
নিউজ ডেস্ক: এক দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে দেওয়ালের বিতর্কিত স্লোগান মুছে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ফের সেই দেওয়ালেই দেখা গেল নতুন লেখা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালকে কেন্দ্র করে ফের শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও ছাত্র-রাজনৈতিক বিতর্ক। এবারের দেওয়াল লিখনে উঠে এসেছে জার্মান দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক কার্ল মার্কসের নামে প্রচলিত একটি উদ্ধৃতি। ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, দেওয়াল লিখনের অধিকার এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি ছাত্র সংগঠনগুলির সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়েছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। এবিভিপি ও বাম ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে রাজনৈতিক টানাপড়েনের আবহেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেওয়াল লিখন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক স্লোগান নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপেন এয়ার থিয়েটার সংলগ্ন একটি দেওয়ালে লেখা একটি বিতর্কিত ইংরেজি স্লোগান মুছে ফেলা হয়। ওই লেখাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর ২৯ তারিখ রাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেওয়ালটি ‘হোয়াইট ওয়াশ’ করে দেয় বলে জানা যায়।
কিন্তু দেওয়াল সাদা করার পরও বিতর্ক থামেনি। বরং পরের রাতেই সেই একই জায়গায় ফের নতুন রাজনৈতিক বার্তা লেখা হয়। এবার সেখানে কার্ল মার্কসের নামে প্রচলিত একটি উদ্ধৃতি লেখা হয়েছে। সেই দেওয়াল লিখনকে কেন্দ্র করে ফের সরগরম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।
আগের স্লোগানটি মুছে দেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল ফের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। নতুন দেওয়াল লিখনের মাধ্যমে বামপন্থী ছাত্রছাত্রীদের একাংশ স্পষ্টতই জানাতে চেয়েছে, দেওয়াল থেকে লেখা মুছে দিলেই রাজনৈতিক মতপ্রকাশ বন্ধ করা সম্ভব নয়।
দেওয়ালে লেখা নতুন ইংরেজি উদ্ধৃতিটি কার্ল মার্কসের নামে প্রচলিত। উদ্ধৃতির বক্তব্যের মূল সুর হল— রাজনৈতিক সংগ্রামে তাঁরা করুণা চাইবেন না এবং নিজেদের পালা এলে পদক্ষেপের জন্য অজুহাতও দেবেন না।
এই লেখা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের প্রশ্ন, ক্যাম্পাসের দেওয়াল কি শুধুই রাজনৈতিক মতপ্রকাশের জায়গা? নাকি সেখানে লেখার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন? অন্য দিকে ছাত্র সংগঠনগুলির একাংশের দাবি, যাদবপুরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে দেওয়াল বরাবরই মত প্রকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
দেওয়াল সাদা করে দেওয়ার ঘটনার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএফআই ইউনিটের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টও রাজনৈতিক মহলে চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। ওই পোস্টে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে নিজেদের অধিকার ও মতপ্রকাশের জায়গা ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
পোস্টের বক্তব্য ছিল, ‘যা তোমার, তা ছিনিয়ে নাও, তোমার দেওয়াল তুমি দখল করো।’ ইংরেজিতেও একই ধরনের বার্তা দেওয়া হয়।
এই পোস্টের পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে নতুন লেখা দেখা যাওয়ায় দুই ঘটনার মধ্যে রাজনৈতিক যোগ রয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে। যদিও নতুন লেখাটি কারা লিখেছেন, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে কোনও নির্দিষ্ট বক্তব্য সামনে আসেনি।
তবে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্তদের একাংশের বক্তব্য, যাদবপুরে দেওয়াল লিখন নতুন কোনও বিষয় নয়। বহু দশক ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেওয়ালে ছাত্র রাজনীতি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সামাজিক আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে নানা বার্তা লেখা হয়েছে।
এই বিতর্কের মধ্যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাঁর বক্তব্য, যাদবপুর বরাবরই মুক্তচিন্তা এবং মতপ্রকাশের জায়গা হিসেবে পরিচিত।
উপাচার্যের মতে, কোনও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ যদি দেওয়ালে নিজেদের বক্তব্য লিখতে পারেন, তা হলে ভিন্ন মতের মানুষদেরও নিজেদের মত প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত।
তিনি জানিয়েছেন, একপক্ষ দেওয়াল ব্যবহার করবে অথচ অন্য মতাদর্শের মানুষ তা করতে পারবেন না— এমন পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে বিভিন্ন মত ও আদর্শের মানুষের সহাবস্থানই গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
উপাচার্যের এই বক্তব্যের পর বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কারণ, এক দিকে বিতর্কিত লেখা মুছে দেওয়ার ঘটনা রয়েছে, অন্য দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রশাসনিক কর্তার বক্তব্যে মতপ্রকাশের বহুত্বের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল লিখন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্যও বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু দেওয়াল লিখন নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেগুলিকে দেশ ও শিক্ষার পরিবেশের পক্ষে উপযুক্ত কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তাঁর বক্তব্যের পরই যাদবপুরের দেওয়াল লিখন নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চর্চা শুরু হয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে ক্যাম্পাসের দেওয়ালে লেখা স্লোগান নিয়ে মতভেদ প্রকাশ্যে আসে।
বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক স্লোগানের কেন্দ্র করে তোলা উচিত নয়। অন্য দিকে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্তদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় শুধুই পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনও জায়গা নয়। সমাজ, রাজনীতি এবং বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা ও মতপ্রকাশ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অংশ।
সাম্প্রতিক এই ঘটনা ফের সেই পুরনো প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে— যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল কার?
ছাত্র সংগঠনগুলির কাছে দেওয়াল দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নির্বাচনের প্রচার থেকে শুরু করে প্রতিবাদ, আন্দোলন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি কিংবা সামাজিক ইস্যু— সবকিছুই জায়গা পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই দেওয়ালই যেন নতুন সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। একটি লেখা মুছে দেওয়ার পরই নতুন লেখা দেখা যাওয়ার ঘটনায় স্পষ্ট, দেওয়াল লিখনকে ঘিরে রাজনৈতিক লড়াই সহজে থামার সম্ভাবনা নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হল, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি ক্যাম্পাসের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনার পর ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সব মিলিয়ে, যাদবপুরের একটি দেওয়াল ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন আর শুধুমাত্র দেওয়াল লিখনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে ছাত্র রাজনীতি, মতাদর্শ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভূমিকা।
আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ধরনের দেওয়াল লিখন নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ করে কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। তবে আপাতত একটাই বিষয় স্পষ্ট— পুরনো স্লোগান মুছে গেলেও যাদবপুরের দেওয়ালে রাজনৈতিক বক্তব্যের লড়াই এখনও শেষ হয়নি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments