Homeকলকাতাইসকন না ‘অন্নমিত্র’? মিড–ডে মিল সরবরাহ ঘিরে হাইকোর্টে হলফনামা বনাম মন্ত্রীর বক্তব্য, প্রশ্ন বিরোধীদের

ইসকন না ‘অন্নমিত্র’? মিড–ডে মিল সরবরাহ ঘিরে হাইকোর্টে হলফনামা বনাম মন্ত্রীর বক্তব্য, প্রশ্ন বিরোধীদের

নিউজ ডেস্ক; কলকাতা পুরসভা এলাকার স্কুলগুলিতে মিড–ডে মিল সরবরাহকে কেন্দ্র করে নতুন করে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। কলকাতা হাইকোর্টে ইসকনের দেওয়া
resizeplus_Screenshot 2026-09-02 113846_edited (1)

নিউজ ডেস্ক; কলকাতা পুরসভা এলাকার স্কুলগুলিতে মিড–ডে মিল সরবরাহকে কেন্দ্র করে নতুন করে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। কলকাতা হাইকোর্টে ইসকনের দেওয়া হলফনামায় দাবি করা হয়েছে, পুরসভা এলাকার কোনও স্কুলে মিড–ডে মিল সরবরাহের সঙ্গে ইসকনের সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। এই দায়িত্বে রয়েছে ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’ নামে একটি পৃথক সংগঠন। অথচ রাজ্যের স্কুলশিক্ষা মন্ত্রী দীপক বর্মনের বক্তব্য, কলকাতা পুরসভা এলাকার স্কুলগুলিতে মিড–ডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসকনকেই। দুই পক্ষের বক্তব্যের এই ফারাক সামনে আসতেই বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছে বিরোধীরা।

মঙ্গলবার বিধানসভার প্রেস কর্ণারে এই প্রসঙ্গ তুলে সরব হয়েছে তৃণমূলের কালীঘাট শিবির এবং সিপিএম। বিরোধীদের প্রশ্ন, যদি ইসকন নিজেই হাইকোর্টে হলফনামা দিয়ে জানিয়ে থাকে যে তারা কলকাতা পুরসভা এলাকার স্কুলগুলিতে মিড–ডে মিল সরবরাহ করে না, তা হলে রাজ্য সরকার কেন ইসকনের নাম করছে? আবার রাজ্য সরকারের বক্তব্য যদি সঠিক হয়, তা হলে ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’-এর ভূমিকা ঠিক কী? এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর চেয়েছে বিরোধী শিবির।

হাইকোর্টে কী জানিয়েছে ইসকন?

কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে মিড–ডে মিল সংক্রান্ত মামলার শুনানি চলছে। সেই মামলাতেই ইসকনের পক্ষ থেকে একটি হলফনামা জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট ভাবে জানানো হয়েছে, কলকাতা পুরসভা এলাকার কোনও স্কুলে মিড–ডে মিল সরবরাহের সঙ্গে ইসকনের সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই

হলফনামায় আরও বলা হয়েছে, ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’ একটি পৃথক সংগঠন এবং কলকাতা পুরসভা এলাকার স্কুলগুলিতে মিড–ডে মিল সরবরাহের কাজ তারাই করে। অর্থাৎ, ইসকনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের নামের সঙ্গে এই পরিষেবাকে সরাসরি যুক্ত করা ঠিক নয়।

এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কারণ, রাজ্য সরকারের তরফে এতদিন যে বক্তব্য সামনে এসেছে, তার সঙ্গে হাইকোর্টে দেওয়া ওই হলফনামার বক্তব্যের মিল খুঁজে পাচ্ছে না বিরোধীরা।

কুণাল ঘোষের প্রশ্ন

বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার বিধানসভার প্রেস কর্ণারে সরব হন তৃণমূলের কালীঘাট শিবিরের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, আদালতে যদি বলা হয়ে থাকে যে মিড–ডে মিল সরবরাহের কাজ ইসকন করছে না, বরং ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’ করছে, তা হলে বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

তাঁর প্রশ্ন, ইসকন এবং ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’-এর সম্পর্ক কী এবং কেন মিড–ডে মিল সরবরাহের ক্ষেত্রে ইসকনের নাম সামনে আসছে? রাজ্য সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে আদালতে দেওয়া ইসকনের হলফনামার মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তার ব্যাখ্যাও দাবি করেছেন তিনি।

বিরোধীদের বক্তব্য, আদালতের নথিতে এক ধরনের তথ্য এবং সরকারের পক্ষ থেকে অন্য ধরনের বক্তব্য সামনে এলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বিশেষ করে সরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের জন্য নির্ধারিত মিড–ডে মিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবার ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা নিয়ে কোনও অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়।

সিপিএমের প্রশ্নে উঠল ‘আউটসোর্সিং’

এই বিতর্কে আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিএম। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী জানতে চেয়েছেন, রাজ্য সরকার যদি ইসকনকে দায়িত্ব দিয়ে থাকে বলে দাবি করে, তা হলে আদালতে অন্য একটি সংগঠনের নাম কেন উঠে আসছে?

তাঁর বক্তব্যের মূল প্রশ্ন হল, মিড–ডে মিলের মতো সরকারি পরিষেবা কোনও বেসরকারি বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে? ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’ যদি প্রকৃতপক্ষে খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকে, তা হলে তাদের সঙ্গে সরকারের চুক্তি বা দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া কী ছিল, তা প্রকাশ করা উচিত বলেও দাবি উঠেছে।

সিপিএমের তরফে আরও জানতে চাওয়া হয়েছে, ইসকনের বাইরে অন্য কোনও সংগঠন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কি না। সরকারি অর্থে পরিচালিত মিড–ডে মিল প্রকল্পে দায়িত্ব বণ্টন কী ভাবে হয়েছে, সেই বিষয়েও স্বচ্ছতা চেয়েছে বাম শিবির।

রাজ্যের পাল্টা ব্যাখ্যা

যদিও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে কোনও বিভ্রান্তি নেই বলেই জানানো হয়েছে। স্কুলশিক্ষা মন্ত্রী দীপক বর্মনের ব্যাখ্যা, ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’ এবং ‘অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশন’—দুটিই ইসকনের সঙ্গে যুক্ত সংস্থা। তাঁর দাবি, রাজ্য সরকারের সঙ্গে মায়াপুর ইসকনের চুক্তি হয়েছে এবং সেই চুক্তির ভিত্তিতেই ইসকনের সংস্থা ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’ কলকাতা পুরসভা এলাকার স্কুলগুলিতে মিড–ডে মিল সরবরাহ করছে।

অর্থাৎ, সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসকনকে সরাসরি দায়িত্ব দেওয়া এবং ইসকনের সঙ্গে যুক্ত একটি সংস্থার মাধ্যমে সেই দায়িত্ব পালন—এই দুটির মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। সরকারের দৃষ্টিতে, চুক্তিটি ইসকনের সঙ্গে হলেও মাঠপর্যায়ে খাবার সরবরাহ করছে তাদের সঙ্গে যুক্ত ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’।

মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, কোথায় কে কী বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিয়ে রাজ্য সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না। সরকারের কাছে মূল বিষয় হল, চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংস্থা মিড–ডে মিল সরবরাহ করছে এবং সেই ব্যবস্থাতেই কাজ এগোচ্ছে।

আদালতের মামলায় কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়?

মিড–ডে মিল শুধু পড়ুয়াদের দুপুরের খাবার দেওয়ার প্রকল্প নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিশুদের পুষ্টি, খাদ্যের গুণমান এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার। ফলে খাবার প্রস্তুত ও সরবরাহের দায়িত্ব কোন সংস্থার হাতে রয়েছে, সেই তথ্য স্বচ্ছ থাকা প্রয়োজন বলেই মনে করছে বিরোধী শিবির।

কলকাতা পুরসভা এলাকার একাধিক স্কুলে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পড়ুয়ার জন্য খাবার প্রস্তুত ও সরবরাহ করা হয়। সেই কাজের সঙ্গে যুক্ত সংস্থা সম্পর্কে সরকারি নথিতে কী উল্লেখ রয়েছে, চুক্তি কার সঙ্গে হয়েছে এবং মাঠে বাস্তবে কোন সংগঠন কাজ করছে—এই তিনটি বিষয় একই সূত্রে মেলে কি না, তা নিয়েই এখন রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠেছে।

হাইকোর্টে ইসকনের হলফনামা এবং রাজ্যের স্কুলশিক্ষা মন্ত্রীর বক্তব্য পাশাপাশি আসায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, আদালতের সামনে জমা দেওয়া নথির বক্তব্যের সঙ্গে সরকারের বক্তব্যের কোনও অসঙ্গতি থাকলে তা স্পষ্ট করা উচিত।

‘ইসকনের সংস্থা’ দাবি ঘিরেই বিতর্ক

রাজ্যের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’কে ইসকনের সঙ্গে সম্পর্কিত সংস্থা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ফলে ইসকনের সঙ্গে সরকারের চুক্তির অধীনে ওই সংগঠনের মাধ্যমে মিড–ডে মিল সরবরাহে কোনও সমস্যা নেই বলেই রাজ্যের দাবি।

কিন্তু বিরোধীদের বক্তব্য, শুধু কোনও সংস্থা অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত—এই দাবি করলেই সরকারি বরাত বা চুক্তির বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় না। প্রকৃত দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কে, তাদের সঙ্গে সরকারের সরাসরি কোনও চুক্তি রয়েছে কি না এবং কোন নিয়ম মেনে তাদের কাজ দেওয়া হয়েছে—এই প্রশ্নগুলির উত্তরও প্রয়োজন।

ফলে আপাতত বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—মিড–ডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব আসলে কার? ইসকন, না কি ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’?

রাজ্য সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দুটির মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। কারণ, চুক্তি ইসকনের সঙ্গে হলেও কাজ করছে ইসকনের সঙ্গে যুক্ত ‘অন্নমিত্র ফাউন্ডেশন’। অন্যদিকে, হাইকোর্টে দেওয়া হলফনামাকে সামনে রেখে বিরোধীরা চাইছে, আদালতে ইসকনের বক্তব্য এবং সরকারের বক্তব্যের মধ্যে সম্পর্কটি আরও স্পষ্ট করা হোক।

এই অবস্থায় মামলার পরবর্তী শুনানিতে বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসে কি না, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে অভিভাবক এবং পড়ুয়াদেরও।

No Comments

তাজা খবর

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved