
নিউজ ডেস্ক :বিয়ের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হল আতঙ্কে। দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের সিরিক কাউন্টির কুহেস্তাক এলাকায় একটি আবাসিক বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালীন মার্কিন হামলার ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানে বলে অভিযোগ। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের দাবি, এই ঘটনায় এক শিশুসহ অন্তত চার জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৫০ জনেরও বেশি। তবে পরবর্তী সময়ে ইরানের কিছু সরকারি সূত্রে মৃতের সংখ্যা পাঁচে পৌঁছেছে এবং আহতের সংখ্যা ৬৩ বলেও দাবি করা হয়েছে। ফলে হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা নিয়ে এখনও বিভিন্ন রিপোর্টে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
ঘটনাটি ঘিরে ইতিমধ্যেই তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে। ইরান আমেরিকাকে সতর্ক করে বলেছে, এই হামলার জন্য তাদের “কখনও না ভোলার মতো শিক্ষা” দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডসও পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তার ধ্বংসাবশেষ কুহেস্তাকের একটি আবাসিক বাড়িতে গিয়ে আঘাত করে। ওই বাড়িতেই তখন বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। হামলার অভিঘাতে বাড়িটির দেওয়াল ও জানালা ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসাবশেষ। উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের হাসপাতালে পাঠানোর কাজ শুরু করে।
ইরানি রেড ক্রিসেন্টের প্রকাশ করা ছবি ও ভিডিওতে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি এবং চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ দেখা গিয়েছে। একটি ভিডিওতে ঘটনাস্থল থেকে মানুষের চিৎকারও শোনা যায় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে মহিলা ও শিশুও রয়েছেন বলে ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি। স্থানীয় প্রশাসনের তরফে আহতদের মিনাবের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
প্রথম দিকে হরমোজগান প্রদেশের এক ডেপুটি গভর্নর জানিয়েছিলেন, ঘটনায় দু’জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন। পরে রেড ক্রিসেন্ট মৃতের সংখ্যা চার বলে জানায়। আবার পরবর্তী সময়ে সিরিক কাউন্টির গভর্নর ৬৩ জন আহত হওয়ার কথা জানান এবং অন্য একটি রিপোর্টে মৃতের সংখ্যা পাঁচ বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে হতাহতের সংখ্যায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
এই হামলার পরেই আমেরিকাকে কড়া বার্তা দিয়েছে ইরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের তরফে বলা হয়েছে, মার্কিন শত্রুর জন্য “কখনও না ভোলার মতো শিক্ষা” অপেক্ষা করছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম এই বক্তব্য প্রকাশ করেছে। তেহরানের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের উপস্থিতি থাকা একটি জায়গায় এমন হামলা অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা এবং এর জবাব দেওয়া হবে।
ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডসও একই সুরে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি জানান, ওয়াশিংটন তাদের সাম্প্রতিক হামলার জন্য অনুতপ্ত হবে। তাঁর দাবি, “আগ্রাসনকারীদের জন্য কঠোর শাস্তি” অপেক্ষা করছে।
এর পরেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পাল্টা হামলার খবর সামনে আসে। ইরানের দাবি, বাহরিন, কুয়েত ও জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ছোড়া হয়েছে। ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের এরবিলেও মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে রেভলিউশনারি গার্ডস দাবি করেছে।
জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। ইরান অবশ্য দাবি করেছে, জর্ডানে একটি মার্কিন মেরিন কর্পস ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তবে মার্কিন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সরাসরি হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত হয়নি।
কুয়েতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গতিবিধির খবর পাওয়া গিয়েছে। বাহরিনে বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজে। ফলে ইরান ও আমেরিকার সংঘাত এখন আর শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না—মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশও এর প্রত্যক্ষ প্রভাবের মধ্যে চলে এসেছে।
ওয়াশিংটনের বক্তব্য, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ডস বা আইআরজিসির সামরিক পরিকাঠামো। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ওই অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের উপর হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ঘিরে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার পরেই আমেরিকা নতুন করে হামলা শুরু করে।
মার্কিন বাহিনীর দাবি, তাদের হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সামরিক পরিকাঠামো, মাইন পাতা সংক্রান্ত সক্ষমতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার কিছু অংশকে লক্ষ্য করা হয়েছে। তবে কুহেস্তাকের বিয়েবাড়িতে হতাহতের ঘটনা নিয়ে ওয়াশিংটনের তরফে পৃথক ভাবে বিস্তারিত কোনও ব্যাখ্যা এখনও সামনে আসেনি।
এক মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর ফের সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়েছে আমেরিকা ও ইরান। তার মধ্যেই বিয়ের অনুষ্ঠানে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কুহেস্তাকের ঘটনা ঘিরে ইরানের ক্ষোভ বাড়ছে, অন্য দিকে ওয়াশিংটনও ইরানের পাল্টা হামলা নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের উপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই ওই জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, কুহেস্তাকের বিয়েবাড়িতে হামলার ঘটনা নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে ইরান-আমেরিকা সংঘাতের ভয়াবহ মানবিক দিক। একটি বেসামরিক বাড়িতে উৎসবের মুহূর্তে বিস্ফোরণ, শিশুসহ প্রাণহানি এবং অর্ধশতাধিক মানুষের আহত হওয়ার অভিযোগের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই হামলার পাল্টা জবাব কতটা ভয়াবহ হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়াবে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments