
নিউজ ডেস্ক; রাজ্যের পুর এলাকাগুলিতে বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, নিয়মবদ্ধ এবং গতিশীল করতে বড়সড় ডিজিটাল উদ্যোগ নিতে চলেছে পুর দপ্তর। এবার থেকে রাজ্যের প্রতিটি পুর এলাকার প্রত্যেক বাড়িতে বসানো হবে বিশেষ কিউআর কোডযুক্ত স্টিকার। বাড়ির প্রধান গেট কিংবা সহজে চোখে পড়ে এমন কোনও জায়গায় ওই স্টিকার লাগানো থাকবে। জঞ্জাল সংগ্রহের গাড়ি নিয়ে পুরকর্মীরা বাড়িতে পৌঁছনোর পর নির্দিষ্ট যন্ত্রের মাধ্যমে সেই কিউআর কোড স্ক্যান করবেন। আর সেই স্ক্যানের সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট বাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কি না, তার তথ্য পৌঁছে যাবে কেন্দ্রীয় সার্ভারে।
পুর দপ্তরের কর্তাদের দাবি, গোটা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য শুধু বর্জ্য সংগ্রহের উপর নজরদারি বাড়ানো নয়। একইসঙ্গে কোন এলাকায় কতটা নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ হচ্ছে, কোন কর্মী কখন কোন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন এবং কোথাও পরিষেবায় গাফিলতি হচ্ছে কি না—সবটাই প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরে রাখা সম্ভব হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সব কিছু ঠিকঠাক এগোলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই রাজ্যের পুর এলাকাগুলিতে এই কিউআর কোড-ভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হয়ে যেতে পারে।
পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, সরকারের মূল লক্ষ্য প্রতিটি বাড়ি থেকে ১০০ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ করা এবং সেই বর্জ্য উৎসস্থলেই পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা। শুধু বাড়ি থেকে জঞ্জাল তুলে নিয়ে গিয়ে কোথাও ফেলে দেওয়াই নয়, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বর্জ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পুনর্ব্যবহারের আওতায় আনার লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের।
পুর দপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুর এলাকার প্রত্যেক বাড়িকে একটি নির্দিষ্ট কিউআর কোড দেওয়া হবে। সেই কোড সম্বলিত স্টিকার বাড়ির প্রধান গেট, দরজা অথবা এমন কোনও দৃশ্যমান স্থানে লাগানো থাকবে, যাতে পুরকর্মীরা সহজেই সেটি স্ক্যান করতে পারেন।
নির্দিষ্ট রুট অনুযায়ী জঞ্জাল সংগ্রহের গাড়ি যখন কোনও বাড়ির সামনে পৌঁছবে, তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী নিজের কাছে থাকা যন্ত্র দিয়ে ওই বাড়ির কিউআর কোড স্ক্যান করবেন। স্ক্যান করার পর সংশ্লিষ্ট বাড়ির বর্জ্য সংগ্রহের তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে আপডেট হয়ে যাবে। ফলে কোনও বাড়ি থেকে নির্দিষ্ট দিনে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কি না, তা আর শুধুমাত্র পুরকর্মীদের মৌখিক রিপোর্টের উপর নির্ভর করে জানতে হবে না।
কেন্দ্রীয় সার্ভারে জমা হওয়া তথ্যের মাধ্যমে পুর কর্তৃপক্ষ জানতে পারবেন কোন এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ হচ্ছে, কোথায় কোনও বাড়ি বাদ পড়ছে কিংবা কোন রুটে পরিষেবায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ফলে পরিষেবার ক্ষেত্রে গাফিলতি বা অনিয়ম চিহ্নিত করাও তুলনামূলক সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, কোন পুরকর্মী কখন কোন এলাকায় গিয়েছেন, কোন বাড়ির সামনে কিউআর কোড স্ক্যান করেছেন—সেই তথ্যও ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে কর্মীদের কাজের উপর নজরদারি আরও শক্তিশালী হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অন্যতম সমস্যা হল উৎসস্থলে ভেজা ও শুকনো বর্জ্য আলাদা না করা। পুর কর্তাদের অভিযোগ, বহু বাড়িতে রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, খাবারের বর্জ্য, ফল ও শাকসবজির খোসার মতো ভেজা বর্জ্যের সঙ্গে খবরের কাগজ, প্লাস্টিক, কাগজ বা অন্যান্য শুকনো বর্জ্য একসঙ্গে দিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে পরবর্তী পর্যায়ে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়।
নতুন ব্যবস্থায় এই বিষয়টির উপরেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুরকর্মীরা যদি দেখেন কোনও বাড়িতে নিয়ম মেনে বর্জ্য পৃথক করা হচ্ছে না, তাহলে সংশ্লিষ্ট বাড়ির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকবে। প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এর পাশাপাশি নিয়মিত বর্জ্য পুরকর্মীদের হাতে না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অনেক বাসিন্দা নির্দিষ্ট সময় বা নিয়ম অনুযায়ী বর্জ্য না দেওয়ায় সংগ্রহের গোটা ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়। নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থায় এই ধরনের অভিযোগও নথিভুক্ত করার সুযোগ থাকবে বলে পুর দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে।
তবে কিউআর কোড ব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, এটি শুধুমাত্র পুরকর্মীদের নজরদারির জন্য ব্যবহার করা হবে না। পরিষেবা নিয়ে বাসিন্দাদের অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হবে।
কোনও বাড়ি থেকে নিয়মিত জঞ্জাল না নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট বাসিন্দা কিউআর কোড স্ক্যান করে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারবেন। অর্থাৎ, একটি বাড়ির সঙ্গে যুক্ত বর্জ্য সংগ্রহের পরিষেবা এবং অভিযোগ—দুই দিকই একই ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় চলে আসবে।
পুর কর্তাদের মতে, এর ফলে অভিযোগের উৎস চিহ্নিত করা সহজ হবে। কোন বাড়ি থেকে অভিযোগ এসেছে, কোন কর্মীর দায়িত্বে সেই এলাকা ছিল এবং নির্দিষ্ট দিনে বর্জ্য সংগ্রহের রেকর্ড কী বলছে—সব তথ্য একসঙ্গে যাচাই করা যাবে। ফলে অভিযোগের নিষ্পত্তির সময়ও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুর দপ্তরের এই উদ্যোগের পিছনে রয়েছে আরও বড় লক্ষ্য। শহর ও পুর এলাকার প্রতিটি বাড়ি থেকে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করে তা উৎসেই পৃথক করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ বর্জ্য আলাদা না করলে তার পুনর্ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণ কঠিন হয়ে পড়ে।
ভেজা বর্জ্য থেকে জৈব সার বা অন্যান্য উপযোগী সামগ্রী তৈরি করা সম্ভব। আবার কাগজ, প্লাস্টিক, ধাতু-সহ বিভিন্ন শুকনো বর্জ্য আলাদা করা গেলে সেগুলির পুনর্ব্যবহারের সুযোগ বাড়ে। কিন্তু বাড়ি থেকেই যদি সব ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে মিশে যায়, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে তা আলাদা করতে বাড়তি সময় ও খরচ হয়। তাই সরকারের পরিকল্পনায় উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথকীকরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একইসঙ্গে পুর এলাকার বিভিন্ন জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বর্জ্য নিয়েও নতুন করে ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে। পুরমন্ত্রী জানিয়েছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরনো বর্জ্যকে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করার দিকে জোর দেওয়া হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ সাধন ঘোষের মতে, বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বর্জ্য উৎসস্থলে আলাদা করা এবং নিয়মিত সংগ্রহ নিশ্চিত করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল নজরদারি চালু হলে জঞ্জাল সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় গতি আসতে পারে। একইসঙ্গে পুর এলাকার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কাজও অনেক বেশি সংগঠিত করা সম্ভব হবে।
পুর দপ্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে বর্জ্য সংগ্রহ পরিষেবার একটি ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে। ফলে কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় বারবার পরিষেবা ব্যাহত হলে তার কারণ চিহ্নিত করার সুযোগ থাকবে। আবার কোনও কর্মী দায়িত্বে গাফিলতি করলে তাঁর কাজের তথ্যও যাচাই করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে রাজ্যের পুর এলাকাগুলিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কাগজ-কলমের রিপোর্টের বাইরে এনে প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য নিয়েছে পুর দপ্তর। ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যবস্থা চালু হলে আগামী দিনে বাড়ি থেকে জঞ্জাল সংগ্রহ, বর্জ্য পৃথকীকরণ, কর্মীদের কাজের নজরদারি এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি—সবকিছুই একটি কিউআর কোডের মাধ্যমে পরিচালনার পথে এগোবে রাজ্য।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments