
নিউজ ডেস্ক; ঘন সবুজ শালবনের বুক চিরে চলে গিয়েছে পিচের রাস্তা। রাস্তার দু’পাশে অরণ্যের অপরূপ সৌন্দর্য। ঝাড়গ্রাম শহরে ঢোকার মুখে এমন দৃশ্য দেখলেই গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে নেমে পড়েন পর্যটকেরা। কিন্তু জঙ্গলের রাস্তায় এ ভাবে আচমকা গাড়ি দাঁড় করানোয় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে। সেই সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে এবার শালবনের ফাঁকা জায়গায় তৈরি হতে পারে বিশেষ ‘সেলফি পয়েন্ট’।
তবে এই সেলফি পয়েন্ট নিছক ছবি তোলার জায়গা হবে না। সেখানে থাকবে বড় করে ‘ঝাড়গ্রাম’ লেখা সাইনবোর্ড। তার আশপাশে দেখা যাবে হাতি, ময়ূর, হরিণ, ভালুক, শেয়ালের কৃত্রিম মূর্তি। পর্যটকেরা সেই মূর্তিগুলির সঙ্গে ছবি তুলতে পারবেন। পাশাপাশি তাঁদের জন্য থাকবে চা এবং ফাস্ট ফুডের স্টল। জঙ্গলমহলের নিজস্ব হস্তশিল্প ও স্থানীয় সামগ্রী বিক্রির জন্য তৈরি করা হবে বিপণনকেন্দ্রও। ফলে ছবি তোলার পাশাপাশি খাওয়াদাওয়া এবং কেনাকাটার সুযোগও মিলবে পর্যটকদের।
আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় মানুষের জন্যও তৈরি হতে পারে নতুন আয়ের পথ। দোকান, খাবারের স্টল, হস্তশিল্প বিক্রির কেন্দ্র থেকে শুরু করে পর্যটনকেন্দ্রিক বিভিন্ন পরিষেবায় স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঝাড়গ্রামের বিধায়ক লক্ষ্মীকান্ত সাউয়ের উদ্যোগেই এই পরিকল্পনা নিয়ে বন দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝাড়গ্রামের পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতেই এই উদ্যোগ।
ঝাড়গ্রাম শহরের প্রবেশপথের কলাবনি এলাকা এমনিতেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। লোধাশুলি থেকে ঝাড়গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার রাস্তার দু’পাশে বিস্তীর্ণ শালবন। কোথাও ঘন জঙ্গল, কোথাও রাস্তার ধারে তুলনামূলক ফাঁকা জায়গা। পর্যটকদের কাছে এই পথ নিজেই যেন একটি দর্শনীয় স্থান। বেলপাহাড়ির পাহাড়, ঝরনা এবং জঙ্গল ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের অনেকেই ঝাড়গ্রাম শহরে ঢোকার সময় এই অরণ্যপথে গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলেন।
বিধায়কের দাবি, সমস্যাটা সেখানেই। জঙ্গলের রাস্তায় নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া গাড়ি থামানো হলে অন্য গাড়ির যাতায়াতে সমস্যা হতে পারে। পাশাপাশি পর্যটকেরা অসাবধান হলে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। সেই কারণেই পর্যটকদের ছবি তোলার ইচ্ছাকে নিরাপদ একটি নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
লক্ষ্মীকান্তের কথায়, লোধাশুলি থেকে ঝাড়গ্রাম শহর পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তার সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বিভিন্ন জায়গায় তাঁরা গাড়ি থামিয়ে দেন। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে ওই পথের চারটি জায়গায় সেলফি পয়েন্ট তৈরির বিষয়ে বন দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
প্রস্তাবিত সেলফি পয়েন্টগুলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হবে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মাণ। বিধায়কের দাবি, এই প্রকল্পের জন্য কোনও গাছ কাটা হবে না। জঙ্গলের মধ্যে ইতিমধ্যেই যেখানে ফাঁকা জায়গা রয়েছে, সেই জায়গাগুলিই চিহ্নিত করা হবে। সেখানেই প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড় সাইনবোর্ডের পাশাপাশি কৃত্রিম বন্যপ্রাণীর মূর্তি বসানো হবে। হাতি, ময়ূর, হরিণ, ভালুক এবং শেয়ালের মতো জঙ্গলমহলের পরিচিত প্রাণীদের মূর্তি পর্যটকদের ছবি তোলার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে বাস্তব বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা না করেই পর্যটকেরা জঙ্গলের আবহ উপভোগ করতে পারবেন।
এখানে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঝাড়গ্রামের জঙ্গল শুধুমাত্র পর্যটনের জায়গা নয়, এটি বন্যপ্রাণীরও আবাসস্থল। বিশেষ করে হাতির যাতায়াতের করিডর রয়েছে এই অঞ্চলে। সন্ধ্যার পর অনেক সময় হাতি রাস্তার উপরে উঠে আসে। ফলে জঙ্গলের ভিতরে পর্যটকদের অবাধ চলাচল বা যেখানে-সেখানে গাড়ি দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি থেকেই যায়।
ঝাড়গ্রামের পর্যটন ব্যবসায়ীরাও তাই পরিকল্পনাটিকে স্বাগত জানালেও নিরাপত্তার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। ঝাড়গ্রাম ট্যুরিজমের কর্ণধার সুমিত দত্তের মতে, কলাবনি থেকে বাঁদরভুলা পর্যন্ত রাস্তার বিভিন্ন অংশে পর্যটকেরা গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলেন। নির্দিষ্ট জায়গায় সেলফি পয়েন্ট তৈরি হলে পর্যটকেরা যেমন খুশি হবেন, তেমনই রাস্তার উপরে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে গাড়ি থামানোর প্রবণতাও কমতে পারে।
তবে তাঁর মতে, সেলফি পয়েন্ট তৈরির আগে বেশ কিছু নিয়ম নির্ধারণ করা জরুরি। কারণ ওই জঙ্গল এলাকায় হাতির করিডর রয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর হাতির দল রাস্তার দিকে চলে আসার প্রবণতা দেখা যায়। তাই কোন জায়গায় পর্যটকেরা দাঁড়াবেন, কখন সেখানে প্রবেশ করা যাবে এবং বন্যপ্রাণী দেখা গেলে কী ভাবে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে— এই বিষয়গুলিতে স্পষ্ট নির্দেশিকা প্রয়োজন।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, ঝাড়গ্রামের পর্যটনের অন্যতম বড় সম্পদই হল তার অরণ্য ও বন্যপ্রকৃতি। তাই পর্যটন বাড়াতে গিয়ে যেন জঙ্গলের স্বাভাবিক পরিবেশের ক্ষতি না হয়, সেই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সেলফি পয়েন্ট যদি সেই পরিকল্পনা মেনেই তৈরি হয়, তা হলে এটি পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
ইতিমধ্যেই ঝাড়গ্রামে পর্যটনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বেলপাহাড়ির পাহাড়, ঝরনা, শালবন এবং জঙ্গলের টানে শীতের মরসুমে যেমন পর্যটকদের ভিড় হয়, তেমনই বর্ষাতেও প্রকৃতিপ্রেমীদের আনাগোনা বাড়ে। স্বাধীনতা দিবসের ছুটিতেও ঝাড়গ্রামের হোটেল, রিসর্ট এবং হোমস্টেগুলিতে পর্যটকদের ভিড় ছিল বলে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের দাবি।
এই পরিস্থিতিতে নতুন সেলফি পয়েন্টের সঙ্গে স্থানীয় খাবার এবং হস্তশিল্পের বিপণনকেন্দ্র যুক্ত হলে পর্যটনের আর্থিক সুফল স্থানীয় মানুষের কাছেও পৌঁছতে পারে। পর্যটকেরা যদি সেখানে দাঁড়িয়ে চা-জলখাবার খান বা স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি সামগ্রী কেনেন, তাহলে সরাসরি উপকৃত হবেন এলাকার ছোট ব্যবসায়ী এবং কারিগরেরা।
স্থানীয় বাসিন্দারাও সেই সম্ভাবনাই দেখছেন। কলাবনি এলাকার বাসিন্দা দশরথ মুর্মুর কথায়, পর্যটকদের ভিড় বাড়লে এলাকায় নতুন দোকান তৈরি হতে পারে। স্থানীয়দের জন্য ব্যবসার সুযোগ বাড়বে। ফলে রোজগারের জন্য প্রতিদিন ঝাড়গ্রাম শহরে গিয়ে দিনমজুরি করার প্রয়োজন কমতে পারে। বাড়ির কাছেই উপার্জনের সুযোগ তৈরি হলে গ্রামের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়বে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে তাই পর্যটন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে একই সুতোয় বাঁধার চেষ্টা রয়েছে। এক দিকে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ছবি তোলার জায়গা, অন্য দিকে খাবার ও কেনাকাটার ব্যবস্থা। তার সঙ্গে স্থানীয় হস্তশিল্পের প্রচার এবং কর্মসংস্থান— সব মিলিয়ে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ঝাড়গ্রামের পর্যটন মানচিত্রে নতুন সংযোজন হতে পারে।
তবে পুরো প্রকল্পটি সফল করতে গেলে পরিবেশ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। জঙ্গলের গাছ কেটে বা বন্যপ্রাণীর চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে কোনও পরিকাঠামো তৈরি হলে তার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হতে পারে। তাই ফাঁকা জায়গা বেছে নিয়ে নির্মাণ, পর্যটকদের নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখা এবং হাতির করিডরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা— এই বিষয়গুলির উপরেই নির্ভর করবে প্রকল্পের সাফল্য।
বিধায়ক লক্ষ্মীকান্ত সাউয়ের আশা, চারটি সেলফি পয়েন্ট তৈরি হলে পর্যটকদের ঝাড়গ্রামে ঢোকার অভিজ্ঞতাই বদলে যাবে। শুধু জঙ্গল দেখে চলে যাওয়া নয়, নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে স্মৃতি ধরে রাখা, স্থানীয় খাবার খাওয়া এবং জঙ্গলমহলের শিল্পসামগ্রী কেনার সুযোগও পাবেন তাঁরা।
শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটাই এখন দেখার। তবে পরিকল্পনাটি সফল হলে ঝাড়গ্রামের শালবনের সৌন্দর্যকে নিরাপদ পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি স্থানীয়দের জন্যও তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের দরজা। অরণ্যের সৌন্দর্য থাকবে অক্ষত, আর পর্যটকের সেলফিও উঠবে— এমনই লক্ষ্য প্রশাসনের।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments