Homeকলকাতা‘বিজেপির সঙ্গে সেটিং কার?’ টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবসে তৃণমূলের দুই শিবিরে তীব্র তরজা

‘বিজেপির সঙ্গে সেটিং কার?’ টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবসে তৃণমূলের দুই শিবিরে তীব্র তরজা

Screenshot 2026-08-28 185906_edited

নিউজ ডেস্ক; তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (টিএমসিপি) প্রতিষ্ঠা দিবস ঘিরে শুক্রবার কলকাতার রাজনীতিতে ফের প্রকাশ্যে এল তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত। ‘বিজেপির সঙ্গে সেটিং’— এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি হল কালীঘাটপন্থী তৃণমূল এবং বিদ্রোহী তৃণমূল শিবির। দুই পক্ষই একে অপরকে বিজেপির সঙ্গে বোঝাপড়া করে চলার অভিযোগ তুলল। আর এই রাজনৈতিক চাপানউতরের মাঝে বিজেপি দুই শিবিরকেই একই বন্ধনীতে রেখে পাল্টা কটাক্ষ করল। তাদের বক্তব্য, তৃণমূলের কোনও গোষ্ঠীর সঙ্গেই বিজেপির কোনও ‘সেটিং’ নেই।

টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে শুক্রবার কলকাতায় পৃথক কর্মসূচি নেয় তৃণমূলের দুই শিবির। কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের সভা হয় ক্যাথিড্রাল রোডে। অন্য দিকে, বিদ্রোহী তৃণমূলের অনুগামী ছাত্র সংগঠনের কর্মসূচি ছিল রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে। দুই সভার মঞ্চ থেকেই একে অপরকে নিশানা করা হয়। ফলে ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠা দিবসের কর্মসূচি কার্যত পরিণত হয় তৃণমূলের দুই শিবিরের রাজনৈতিক শক্তিপ্রদর্শন এবং বাকযুদ্ধের মঞ্চে।

কালীঘাটপন্থী শিবিরের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাম না করে বিদ্রোহী তৃণমূলের নেতৃত্বের দিকে আক্রমণ শানান। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ‘দলদাস’ এবং ‘গদ্দার’-এর মতো কড়া শব্দ। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘কিছু দলদাস পুষেছেন! ভাবছেন, দলদাসরা আপনাদের সাপোর্ট দিয়ে যাবে। আগামী দিন ওরাই প্রথমে বিট্রে করবে। গদ্দার যে এক বার হয়, সে চিরকাল গদ্দার হয়।’’

রাজনৈতিক মহলের একাংশের ব্যাখ্যা, মমতার এই মন্তব্যের লক্ষ্য বিদ্রোহী তৃণমূলের শিবির। দীর্ঘদিন ধরেই কালীঘাটপন্থী নেতৃত্বের তরফে অভিযোগ করা হচ্ছে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির বিজেপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করে এগোচ্ছে। যদিও বিদ্রোহী শিবির সেই অভিযোগ একাধিক বার খারিজ করেছে। শুক্রবারও তাদের বক্তব্য ছিল, বিজেপির সঙ্গে তাদের কোনও বোঝাপড়া নেই; বরং শাসক তৃণমূলের সঙ্গেই বিজেপির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ের সভা থেকে সেই পাল্টা আক্রমণই সামনে আনেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল রাজ্যে দুর্নীতির অভিযোগ এবং সেই অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন। ঋতব্রত বলেন, গত সরকারের আমলে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানাচ্ছেন। কিন্তু যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের অনেকেই এখনও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এখান থেকেই ‘সেটিং’ কতটা গভীর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলে দাবি তাঁর।

নিজেদের শিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপের প্রসঙ্গও সামনে আনেন ঋতব্রত। তাঁর দাবি, তাঁদের সঙ্গে থাকা তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাই বিভিন্ন ভাবে প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়ছেন। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি আরামবাগ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি উত্তম কুণ্ডুর জেলে থাকার প্রসঙ্গ তোলেন। পাশাপাশি বিধায়ক সমীর পাঁজার দীর্ঘ সময় বাড়িতে ফিরতে না পারার অভিযোগও করেন তিনি।

ঋতব্রতর বক্তব্য, যদি তাঁদের সঙ্গে কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের ‘সেটিং’ থাকত, তা হলে তাঁদের শিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেই কেন এমন পদক্ষেপ করা হবে? তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের সঙ্গে সেটিং, আর আমাদের নেতারাই বাড়ি ফিরতে পারছেন না— এটা কী ভাবে সম্ভব?’’

এর পাশাপাশি তাঁদের দলের নেত্রী সাবিনা ইয়াসমিনের স্বামীকে পুলিশ বার বার ডেকে পাঠাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন ঋতব্রত। সরকারি কর্মসূচিতে বিধায়ক শিউলি সাহাকে হেনস্থার অভিযোগও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। এই ঘটনাগুলিকে সামনে রেখে তাঁর প্রশ্ন, যদি সত্যিই তাঁদের সঙ্গে শাসকদলের কোনও বোঝাপড়া থাকে, তা হলে তাঁদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এমন আচরণ কেন হবে?

বিদ্রোহী শিবিরের বিরোধী দলনেতার আরও অভিযোগ, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের সঙ্গে থাকা নেতা-কর্মীরা তুলনামূলক ভাবে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছেন। অথচ তাঁদের শিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফলে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপের পাশাপাশি রাজনৈতিক ‘সেটিং’ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে বলে দাবি তাঁর।

এ দিনের দুই সভার বক্তব্যে একটি বিষয়ই স্পষ্ট— তৃণমূলের দুই শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব আরও প্রকট হয়েছে। এক পক্ষের অভিযোগ, বিরোধী শিবির বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে শাসকদলের বিরুদ্ধে রাজনীতি করছে। অন্য পক্ষের পাল্টা দাবি, আসলে কালীঘাটপন্থী তৃণমূলই বিজেপির সঙ্গে কোনও না কোনও সমীকরণে রয়েছে। অর্থাৎ ‘সেটিং’ নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের রাজনীতি এখন তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে বিজেপিও দুই তৃণমূল শিবিরকে ছেড়ে কথা বলেনি। রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার দুই পক্ষকেই একই রাজনৈতিক বন্ধনীতে রেখে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘কুচকুচে সাদা আর ধবধবে কালো, তৃণমূলের কেউ নয় ভালো।’’

অর্থাৎ বিজেপির দাবি, তৃণমূলের কোনও একটি গোষ্ঠীকে আলাদা করে ভালো বা খারাপ বলার প্রশ্নই নেই। দলের দুই শিবিরই নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে বলে বিজেপির বক্তব্য। ফলে ‘কার সঙ্গে কার সেটিং’— এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শুক্রবারের রাজনৈতিক মঞ্চে তৃণমূলের দুই শিবিরই কার্যত একে অপরের দিকে আঙুল তুলেছে।

টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবস সাধারণত ছাত্র রাজনীতি ও সংগঠনের কর্মসূচিকে ঘিরে থাকলেও এ বার তার মূল আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এল তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ। এক দিকে কালীঘাটপন্থী নেতৃত্বের বিজেপি-যোগের অভিযোগ, অন্য দিকে বিদ্রোহী শিবিরের দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন— সব মিলিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে ‘সেটিং’ শব্দটিই শুক্রবারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠল।

আগামী দিনে এই দ্বন্দ্ব কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন দেখার। বিশেষ করে বিধানসভা এবং রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দানে দুই তৃণমূল শিবিরের পরস্পরবিরোধী অবস্থান আরও স্পষ্ট হলে বিজেপি সেই সংঘাতকে কী ভাবে কাজে লাগায়, তা নিয়েও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের। আপাতত টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবসের মঞ্চ থেকে যে বার্তা স্পষ্ট, তা হল— তৃণমূলের দুই শিবিরের সংঘাত আর পর্দার আড়ালে নেই; প্রকাশ্য রাজনৈতিক মঞ্চেই তা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved