
নিউজ ডেস্ক; রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু যে দুই রাজনৈতিক নেতার সম্পর্ক একসময় এতটাই তিক্ত ছিল যে, প্রকাশ্য মঞ্চে একে অপরকে নিশানা করতে দেখা যেত, তাঁদের হঠাৎ একসঙ্গে দেখা গেলে জল্পনা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। কোচবিহারে তেমনই ঘটেছে। বর্তমান তৃণমূল সাংসদ জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া এবং প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ নিশীথ প্রামাণিকের একান্ত সাক্ষাৎ ঘিরে এখন সরগরম জেলার রাজনৈতিক মহল। দু’জনের একসঙ্গে ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
সূত্রের খবর, কলকাতায় জলসম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়ন দপ্তরে এই সাক্ষাৎ হয়েছে। শনিবার সকালে নিশীথের দপ্তরে গিয়ে তাঁকে সংবর্ধনা দেন জগদীশ। শুধু সাক্ষাৎ নয়, দু’জনের মধ্যে সৌজন্য বিনিময়ের ছবিও প্রকাশ্যে এসেছে। সেই ছবির একটিতে দেখা যাচ্ছে, জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া নিশীথকে উত্তরীয় পরিয়ে দিচ্ছেন। পরে একটি দেবমূর্তি তাঁর হাতে তুলে দিতেও দেখা যায় তাঁকে। আর এই ছবি প্রকাশ্যে আসতেই কোচবিহারের রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি পুরনো তিক্ততার বরফ গলছে?
কারণ, কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দু’জনের রাজনৈতিক সম্পর্ককে কার্যত ‘সাপে-নেউলে’ বলেই বর্ণনা করতেন স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের অনেকে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহার কেন্দ্রে বিজেপির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন নিশীথ প্রামাণিক। সেই নির্বাচনে তিনি তৃণমূলের জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়ার কাছে পরাজিত হন। নির্বাচনের আগে এবং পরে দুই শিবিরের রাজনৈতিক সংঘাতও ছিল যথেষ্ট তীব্র।
লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দুই নেতার সম্পর্ক আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। এমনকি জগদীশচন্দ্রের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করেছিলেন নিশীথ। নির্বাচনী ফলাফল এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও সেই সময় নানা অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ সামনে এসেছিল।
তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোচবিহারের প্রশাসনের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছিল বিজেপি। কোচবিহারের তৎকালীন জেলাশাসক বিজেপির প্রার্থীকে হারাতে ভূমিকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছিলেন রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ফলে লোকসভা ভোটকে কেন্দ্র করে কোচবিহারে তৃণমূল-বিজেপি সংঘাত যে জায়গায় পৌঁছেছিল, তার মধ্যে নিশীথ এবং জগদীশের সম্পর্কের তিক্ততাও ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়।
সেই অতীতের সঙ্গে শনিবারের ছবি তাই রাজনৈতিক ভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন জেলার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। যাঁদের মধ্যে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিরোধ ছিল, তাঁদেরই এবার পাশাপাশি দেখা গেল। একে অপরের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় তো বটেই, জগদীশের তরফে নিশীথকে উত্তরীয় পরিয়ে সংবর্ধনা দেওয়ার ছবিও সামনে এসেছে।
ঘটনার পর বিজেপির একাধিক নেতা তাঁদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিশীথ এবং জগদীশের ছবি পোস্ট করেছেন। দু’টি ছবি ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিগুলি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। কেউ এটিকে নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছেন, আবার কারও মতে এর পিছনে রাজনৈতিক কোনও বার্তা থাকতে পারে।
তবে শুধু একটি সাক্ষাৎ বা সংবর্ধনার ছবি থেকেই দুই নেতার রাজনৈতিক অবস্থান বদলে গিয়েছে, এমনটা বলার মতো কোনও তথ্য এখনও সামনে আসেনি। তৃণমূল এবং বিজেপি—দুই দলই জাতীয় ও রাজ্য রাজনীতিতে এখনও পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। কোচবিহারেও দুই দলের রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত রয়েছে। ফলে এই সাক্ষাৎ ভবিষ্যতে কোনও রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত কি না, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন।
রাজনীতিতে অবশ্য এমন সৌজন্য সাক্ষাৎ নতুন নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও প্রশাসনিক বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যে সাক্ষাৎ হতে দেখা যায়। কখনও কখনও সেই সাক্ষাৎ থেকেই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জল্পনাও তৈরি হয়। কোচবিহারের ক্ষেত্রেও আপাতত তেমনই একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে নিশীথ প্রামাণিক এবং জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়ার অতীত রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা মাথায় রাখলে শনিবারের সাক্ষাতের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। লোকসভা নির্বাচনে তাঁরা ছিলেন সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী। ভোটের ময়দানে একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণও হয়েছে। ভোটের ফলাফলও দুই নেতার রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন করে সামনে এনেছিল। সেই ঘটনার পর আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল বিরোধ।
কিন্তু সময় বদলেছে। রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এসেছে পরিবর্তন। বিভিন্ন জায়গায় একসময়ের প্রবল বিরোধীদের মধ্যে সৌজন্য সাক্ষাৎ কিংবা একসঙ্গে ছবি সামনে আসতে দেখা যাচ্ছে। কোচবিহারের এই ঘটনাকেও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখছেন অনেকে।
জগদীশের নিশীথের দপ্তরে যাওয়া এবং তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার বিষয়টি তাই এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ছবিগুলি সামনে আসার পর থেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে উঠছে নানা প্রশ্ন। দুই নেতার মধ্যে কি শুধুই সৌজন্য? নাকি প্রশাসনিক কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনেই এই সাক্ষাৎ? ভবিষ্যতে এর কোনও রাজনৈতিক প্রভাব পড়বে কি না? উত্তর মেলেনি কোনও প্রশ্নেরই।
অন্য দিকে, দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যেও ছবিটি নিয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও ব্যক্তিগত সৌজন্য বজায় রাখাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচয়। আবার রাজনৈতিক মহলের অন্য অংশ মনে করছে, আগামী দিনে কোচবিহারের রাজনীতিতে কোনও নতুন সমীকরণ তৈরি হলে শনিবারের এই সাক্ষাৎকে তার প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হতে পারে।
তবে আপাতত নিশ্চিত ভাবে যা জানা যাচ্ছে, তা হল—একসময় যাঁদের সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রবল চর্চা ছিল, সেই নিশীথ প্রামাণিক এবং জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া একই জায়গায় দেখা করেছেন এবং তাঁদের সৌজন্য সাক্ষাতের ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। উত্তরীয় পরানো থেকে দেবমূর্তি তুলে দেওয়া—ছবির প্রতিটি মুহূর্তই এখন রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়।
কোচবিহারের রাজনীতিতে আগামী দিনে এই সাক্ষাতের কোনও বাস্তব প্রভাব পড়ে কি না, সেটাই এখন দেখার। আপাতত দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর এই আকস্মিক সৌজন্যই জেলার রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments