯। এই তিনটি এলাকাতেও বায়ুর মান ভালো পর্যায়ে রয়েছে বলে পুরসভার পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে।

অন্যদিকে, রবীন্দ্রভারতী চত্বরে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ছিল ৫৩.৩৮। আর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সংলগ্ন এলাকায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭.৭৯-এ। যদিও তুলনামূলক ভাবে এই দুই এলাকায় দূষণের মাত্রা বেশি, তবুও সূচক ১৫০-এর নীচে থাকায় বায়ুর মানকে এখনও ‘সন্তোষজনক’ পর্যায়ের মধ্যে রাখা হচ্ছে।

বর্ষার স্বস্তি কত দিন?

কলকাতার বায়ুমান নিয়ে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয় সাধারণত শীতের সময়। বর্ষাকালে নিয়মিত বৃষ্টির ফলে বাতাসে ভেসে থাকা ধূলিকণা অনেকটাই নিচে নেমে আসে। ফলে বাতাস তুলনামূলক পরিষ্কার থাকে। কিন্তু বৃষ্টির পরিমাণ কমে গিয়ে আবহাওয়া শুষ্ক হতে শুরু করলে ফের বাতাসে ধূলিকণা এবং দূষক পদার্থের ঘনত্ব বাড়তে থাকে।

বিশেষ করে পুজোর পর থেকে শহরে শীতের আমেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর্দ্রতা, বাতাসের গতি, তাপমাত্রা এবং বাতাসে বিভিন্ন দূষক আটকে থাকার মতো একাধিক কারণের প্রভাব পড়ে সেই সময়ে। ফলে এখনকার ভালো বায়ুমান দেখে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়ার কোনও কারণ নেই বলেই মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

এই কারণেই কলকাতা পুরসভা বর্ষাকালেই নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোর কাজ শুরু করেছে। পুর প্রশাসনের লক্ষ্য, শীত আসার আগেই সাধারণ মানুষের মধ্যে দূষণ কমানোর উপায় সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা।

নাগরিকদের অভ্যাস বদলের বার্তা

পুরসভার প্রচারে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে না। দূষণ নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভূমিকার উপরেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, শহরের বায়ুদূষণের সঙ্গে নাগরিকদের যাতায়াত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং বাড়ির আশপাশের পরিবেশের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।

পুরসভার সচেতনতামূলক নির্দেশিকায় শহরবাসীকে যতটা সম্ভব গণপরিবহণ ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো গেলে যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়ার পরিমাণও কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুতের অপচয় কমানোর বিষয়টিও প্রচারের মধ্যে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ির বারান্দা, ছাদ কিংবা উপযুক্ত জায়গায় এমন গাছ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা ধূলিকণা আটকে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

শহরের রাস্তার ধুলো নিয়ন্ত্রণেও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা চেয়েছে পুরসভা। বাড়ির সামনে বা আশপাশে অতিরিক্ত ধুলো জমলে সেখানে জল ছিটিয়ে ধুলোর উড়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বর্জ্য পোড়ানোয় সম্পূর্ণ নিষেধ

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে পুরসভার নির্দেশিকায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা। শুকনো পাতা, প্লাস্টিক কিংবা গৃহস্থালির নানা ধরনের আবর্জনা অনেক সময় বাড়ির সামনে, রাস্তার ধারে অথবা ডাস্টবিনের কাছেই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে। এর ফলে সরাসরি বাতাসে ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণা ছড়িয়ে পড়ে।

পুরসভার বার্তা, কোনও পরিস্থিতিতেই খোলা জায়গায় বা ডাস্টবিনের মধ্যে শুকনো পাতা, প্লাস্টিক কিংবা গৃহস্থালির বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা যাবে না। শীতকালে যখন বাতাসে দূষক আটকে থাকার প্রবণতা বাড়ে, তখন এই ধরনের ধোঁয়া পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে।

একইসঙ্গে কাঠ ও কেরোসিনের মতো জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক করা হয়েছে। দূষণ কমাতে তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এমনকি বাড়ির ভিতরের বায়ুর গুণমান নিয়েও সতর্ক করেছে পুরসভা। বদ্ধ ঘরে মশার ধূপ কিংবা কৃত্রিম সুগন্ধি জাতীয় সামগ্রীর অতিরিক্ত ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ, বন্ধ ঘরে এই ধরনের ধোঁয়া ও রাসায়নিক কণার ঘনত্ব বেড়ে যেতে পারে।

সামাজিক মাধ্যমেও প্রচার

সচেতনতা তৈরির জন্য শুধু পোস্টার বা প্রচলিত প্রচারের উপর নির্ভর করছে না পুরসভা। সামাজিক মাধ্যমকেও কাজে লাগানো হচ্ছে। নিয়মিত বিভিন্ন বার্তা প্রকাশ করে নাগরিকদের বায়ুদূষণ কমানোর উপায় সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে।

পুর প্রশাসনের বক্তব্য, দূষণ নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র পুরসভা বা প্রশাসনের পক্ষে একা সম্ভব নয়। শহরের প্রতিটি বাসিন্দার আচরণ এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের সঙ্গে এর সরাসরি যোগ রয়েছে। ফলে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ভাবে শহরের বাতাসের মান উন্নত করা কঠিন।

দূষণ সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য পুরসভার পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় দূষণের পরিস্থিতি, সম্ভাব্য উৎস এবং নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নিয়ে এই কমিটি নজর রাখবে।

বর্ষার স্বস্তি নয়, শীতের প্রস্তুতিই আসল

পুরসভার এই আগাম উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন পরিবেশবিদদের একাংশ। তবে তাঁদের বক্তব্য, বর্ষায় বৃষ্টির কারণে বাতাস পরিষ্কার থাকা স্বাভাবিক ঘটনা। তাই বর্তমানের পরিসংখ্যান দিয়ে শহরের দূষণ নিয়ন্ত্রণের সাফল্য বিচার করা ঠিক হবে না।

পরিবেশ বিজ্ঞানী অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, বর্ষাকালে নিয়মিত বৃষ্টিপাত বাতাসকে অনেকটাই পরিষ্কার রাখে। কিন্তু পুজোর পর যখন আবহাওয়া শুকনো হতে শুরু করবে, তখনই বোঝা যাবে প্রশাসনের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর হয়েছে।

পরিবেশকর্মী সোমেন্দ্র মোহন ঘোষও দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামোগত পদক্ষেপের উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো বা বর্ষাকালের পরিষ্কার বাতাস নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। শীতকালে আর্দ্রতা কমে গেলে এবং বাতাসে ধোঁয়াশা বাড়লে দূষণের পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।

তাঁর মতে, নির্মাণস্থল থেকে ধুলো ছড়ানো বন্ধ করা, পুরনো ডিজ়েলচালিত যানবাহন ধাপে ধাপে কমানো এবং পুরসভার নির্ধারিত দূষণবিধি কঠোর ভাবে কার্যকর করা জরুরি। এই ব্যবস্থাগুলি কার্যকর না হলে শুধুমাত্র সচেতনতামূলক প্রচার দিয়ে কলকাতার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

সব মিলিয়ে, বর্ষার তুলনামূলক পরিষ্কার বাতাসকে সামনে রেখে আগামী শীতের জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে কলকাতা পুরসভা। নাগরিক সচেতনতা থেকে বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ, নির্মাণস্থলের ধুলো নিয়ন্ত্রণ থেকে যানবাহনের ধোঁয়া—একাধিক দিককে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এখন দেখার, বর্ষার এই স্বস্তি পুজোর পরের শুষ্ক আবহাওয়াতেও কতটা ধরে রাখা যায় এবং পুরসভার আগাম উদ্যোগ বাস্তবে কলকাতার শীতকালীন দূষণ কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved