
নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের স্কুল সার্ভিস কমিশন বা এসএসসি নিয়োগ সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার আবহে ফের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের। ২৬ হাজার চাকরি বাতিল মামলাকে কেন্দ্র করে যোগ্য শিক্ষকদের চাকরিতে বহাল থাকার সময়সীমা আরও বাড়ানো হল। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ৩১ মে ২০২৭ পর্যন্ত নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে যোগ্য শিক্ষক ও কর্মীদের চাকরিতে বহাল রাখার সুযোগ মিলল। তবে একই সঙ্গে কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে আদালত— এই অতিরিক্ত সময়সীমার মধ্যে বাকি নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতেই হবে।
সোমবার এই মামলার শুনানি হয় সুপ্রিম কোর্টে। বিচারপতি সঞ্জয় কুমার ও সচিন সচদেবার বেঞ্চে মামলাটি ওঠে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে। রাজ্য এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের পক্ষ থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার জন্য আরও সময় চাওয়া হয়েছিল। সেই আবেদন বিবেচনা করেই সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় শীর্ষ আদালত।
তবে আদালতের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। কমিশনকে যে বাড়তি সময় দেওয়া হয়েছে, তাকে চূড়ান্ত সুযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ, ৩১ মে ২০২৭-এর মধ্যে নির্ধারিত নিয়োগ সংক্রান্ত সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব কমিশনের উপরই বর্তাবে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার ক্ষেত্রে আর অযথা বিলম্ব বরদাস্ত করা হবে না।
এই নির্দেশের ফলে বিশেষত যাঁরা ‘যোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সাময়িক স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ২৬ হাজার চাকরি বাতিল মামলাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, চাকরিপ্রার্থী এবং তাঁদের পরিবার— প্রত্যেকেই এই মামলার গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রেখে চলেছেন। নতুন নির্দেশের ফলে চাকরিতে বহাল থাকা এবং নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা পাওয়া গেল।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের প্রেক্ষিতে এসএসসিকে চারটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ক্ষেত্রের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ করতে হবে। সূত্রের দাবি, এর মধ্যে রয়েছে গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি, নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগ। এই চার ক্ষেত্র মিলিয়ে বিপুল সংখ্যক চাকরিপ্রার্থী নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু পরীক্ষা নেওয়া বা ফল প্রকাশ করাই এই প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ নয়। উত্তরপত্র যাচাই, অভিযোগ নিষ্পত্তি, সংরক্ষণ সংক্রান্ত হিসাব, শূন্যপদ নির্ধারণ এবং একাধিক মামলার আইনি প্রভাব বিচার করেই চূড়ান্ত নিয়োগের পথে এগোতে হচ্ছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
এসএসসির তরফে আদালতে সময় চাওয়ার পিছনে একাধিক কারণ তুলে ধরা হয়েছে। কমিশনের দাবি, বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে বিপুল সংখ্যক অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগের একটি বড় অংশই ওএমআর শিট এবং উত্তরপত্র মূল্যায়ন সংক্রান্ত।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার পরীক্ষার্থী বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ জানিয়েছেন। অনেকের দাবি, তাঁদের ওএমআর শিটের উত্তর মূল্যায়নে ত্রুটি রয়েছে। কোথাও কোথাও পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট প্রশ্নে উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অসঙ্গতি দেখা গিয়েছে।
এসএসসির সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিটি অভিযোগ খুঁটিয়ে দেখা। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে ওএমআর শিট ও উত্তরপত্র একাধিকবার যাচাই করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলেই কমিশনের দাবি। তাড়াহুড়ো করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা হলে ভবিষ্যতে নতুন করে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই কমিশন আরও সময় চেয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
কিছু পরীক্ষার্থীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিশেষ করে ওএমআর মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কোনও কোনও পরীক্ষায় উত্তর দেওয়ার ধরন ও মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। এমনও অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু ক্ষেত্রে শুধুমাত্র উত্তর দেওয়ার চেষ্টা বা ‘অ্যাটেম্পট’-এর ভিত্তিতে নম্বর পাওয়ার প্রশ্ন উঠেছে।
এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাই এখন কমিশনের অন্যতম প্রধান কাজ। নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে অতীতে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এবার প্রতিটি ধাপ আরও সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চাইছে কমিশন। উত্তরপত্রের পুনর্মূল্যায়ন এবং অভিযোগ খতিয়ে দেখার কাজেই উল্লেখযোগ্য সময় লাগছে বলে দাবি করা হয়েছে।
শুধু পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ বা উত্তরপত্র মূল্যায়নই নয়, প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও এসএসসির সামনে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে সূত্রের খবর। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পাঁচজন রিজিওনাল চেয়ারম্যানের পদত্যাগের প্রসঙ্গও নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আঞ্চলিক স্তরে প্রশাসনিক পদে পরিবর্তন হলে নিয়োগ সংক্রান্ত নথিপত্র, সমন্বয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে। কমিশনের বিভিন্ন স্তরের প্রশাসনিক কাজ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকায় পদ শূন্য থাকা বা নেতৃত্বের পরিবর্তন নিয়োগ প্রক্রিয়ার গতি কমিয়ে দিতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এসএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়ার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ওবিসি সংরক্ষণ। সংরক্ষণ নীতি এবং তার আইনি বৈধতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আদালতে মামলা হয়েছে। ফলে কোন শ্রেণিতে কত শতাংশ সংরক্ষণ ধরে শূন্যপদ বিভাজন করা হবে, সেই প্রশ্নও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, নতুন পরিস্থিতিতে ওবিসি সংরক্ষণের কাঠামোয় পরিবর্তনের ফলে শূন্যপদ বিন্যাসের উপর প্রভাব পড়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত এবং অসংরক্ষিত পদগুলির হিসাব নতুন করে বিবেচনা করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এর ফলে কমিশনের প্রস্তুত করা নিয়োগ তালিকা ও পরবর্তী ধাপেও পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।
এ ছাড়াও ২০২৫ সালের এসএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কলকাতা হাইকোর্টের একক বেঞ্চ, ডিভিশন বেঞ্চ এবং পরে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা হয়েছে। প্রতিটি মামলার নির্দেশ এবং পর্যবেক্ষণের প্রভাব নিয়োগ প্রক্রিয়ার উপর পড়ছে। ফলে কমিশনকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, আইনি দিক থেকেও প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিতে হচ্ছে।
হাইকোর্টের বিভিন্ন নির্দেশ, সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিতর্ক এবং শংসাপত্রের বৈধতা নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্ন— সব মিলিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হয়েছে। আদালতের নির্দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চূড়ান্ত নিয়োগ সম্পন্ন করাই এখন এসএসসির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নতুন নির্দেশে যোগ্য শিক্ষক ও কর্মীদের জন্য আপাতত কিছুটা স্বস্তি এলেও চাপ কমছে না স্কুল সার্ভিস কমিশনের উপর। হাতে রয়েছে নির্দিষ্ট সময়। সেই সময়ের মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি, আইনি জট কাটিয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে পারলেই এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর্বের অবসান ঘটতে পারে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments