Homeউত্তর ২৪ পরগনাপানিহাটিএকসময় পানিহাটির ‘সর্বেসর্বা’, এখন থানার লকআপে বাবা-ছেলে! নির্মল-তীর্থঙ্করকে ঘিরে চর্চা

একসময় পানিহাটির ‘সর্বেসর্বা’, এখন থানার লকআপে বাবা-ছেলে! নির্মল-তীর্থঙ্করকে ঘিরে চর্চা

Screenshot 2026-08-29 121205_edited

নিউজ ডেস্ক; একটা সময় পানিহাটিতে তাঁদের নামই ছিল যথেষ্ট। রাজনৈতিক প্রভাব থেকে স্থানীয় স্তরে দাপট— সব ক্ষেত্রেই প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ এবং তাঁর ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষ ওরফে পুচির যথেষ্ট প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ। তাঁদের সমীহ করে চলতেন অনেকেই। বিরোধীদের অভিযোগ, তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পুলিশ-প্রশাসনের উপরেও ছিল কার্যত নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু সময় বদলেছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই ছবিও আমূল পাল্টে গিয়েছে। তোলাবাজি, ভয় দেখানো থেকে শুরু করে একাধিক অভিযোগে প্রথমে গ্রেফতার হন তীর্থঙ্কর। পরে আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর দেহ লোপাটের অভিযোগে ওডিশা থেকে গ্রেফতার করা হয় নির্মল ঘোষকেও। আদালতের নির্দেশে বর্তমানে দু’জনেই পুলিশ হেফাজতে। সময়ের পরিহাসে বাবা ও ছেলের ঠিকানা এখন একই— খড়দহ থানার লকআপ।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আরজি কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসকের দেহ লোপাটের মামলায় গত ১৩ অগস্ট থেকে নির্মল ঘোষকে খড়দহ থানার লকআপে রাখা হয়েছে। সেই মামলার তদন্তের মধ্যেই এক প্রোমোটারের কাছ থেকে তোলা আদায়ের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তাঁকে ফের পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয় ব্যারাকপুর আদালত। গত শনিবার আদালত নির্মলের সাত দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়। ফলে আপাতত থানার লকআপেই দিন কাটছে তাঁর।

তীর্থঙ্করের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই রকম। সোদপুরের রাজা রোডের কাছে গোপাল বর্মন নামে এক ব্যক্তির বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় গত ২৫ অগস্ট তাঁকে তিন দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। সেই সূত্রেই খড়দহ থানার লকআপে রয়েছেন তিনি। এর মধ্যেই শুক্রবার তাঁকে ব্যারাকপুর আদালতে হাজির করা হয়। লটারি প্রতারণা সংক্রান্ত একটি মামলায় তাঁকে ‘শোন অ্যারেস্ট’ দেখিয়ে ফের সাত দিনের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

ফলে একই সময়ে বাবা ও ছেলে দু’জনকেই থাকতে হচ্ছে খড়দহ থানার লকআপে। যে রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের একসময় এলাকায় যথেষ্ট প্রভাবশালী বলে মনে করা হত, তাঁদের এখন অন্যান্য অভিযুক্তের মতোই পুলিশের হেফাজতে থাকতে হচ্ছে। এই পরিবর্তন নিয়েই পানিহাটির রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।

পুলিশের দাবি, প্রাক্তন বিধায়ক বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নির্মল ঘোষকে কোনও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। একই নিয়ম প্রযোজ্য তাঁর ছেলে তীর্থঙ্করের ক্ষেত্রেও। লকআপে অন্য বিচারাধীন বন্দিরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান, বাবা-ছেলেকেও সেই ব্যবস্থার মধ্যেই থাকতে হচ্ছে বলে পুলিশের বক্তব্য।

লকআপের ভিতরে কখনও বাবা-ছেলেকে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। আবার কখনও কম্বল পেতে বিশ্রাম নিচ্ছেন তাঁরা। পোশাকেও রয়েছে সাধারণত্ব। নির্মল ঘোষ লকআপে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরেই থাকছেন বলে পুলিশ সূত্রে খবর। তীর্থঙ্করকে দেখা যাচ্ছে মূলত প্যান্ট এবং টি-শার্টে।

খাবারের ক্ষেত্রেও তাঁদের জন্য আলাদা কোনও ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রতিদিন সকালে চা-বিস্কুট এবং ব্রেকফাস্ট দেওয়া হচ্ছে। দুপুর ও রাতের খাবারে থাকছে ভাত বা রুটি, ডাল, সব্জি, মাছ এবং ডিম। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনও বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না— এমনটাই পুলিশের দাবি।

তবে লকআপের পরিবেশে তাঁদের ঘুমের সমস্যা হচ্ছে বলেও জানা গিয়েছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, মেঝেতে কম্বল পেতে শুতে হচ্ছে বাবা ও ছেলেকে। বালিশের ব্যবস্থাও নেই। ফলে স্বাভাবিক ভাবে ঘুমোতে পারছেন না তাঁরা। দিনের বড় অংশ জেগেই কাটছে। তদন্তকারীরা জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে দু’জনেই খুব একটা মুখ খুলছেন না বলেও দাবি পুলিশের। একাধিক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

এক পুলিশকর্মীর বক্তব্য, পরিস্থিতিটি তাঁদের কাছেও অস্বাভাবিক। কারণ অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে যাঁদের দেখে পুলিশকর্মীরা স্যালুট করতেন, তাঁদেরই এখন লকআপের ভিতরে দেখতে হচ্ছে। ওই পুলিশকর্মীর কথায়, বিষয়টি দেখতে তাঁদেরও খারাপ লাগে। কিন্তু আইন মেনে দায়িত্ব পালন করা ছাড়া তাঁদের কোনও উপায় নেই।

লকআপের সামনে সারাক্ষণ সিসিটিভি নজরদারি রয়েছে বলেও জানিয়েছেন ওই পুলিশকর্মী। তাঁর বক্তব্য, নির্মল বা তীর্থঙ্করকে বাড়তি কোনও সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ নজরদারির মধ্যে কোনও অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদেরই সমস্যায় পড়তে হবে।

বাবা-ছেলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক আক্রমণও শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতা কৌশিক চট্টোপাধ্যায় নির্মল ও তীর্থঙ্করকে নিশানা করে কড়া মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পানিহাটি এলাকায় বাবা-ছেলে মিলে অরাজকতা চালিয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির যথাযথ বিচার হওয়া প্রয়োজন।

কৌশিকের বক্তব্য, ‘‘পাপ কখনও বাপকে ছাড়ে না।’’ তাঁর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে পানিহাটিতে যে ধরনের অন্যায় ও অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছে, তার কোনও ক্ষমা নেই। প্রতিটি অভিযোগের সঠিক তদন্ত এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার হওয়া উচিত বলেই দাবি করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, আদালত যদি তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির নির্দেশ দেয়, সেই দিনই পানিহাটির মানুষ স্বস্তি পাবেন।

তবে রাজনৈতিক অভিযোগ আর আদালতে প্রমাণিত অপরাধ— দু’টি বিষয়কে আলাদা করে দেখার কথাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্মল ঘোষ এবং তীর্থঙ্করের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের তদন্ত চলছে। তাঁরা বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

একসময় পানিহাটির রাজনীতিতে প্রবল প্রভাবশালী বলে পরিচিত বাবা-ছেলের বর্তমান অবস্থান তাই রাজনৈতিক পালাবদলের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ছবি সামনে আনছে। একদিকে একের পর এক মামলা ও পুলিশি তদন্ত, অন্যদিকে অতীতের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিরোধীদের বিস্তর অভিযোগ— সব মিলিয়ে নির্মল ঘোষ এবং তীর্থঙ্কর ঘোষকে ঘিরে বিতর্ক এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে।

যে থানার পুলিশ-প্রশাসনকে তাঁরা একসময় প্রভাবিত করতেন বলে বিরোধীদের অভিযোগ, সেই থানার লকআপেই এখন তাঁদের রাত কাটছে। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা প্রাক্তন বিধায়ক এবং টি-শার্ট-প্যান্ট পরা তাঁর ছেলে— দু’জনেই এখন একই নিয়মের আওতায়। বাইরে রাজনৈতিক তরজা যতই চলুক, লকআপের ভিতরে আপাতত তাঁদের পরিচয় একটাই— পুলিশ হেফাজতে থাকা দুই অভিযুক্ত।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved