Homeহুগলিগোঘাটবিজেপি বিধায়কের হাতে রাখি তৃণমূল প্রধানের, গোঘাট পঞ্চায়েত কি এ বার ‘সচল’ হবে?

বিজেপি বিধায়কের হাতে রাখি তৃণমূল প্রধানের, গোঘাট পঞ্চায়েত কি এ বার ‘সচল’ হবে?

নিউজ ডেস্ক; রাখির সুতোয় কি বদলাবে গোঘাটের রাজনৈতিক সমীকরণ? বিজেপি বিধায়ক থেকে দলের নেতা-কর্মী— সকলের হাতেই রাখি পরালেন তৃণমূলের পঞ্চায়েত
resizeplus_Screenshot 2026-08-29 135327_edited

নিউজ ডেস্ক; রাখির সুতোয় কি বদলাবে গোঘাটের রাজনৈতিক সমীকরণ? বিজেপি বিধায়ক থেকে দলের নেতা-কর্মী— সকলের হাতেই রাখি পরালেন তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান। রাখিবন্ধনের দিনে গোঘাটে এমনই এক ভিন্ন ছবি ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক জল্পনা। একদিকে বিজেপির উদ্যোগে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান, অন্য দিকে বিজেপি বিধায়কের হাতে নিজে রাখি পরিয়ে দিলেন তিনি। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, বিষয়টি কি নিছক সৌজন্য এবং উৎসবের অংশ, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় রাজনীতির কোনও নতুন সমীকরণ?

রাখিবন্ধন উপলক্ষে গোঘাট থানা সংলগ্ন বাসস্ট্যান্ডের সামনে যুবকল্যাণ দপ্তরের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সকাল থেকেই অনুষ্ঠান ঘিরে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। পঞ্চায়েতের বিজেপি সদস্য তথা বিরোধী দলনেতা থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত বা পঞ্চায়েত সমিতির কোনও সাংগঠনিক পদে না থাকা দলের কর্মী-সমর্থকদেরও অনুষ্ঠান পরিচালনায় সক্রিয় দেখা যায়।

জাতীয় সঙ্গীত এবং ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর স্থানীয় বাসিন্দা এবং পথচলতি মানুষজনের হাতে রাখি পরিয়ে দেন বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা। রাখি পরানোর পাশাপাশি অনেককে মিষ্টিমুখও করানো হয়। এলাকার আশাকর্মী এবং আইসিডিএস কর্মীদেরও অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা যায়। উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

তবে অনুষ্ঠানটির মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠেন গোঘাটের বিজেপি বিধায়ক প্রশান্ত দিগার এবং গোঘাট গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান সান্ত্বনা মান্না। কারণ, বিজেপির আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে শুধু দর্শকের ভূমিকায় থাকেননি তৃণমূল প্রধান। বিজেপি বিধায়ক এবং দলের নেতা-কর্মীদের হাতে রাখি পরিয়েছেন তিনি।

বিশেষ করে বিজেপি বিধায়ক প্রশান্ত দিগারের হাতে তৃণমূল প্রধানের রাখি পরানোর দৃশ্য নজর কেড়েছে। শুধু বিধায়কই নন, বিজেপির আরামবাগ সাংগঠনিক জেলার প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ তথা দলের সদস্য শিশির রায়ের হাতেও রাখি বেঁধে দেন সান্ত্বনা। ফলে উৎসবের আবহের মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।

কারণ, গোঘাট গ্রাম পঞ্চায়েতের কাজকর্ম নিয়ে এর আগেও নানা অভিযোগ সামনে এসেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। গ্রামবাসীদের একাংশের অভিযোগ, পঞ্চায়েত প্রধান নিয়মিত পঞ্চায়েতে আসেন না। এর ফলে বিভিন্ন পরিষেবা এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। পঞ্চায়েতের দৈনন্দিন কাজের গতি কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষকেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

এই পরিস্থিতিতে বিজেপি বিধায়ক এবং তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তৃণমূল প্রধানের এমন প্রকাশ্য সৌজন্য রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, পঞ্চায়েতের কাজকর্ম যদি সত্যিই দীর্ঘদিন ধরে বাধার মুখে থাকে, তা হলে বিরোধী দলের বিধায়ক এবং কর্মীদের সঙ্গে প্রধানের এই যোগাযোগ ভবিষ্যতে প্রশাসনিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কোনও ভূমিকা নেয় কি না, সেটাই দেখার।

তবে গোটা ঘটনাকে রাজনৈতিক রং দিতে নারাজ দু’পক্ষই। বিজেপি বিধায়ক প্রশান্ত দিগারের বক্তব্য, সরকারি অনুষ্ঠানে দলীয় বিভাজনকে সামনে রাখা তাঁদের নীতি নয়। তাঁর দাবি, বিজেপির অনুষ্ঠানে যে কেউ যোগ দিতে পারেন এবং সেই কারণেই তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানও অনুষ্ঠানে এসেছিলেন।

প্রশান্ত দিগার বলেন, এটাই বিজেপির সংস্কৃতি— সরকারের অনুষ্ঠানে দলাদলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। প্রধান অনুষ্ঠানে আসায় উৎসব আরও প্রাণবন্ত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে অন্তত এমন কোনও ইঙ্গিত নেই যে এই ঘটনাকে রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে দেখা উচিত।

অন্য দিকে, তৃণমূল পঞ্চায়েত প্রধান সান্ত্বনা মান্নাও সরাসরি রাজনৈতিক জল্পনা খারিজ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, রাখিবন্ধনের মতো একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবের সঙ্গে রাজনীতিকে মেলানো উচিত নয়। ভাই-বোনের সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেই তিনি এই উৎসবে যোগ দিয়েছেন এবং বিজেপি বিধায়ক ও অন্যদের হাতে রাখি পরিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

সান্ত্বনার দাবি, কারও হাতে রাখি পরানোর মধ্যে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। তাঁর মতে, সকলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই কাম্য। সেই সামাজিক সম্পর্কের জায়গা থেকেই তিনি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।

কিন্তু রাজনৈতিক মহলে জল্পনা থামছে না। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় রাজনীতিতে দলীয় বিরোধ অনেক সময় পঞ্চায়েতের দৈনন্দিন কাজেও প্রভাব ফেলে। কোথাও বিরোধী দল এবং শাসক দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে সংঘাতের অভিযোগ ওঠে, আবার কোথাও প্রশাসনিক কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। গোঘাটের ক্ষেত্রেও এই রাখিবন্ধন কি ভবিষ্যতে এমন কোনও সমন্বয়ের ইঙ্গিত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বিশেষ করে পঞ্চায়েতের কাজকর্ম নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের যে অভিযোগ রয়েছে, তার সঙ্গে এই ঘটনার যোগসূত্র খুঁজছেন অনেকেই। গ্রামবাসীদের একাংশের বক্তব্য, পঞ্চায়েত প্রধান নিয়মিত অফিসে না এলে সাধারণ মানুষের পরিষেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং নাগরিক পরিষেবার কাজেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

তাই প্রশ্ন উঠেছে, বিজেপি বিধায়কের হাতে রাখি পরানোর পর কি পঞ্চায়েতের কাজকর্মে কোনও পরিবর্তন দেখা যাবে? বিরোধী দলের বিধায়ক এবং পঞ্চায়েত প্রধানের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে কি স্থানীয় প্রশাসনিক সমস্যাগুলি দ্রুত সমাধানের পথে যাবে? নাকি রাখিবন্ধনের দিনের এই সৌজন্য সেখানেই শেষ হয়ে যাবে?

আরও একটি বিষয় নজর কেড়েছে— অনুষ্ঠানটি ছিল সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত। যুবকল্যাণ দপ্তরের সহযোগিতায় আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি তাই অস্বাভাবিক নয় বলেই দাবি বিজেপির। দলের বিধায়কের বক্তব্যেও সেই বার্তাই স্পষ্ট। তাঁর মতে, সরকারি অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সকলে অংশ নিতে পারেন।

তৃণমূল প্রধানের বক্তব্যও অনেকটা একই জায়গায়। তিনি রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে রাখির সামাজিক তাৎপর্যকে সামনে রেখেছেন। তাঁর মতে, রাখি এমন একটি উৎসব, যেখানে সম্পর্কের বন্ধনই মূল কথা। তাই বিজেপি বিধায়কের হাতে রাখি পরানোকে রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়।

তবু স্থানীয় রাজনীতিতে প্রতীকী ঘটনাও অনেক সময় বড় বার্তা বহন করে। বিশেষ করে যখন কোনও পঞ্চায়েতের কাজকর্ম নিয়ে অভিযোগ রয়েছে এবং একই সময়ে শাসক দলের এক জনপ্রতিনিধিকে বিরোধী দলের অনুষ্ঠানে সক্রিয় ভাবে অংশ নিতে দেখা যায়, তখন স্বাভাবিক ভাবেই তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়।

গোঘাটের ক্ষেত্রেও এখন নজর থাকবে আগামী দিনের পঞ্চায়েতের কাজকর্মের দিকে। গ্রামবাসীদের অভিযোগ অনুযায়ী প্রশাসনিক কাজ যদি সত্যিই থমকে থাকে, তা হলে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় কি না, সেটাই আসল পরীক্ষা। বিজেপি বিধায়ক এবং তৃণমূল প্রধানের মধ্যে রাখির সৌজন্য কি বাস্তব প্রশাসনিক সহযোগিতায় পরিণত হয়, নাকি ঘটনাটি শুধুই একটি উৎসবের মুহূর্ত হয়ে থেকে যায়— উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে।

রাখিবন্ধনের দিনে তাই গোঘাটে শুধু ভাই-বোনের সম্পর্কের সুতোই বাঁধা হয়নি, সেই সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে স্থানীয় রাজনীতির নানা প্রশ্নও। তৃণমূল প্রধান বলছেন, রাজনীতি নেই; বিজেপি বিধায়ক বলছেন, দলীয় বিভাজন না রেখে সরকারি অনুষ্ঠান সকলের জন্য। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের কৌতূহল এখন অন্য জায়গায়— রাখির বন্ধন কি সত্যিই গোঘাট পঞ্চায়েতের কাজের গতি বাড়াবে?

আগামী দিনগুলিতে পঞ্চায়েতের কাজকর্মে তার কোনও প্রতিফলন দেখা যায় কি না, আপাতত সেদিকেই নজর গোঘাটবাসীর।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved