Homeহুগলিজিটি রোডে ‘নো এন্ট্রি’, পুলিশের হেনস্থার অভিযোগ! টোটো বন্ধে ভোগান্তি শ্রীরামপুর-শেওড়াফুলিতে

জিটি রোডে ‘নো এন্ট্রি’, পুলিশের হেনস্থার অভিযোগ! টোটো বন্ধে ভোগান্তি শ্রীরামপুর-শেওড়াফুলিতে

নিউজ ডেস্ক; জিটি রোডে টোটো চলাচলে নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা, পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থার অভিযোগ এবং চাঁপদানি-রিষড়ার টোটো শ্রীরামপুর ও শেওড়াফুলি এলাকায় ঢুকে
resizeplus_Screenshot 2026-09-02 120607_edited

নিউজ ডেস্ক; জিটি রোডে টোটো চলাচলে নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা, পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থার অভিযোগ এবং চাঁপদানি-রিষড়ার টোটো শ্রীরামপুর ও শেওড়াফুলি এলাকায় ঢুকে পড়ার প্রতিবাদ—এই তিন ইস্যুকে সামনে রেখে সোমবার দিনভর কর্মবিরতি পালন করলেন শেওড়াফুলি ও শ্রীরামপুর রুটের টোটোচালকেরা। সকাল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার রুটে টোটো চলাচল বন্ধ থাকায় কার্যত থমকে যায় স্থানীয় পরিবহণ ব্যবস্থা। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে অফিসযাত্রী থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, রোগীর পরিজন এবং ব্যবসায়ীদের উপর।

টোটোচালকদের দাবি, ১ সেপ্টেম্বর থেকে জিটি রোডে টোটো চালানোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। জিটি রোডে টোটো চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যাবে। কারণ, এই এলাকার বহু যাত্রী দীর্ঘদিন ধরে জিটি রোডকে ব্যবহার করেন। ফলে রাস্তাটির উপর টোটো চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি হলে তাঁদের রোজগারে বড় ধাক্কা আসবে বলে আশঙ্কা চালকদের।

শুধু জিটি রোডে নিষেধাজ্ঞা নয়, তাঁদের আরও অভিযোগ, চাঁপদানি এবং রিষড়া এলাকার টোটোও নিয়মিত শ্রীরামপুর ও শেওড়াফুলি অঞ্চলে ঢুকে পড়ছে। এর ফলে স্থানীয় রুটের চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাচ্ছে এবং তাঁদের আয় কমছে। নিজেদের রুটে বাইরের টোটোর প্রবেশ বন্ধ করা এবং জিটি রোডে টোটো চলাচল নিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিতেই সোমবার কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়।

সকাল থেকেই শেওড়াফুলি থেকে শ্রীরামপুর পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় টোটো রাস্তায় না নামায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সাধারণ দিনে যে সব জায়গায় সারি সারি টোটো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, এ দিন সেখানে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ভিড় চোখে পড়ে। বিশেষ করে সকালবেলার ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

মাহেশ ফাঁড়ি, দমকল, বোসপাড়া, বটতলা থেকে শ্রীরামপুর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা যায়। শেওড়াফুলি স্টেশন চত্বর, বেল্টিং বাজার এবং ইএসআই হাসপাতালের সামনেও টোটোর জন্য বহু মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ট্রেন থেকে নেমে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছনোর জন্য যাঁরা সাধারণত টোটোর উপর নির্ভর করেন, তাঁরাও সমস্যায় পড়েন।

স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদের ক্ষেত্রেও দুর্ভোগ কম ছিল না। নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছনোর জন্য স্থানীয় টোটো পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অনেককেই বিকল্প যানবাহনের খোঁজ করতে হয়। কোথাও অটো বা অন্য যান পাওয়া গেলেও তার সংখ্যা ছিল সীমিত। ফলে অপেক্ষার সময় বাড়ে, কোথাও আবার অতিরিক্ত ভিড়ও তৈরি হয়।

টোটো বন্ধের প্রভাব শুধু যাত্রী পরিবহণে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্যবসা-বাণিজ্যের উপরও তার প্রভাব পড়ে। শেওড়াফুলি হাট হুগলি জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি ও খুচরো বাজার। আনাজ থেকে শুরু করে মশলা, চাল, ডাল-সহ বিভিন্ন সামগ্রী এখানে পাইকারি দরে কেনাবেচা হয়। আশপাশের ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই বাজার থেকে প্রতিদিন টোটোয় করে মালপত্র নিজেদের দোকান বা স্থানীয় বাজারে নিয়ে যান।

সোমবার টোটো না চলায় সেই পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থাতেও ছন্দপতন ঘটে। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, বাজার থেকে মালপত্র নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি সমস্যা হয়েছে। কোথাও পণ্য পৌঁছতে দেরি হয়েছে, কোথাও বিকল্প পরিবহণের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ফলে খুচরো বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়ে।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয় শ্রীরামপুর শ্রমজীবী হাসপাতালকে ঘিরে। শ্রীরামপুর এবং বারুইপাড়ার সঙ্গে হাসপাতালের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম টোটো। এই রুটে ট্রেকার চললেও তার সংখ্যা খুবই কম। স্থানীয়দের বক্তব্য, এক সময় ৩১ নম্বর রুটের বাস চলাচল করত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই বাস পরিষেবাও বন্ধ। ফলে ধীরে ধীরে টোটোই হয়ে উঠেছে হাসপাতালমুখী রোগী, তাঁদের পরিজন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অন্যতম প্রধান ভরসা।

সোমবার কর্মবিরতির কারণে সেই পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং রোগীর আত্মীয়েরা। কারও হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি হয়েছে, কেউ আবার বাধ্য হয়ে হাসপাতালের নিজস্ব যানবাহনের সাহায্য নিয়েছেন।

শ্রমজীবী হাসপাতালের অঙ্কোলজি বিভাগের চিকিৎসক সিদ্ধার্থ অধিকারী জানান, তিনি নিয়মিত শ্রীরামপুর স্টেশন থেকে টোটোয় করে হাসপাতালে যাতায়াত করেন। এ দিন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও টোটো না পাওয়ায় সমস্যায় পড়তে হয় তাঁকে। একই সময়ে এক রোগীর কেমোথেরাপি নির্ধারিত ছিল। পরিস্থিতির কথা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানালে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের তরফে গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়।

হাসপাতালের নার্সিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছন্দা দেবের অভিজ্ঞতাও একই রকম। তাঁর বাড়ি শ্রীরামপুরে। এ দিন প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর কোনওক্রমে ব্লাড ব্যাঙ্কের গাড়িতে করে হাসপাতালে পৌঁছন তিনি। ফলে শুধু রোগী বা তাঁদের পরিজন নন, হাসপাতালের কর্মীরাও যে টোটো পরিষেবার উপর কতটা নির্ভরশীল, তা এ দিনের ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে।

এক রোগীর আত্মীয়, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, এ দিন তাঁদের রোগীর অস্ত্রোপচার ছিল। টোটো বন্ধ থাকায় তাঁরা চরম সমস্যায় পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত শেওড়াফুলি থেকে পাওয়া একটি অটোয় করে হাসপাতালে পৌঁছতে সক্ষম হন।

হাসপাতালের সহ-সম্পাদক গৌতম সরকারের বক্তব্য, হঠাৎ করে টোটো পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেলে তার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের উপর। তাঁর মতে, টোটো বন্ধ করার আগে বিকল্প পরিবহণ ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, পরিবহণ ব্যবস্থাকে সামগ্রিক ভাবে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে।

তাঁর আরও বক্তব্য, দিল্লি রোডের আশপাশে গত কয়েক বছরে বহু ওয়্যারহাউস, কারখানা এবং বসতি গড়ে উঠেছে। এই সব এলাকার সঙ্গে মূল জনবসতি ও পরিবহণ কেন্দ্রগুলির যোগাযোগের ক্ষেত্রে টোটোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে টোটো পরিষেবা একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিক, কর্মচারী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন যাতায়াতে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে।

অন্য দিকে, টোটোচালকদের বক্তব্য, তাঁরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনও সংঘাত তৈরি করতে চান না। তাঁদের মূল দাবি, স্থানীয় রুটের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। জিটি রোডে টোটো চালানো বন্ধ করলে তাঁদের যাত্রী কমবে এবং রোজগারও কমবে—এই আশঙ্কার কথা তাঁরা প্রশাসনকে জানাতে চান। পাশাপাশি অন্য এলাকার টোটো এসে স্থানীয় রুট দখল করায় যে সমস্যা হচ্ছে, তারও সমাধান চেয়েছেন তাঁরা।

এ দিনের কর্মবিরতির জেরে একদিকে যেমন টোটোচালকেরা নিজেদের দাবি নিয়ে সরব হয়েছেন, অন্যদিকে তেমনই সামনে এসেছে এলাকার বিকল্প পরিবহণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। বাস পরিষেবা বন্ধ, ট্রেকারের সংখ্যা কম এবং টোটোর উপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা—সব মিলিয়ে একটি পরিষেবা বন্ধ হলেই সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কী ভাবে ব্যাহত হতে পারে, তা এ দিনের ঘটনায় স্পষ্ট।

এখন নজর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। জিটি রোডে টোটো চলাচল নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বাইরের রুটের টোটোর প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কোনও ব্যবস্থা করা হয় কি না এবং স্থানীয় যাত্রীদের জন্য বিকল্প পরিবহণের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়—সেই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন অপেক্ষার। কারণ, পরিবহণ নিয়ে টানাপড়েনের মাঝখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved