Homeকলকাতাফের উড়বে বিমান? বেহালা বিমানবন্দর চালু করতে কেন্দ্রের দ্বারস্থ রাজ্য

ফের উড়বে বিমান? বেহালা বিমানবন্দর চালু করতে কেন্দ্রের দ্বারস্থ রাজ্য

নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘদিন কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায় থাকা দক্ষিণ কলকাতার বেহালা বিমানবন্দরকে ফের সচল করার উদ্যোগ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বেহালা বিমানবন্দর
resizeplus_WhatsApp Image 2026-09-01 at 12.13.39

নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘদিন কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায় থাকা দক্ষিণ কলকাতার বেহালা বিমানবন্দরকে ফের সচল করার উদ্যোগ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বেহালা বিমানবন্দর থেকে নিয়মিত বিমান পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে এ বার কেন্দ্রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানানো হয়েছে। এই বিষয়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রী রামমোহন নাইডু কিঞ্জারাপুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী তথা বেহালা পশ্চিমের বিধায়ক ইন্দ্রনীল খাঁ।

বৈঠকে রাজ্যের তরফে বেহালা বিমানবন্দর পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষ থেকেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। রাজ্যের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এই বিমানবন্দরকে ফের ব্যবহারযোগ্য করে তোলা গেলে শুধু দক্ষিণ কলকাতা নয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

বেহালা বিমানবন্দর চালু করার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা সময়ে আলোচনা হয়েছে। কলকাতার প্রধান বিমানবন্দর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উপর যাত্রী ও বিমান চলাচলের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। সেই পরিস্থিতিতে বিকল্প বা সহায়ক বিমান পরিষেবার পরিকাঠামো হিসেবে বেহালা বিমানবন্দরের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে।

দিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক

রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ দিল্লিতে কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বেহালা বিমানবন্দর থেকে যাত্রীবাহী বিমান পরিষেবা চালুর প্রস্তাব দেন। বৈঠকে বিমানবন্দরটির বর্তমান অবস্থা, সম্ভাব্য ব্যবহার এবং ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগে এর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

ইন্দ্রনীল খাঁর বক্তব্য, বেহালা বিমানবন্দর সচল হলে দক্ষিণ কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার বহু মানুষের যাতায়াতের ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে। ডায়মন্ড হারবার, সুন্দরবন এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।

রাজ্যের তরফে কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে, বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু হলে শুধু যাত্রী পরিবহণ নয়, জরুরি পরিষেবা, চিকিৎসাজনিত বিমান যোগাযোগ, পর্যটন এবং ব্যবসার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

মুখ্যমন্ত্রীর চিঠিতে বিমানবন্দর চালুর আবেদন

বেহালা বিমানবন্দরকে ফের কার্যকর করার লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে বিমানবন্দরটির সম্ভাবনা এবং দক্ষিণবঙ্গের আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় তার গুরুত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

রাজ্যের দাবি, বেহালা বিমানবন্দর পুনরুজ্জীবিত করা গেলে কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার শিল্পোন্নয়নেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের পর্যটন শিল্পের প্রসারেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য। ডায়মন্ড হারবার এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক এলাকা পর্যটন ও বাণিজ্যিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত বিমান যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

৯১৫ মিটার রানওয়ে, কী ধরনের বিমান চলতে পারে?

বেহালা বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯১৫ মিটার। রাজ্যের পক্ষ থেকে কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এই রানওয়ে ATR-72 ধরনের নির্দিষ্ট যাত্রীবাহী বিমান, এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স এবং ছোট চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

বিশেষ করে আঞ্চলিক বিমান পরিষেবার ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি ক্ষমতার বিমান ব্যবহার করে নতুন রুট চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকারের আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ভবিষ্যতে বেহালা বিমানবন্দরকে যুক্ত করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে বিমানবন্দর চালুর জন্য শুধুমাত্র রানওয়ের দৈর্ঘ্য যথেষ্ট নয়। বিমান নিরাপত্তা, বিমানবন্দরের আশপাশের বাধা, আধুনিক পরিকাঠামো, নেভিগেশন ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ পরিষেবা, যাত্রী টার্মিনাল এবং প্রয়োজনীয় কেন্দ্রীয় অনুমোদন— সবকটি বিষয়ই পূরণ করতে হবে।

কলকাতা বিমানবন্দরের উপর চাপ কমবে?

বেহালা বিমানবন্দরকে কার্যকর করা গেলে কলকাতার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উপর কিছুটা চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে বলে রাজ্যের আশা। বিশেষ করে ছোট বিমান, চার্টার্ড পরিষেবা বা আঞ্চলিক রুটের একটি অংশ অন্য বিমানবন্দরে সরানো সম্ভব হলে মূল বিমানবন্দরের পরিকাঠামো ব্যবহারে নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।

তবে বিমান বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বেহালা বিমানবন্দর থেকে নিয়মিত যাত্রীবাহী বিমান পরিষেবা শুরু করার আগে একাধিক বাস্তব সমস্যার সমাধান জরুরি। বিমানবন্দরের আশপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন নির্মাণ ও উঁচু স্থাপনা বিমান চলাচলের নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সম্ভাব্য বাধাগুলি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিমানবন্দরে পৌঁছনোর রাস্তা এবং যাত্রী পরিবহণের পরিকাঠামোও বড় বিষয়। নিয়মিত বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবা চালু হলে বিমানবন্দরে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যাত্রীর যাতায়াত হবে। সেই পরিস্থিতিতে সড়ক যোগাযোগ, পার্কিং এবং গণপরিবহণের ব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন হতে পারে।

জরুরি চিকিৎসা পরিষেবায় নতুন সম্ভাবনা

বেহালা বিমানবন্দর চালুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হতে পারে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা। দক্ষিণবঙ্গের কোনও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে দ্রুত অন্য শহরে বা বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিমান পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

জরুরি পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা চিকিৎসাজনিত বিশেষ প্রয়োজনে একটি কার্যকর বিমানবন্দর দক্ষিণ কলকাতার কাছে থাকলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও সুবিধা হতে পারে।

সুন্দরবন ও উপকূলবর্তী অঞ্চলের মতো ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলির ক্ষেত্রে দ্রুত যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে রয়েছে। ভবিষ্যতে বেহালা বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে জরুরি পরিষেবার একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

পর্যটন ও বাণিজ্যে নতুন গতি?

দক্ষিণবঙ্গের পর্যটন সম্ভাবনা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বেহালা বিমানবন্দর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সুন্দরবন, গঙ্গাসাগর, ডায়মন্ড হারবার এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রে দ্রুত পৌঁছনোর সুবিধা তৈরি হলে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে এই অঞ্চল আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

ব্যবসা ও শিল্পের ক্ষেত্রেও দ্রুত যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন শহরের আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডেও সুবিধা হতে পারে।

সব মিলিয়ে বেহালা বিমানবন্দরকে ফের আকাশপথের মানচিত্রে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে রাজ্য সরকার এখন কেন্দ্রের সহযোগিতা চাইছে। তবে প্রস্তাব থেকে বাস্তবে নিয়মিত বিমান পরিষেবা শুরু হওয়ার পথ এখনও দীর্ঘ। প্রযুক্তিগত সমীক্ষা, নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদন, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং বিমান সংস্থাগুলির আগ্রহ— সবকিছুর উপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ।

তবু দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত বিমানবন্দরকে নতুন করে কাজে লাগানোর উদ্যোগ দক্ষিণ কলকাতার মানুষের কাছে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এখন নজর থাকবে কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট বিমান কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। বেহালার রানওয়ে থেকে সত্যিই আবার নিয়মিত যাত্রীবাহী বিমান উড়বে কি না, তার উত্তর মিলবে আগামী দিনের প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তেই।

No Comments

তাজা খবর

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved