Homeদেশসন্ত্রাসবাদ কোনও স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট নয়, SCO-তে মোদীর কড়া বার্তা

সন্ত্রাসবাদ কোনও স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট নয়, SCO-তে মোদীর কড়া বার্তা

নিউজ ডেস্ক: সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আর কোনও রকম দ্বিচারিতা নয়। শুধু জঙ্গি হামলার পর নিন্দা বা প্রতিক্রিয়া জানালেই দায়িত্ব শেষ
resizeplus_AI চিত্র (1)

নিউজ ডেস্ক: সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আর কোনও রকম দ্বিচারিতা নয়। শুধু জঙ্গি হামলার পর নিন্দা বা প্রতিক্রিয়া জানালেই দায়িত্ব শেষ নয়, বরং সন্ত্রাসবাদের অর্থনৈতিক জোগান থেকে শুরু করে জঙ্গি নিয়োগ, মৌলবাদের প্রচার এবং জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয়—পুরো ব্যবস্থাটিকেই একযোগে ধ্বংস করতে হবে। সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা SCO-র মঞ্চ থেকে এমনই কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত SCO-র শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদকে বিশ্বের অন্যতম বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ-সহ বিভিন্ন সদস্য দেশের রাষ্ট্রনেতারা। সেই আন্তর্জাতিক মঞ্চেই মোদীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ও আপসহীন লড়াইয়ের প্রসঙ্গ।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল স্পষ্ট—সন্ত্রাসবাদকে বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর পিছনে যে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক কাজ করে, সেই গোটা কাঠামো ভেঙে ফেলাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

মোদী বলেন, কোনও জঙ্গি সংগঠন শুধু অস্ত্র হাতে নিয়ে হামলা চালিয়েই শক্তিশালী হয়ে ওঠে না। তাদের প্রয়োজন অর্থ, নতুন সদস্য নিয়োগের ব্যবস্থা, মতাদর্শগত প্রচার এবং নিরাপদ আশ্রয়। ফলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করতে হলে এই প্রতিটি স্তরে আঘাত হানা জরুরি।

জঙ্গি সংগঠনের আর্থিক উৎস কোথা থেকে আসছে, কীভাবে তাদের কাছে টাকা পৌঁছচ্ছে, কোন পথে নতুন সদস্য নিয়োগ করা হচ্ছে এবং কীভাবে চরমপন্থী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নাম না করলেও সেই সব দেশকে কড়া বার্তা দেওয়া হয়, যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গি সংগঠনকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদত দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, কোনও দেশের নীতির অংশ হিসেবে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করা উচিত নয়।

তাঁর বক্তব্যের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা—সন্ত্রাসবাদ কোনও দেশের ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট’ বা কৌশলগত সম্পদ হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে এই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়া থেকে পশ্চিম এশিয়া—বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় মদত, নিরাপদ আশ্রয় এবং রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ বহু বার সামনে এসেছে।

সন্ত্রাসবাদের পাশাপাশি যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক সংঘাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, যুদ্ধক্ষেত্রে কোনও সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অস্ত্রের ভাষা শেষ পর্যন্ত নতুন সংঘাত এবং অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। তাই মতপার্থক্য ও আন্তর্জাতিক বিরোধের সমাধানে আলোচনাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

কূটনীতি এবং সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে সওয়াল করে মোদী বলেন, বর্তমান বিশ্বের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার যুগে একটি অঞ্চলের সংঘাত আর শুধুমাত্র সেই এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার চলতি অস্থিরতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাব সরাসরি জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর পড়ে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলেও তৈরি হয় চাপ।

এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে উন্নয়নশীল এবং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির উপর। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে সমস্যা—এই সমস্ত বিষয় সাধারণ মানুষের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

আফগানিস্তানের শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও ভারতের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘদিনের সংঘাতের পরে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি শুধু দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার জন্য নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

একই সঙ্গে মাদক পাচার এবং সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে SCO-ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন মোদী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার এবং সংগঠিত অপরাধের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই পারস্পরিক যোগসূত্র রয়েছে। ফলে একে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে না দেখে সম্মিলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে মোকাবিলা করতে হবে।

নিরাপত্তার প্রশ্নের পাশাপাশি SCO-র সদস্য দেশগুলির মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে উন্নয়ন এবং সংযোগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করার কথাও স্পষ্ট করেন তিনি।

অর্থাৎ, শুধু রাস্তা, রেল বা বাণিজ্যিক করিডর তৈরি করাই যথেষ্ট নয়—আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার উপর।

সব মিলিয়ে SCO-র মঞ্চ থেকে ভারতের বার্তা ছিল বহুমাত্রিক। একদিকে সন্ত্রাসবাদের সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক ধ্বংসের ডাক, অন্যদিকে যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতির উপর জোর। পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা, মাদক পাচার এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলিকেও একই আলোচনার পরিসরে নিয়ে আসেন প্রধানমন্ত্রী।

শেষ পর্যন্ত ভারতের অবস্থান স্পষ্ট—সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনও ‘সিলেক্টিভ অ্যাপ্রোচ’ বা বেছে বেছে পদক্ষেপ গ্রহণ করা চলবে না। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান হতে হবে ঐক্যবদ্ধ, নিরপেক্ষ এবং আপসহীন।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved