Homeহুগলিধনিয়াখালিঘরের দেওয়ালে তিন জনের মৃত্যুর দায় কার? ধনিয়াখালিতে একই পরিবারের মা-বাবা ও মেয়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার

ঘরের দেওয়ালে তিন জনের মৃত্যুর দায় কার? ধনিয়াখালিতে একই পরিবারের মা-বাবা ও মেয়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার

Screenshot 2026-08-28 171939_edited

নিউজ ডেস্ক; রাস্তার ধারে দোতলা বাড়ি। তারই একতলা ভাড়া নিয়ে কয়েক মাস ধরে বসবাস করছিল একটি পরিবার। শুক্রবার সেই বাড়ির একটি ঘর থেকেই উদ্ধার হল একই পরিবারের তিন সদস্যের ঝুলন্ত দেহ। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন বাবা, মা এবং তাঁদের কিশোরী মেয়ে। ঘটনাস্থলে একটি দেওয়ালে পেন্সিল দিয়ে লেখা কয়েকটি নাম ঘিরে আরও রহস্য তৈরি হয়েছে। ওই লেখায় পরিবারের তিন জনের মৃত্যুর জন্য রবীন্দ্রনাথ মুর্মু, ইন্দ্রাণী সিংহ রায়-সহ কয়েকজনকে দায়ী করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেটি আদৌ কোনও সুইসাইড নোট কি না, ওই ব্যক্তিরা কারা এবং তাঁদের সঙ্গে মৃত পরিবারের কী সম্পর্ক—তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

শুক্রবার হুগলির ধনিয়াখালি এলাকার সোমসপুর দুলেপাড়ায় এই ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়। মৃতদের নাম উত্তম চাঁই (৫২), তাঁর স্ত্রী রূপা চাঁই (৪৫) এবং তাঁদের মেয়ে অঙ্কিতা চাঁই (১৭)। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিবারের আদি বাড়ি ডানকুনির ভাদুয়া এলাকায়। কয়েক মাস আগে ধনিয়াখালির ওই বাড়ির একতলা ভাড়া নিয়ে সেখানে থাকতে শুরু করেছিলেন তাঁরা।

প্রতিবেশীদের বক্তব্য, চাঁই পরিবারের সদস্যরা খুব বেশি মেলামেশা করতেন না। পাড়ার অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগও ছিল সীমিত। বাড়ির দরজায় বেশিরভাগ সময় তালা দেওয়া থাকত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন। ফলে পরিবারের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আশপাশের মানুষজন খুব বেশি কিছু জানতেন না।

শুক্রবার বাড়ির ভিতর থেকে দীর্ঘ সময় কোনও সাড়াশব্দ না পাওয়াতেই প্রথম সন্দেহ তৈরি হয়। স্থানীয়দের দাবি, পরিবারের কাউকে বাইরে বেরোতে দেখা যাচ্ছিল না। বাড়ির দরজায় ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় ধনিয়াখালি থানার পুলিশ। বাড়ির ভিতরে ঢুকে একটি ঘর থেকে তিন জনের ঝুলন্ত দেহ দেখতে পাওয়া যায়। পুলিশ তিনটি দেহ উদ্ধার করে। পরে সেগুলি ময়নাতদন্তের জন্য ধনিয়াখালি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।

তবে ঘটনাস্থলে পাওয়া একটি লেখা তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যে ঘর থেকে তিন জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে, সেই ঘরের একটি দেওয়ালে পেন্সিল দিয়ে কয়েকটি নাম লেখা ছিল। সেখানে লেখা হয়েছে, তাঁদের তিন জনের মৃত্যুর জন্য রবীন্দ্রনাথ মুর্মু, ইন্দ্রাণী সিংহ রায়-সহ কয়েকজন দায়ী। এই লেখা কে লিখেছেন, কখন লেখা হয়েছে এবং এর সঙ্গে তিনটি মৃত্যুর সরাসরি কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়।

লেখাটিকে প্রাথমিক ভাবে সম্ভাব্য সুইসাইড নোটের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও পুলিশ নিশ্চিত ভাবে কিছু জানায়নি। তদন্তকারীরা দেওয়ালের ওই লেখাটি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছেন। লেখার হাতের লেখা মৃতদের কারও সঙ্গে মেলে কি না, তা যাচাই করা হতে পারে। একই সঙ্গে লেখায় যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের সঙ্গে মৃত পরিবারের কী সম্পর্ক ছিল এবং সম্প্রতি তাঁদের মধ্যে কোনও বিরোধ বা যোগাযোগ হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিবারের তিন সদস্য একসঙ্গে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কি না, প্রাথমিক তদন্তে সেই সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। ফলে ঘটনাটিকে শুধুমাত্র আত্মহত্যা হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে না। মৃত্যুর পিছনে অন্য কোনও কারণ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

পরিবারটি কোনও আর্থিক সমস্যার মধ্যে ছিল কি না, তা নিয়েও খোঁজখবর শুরু করেছে পুলিশ। ঋণ, আর্থিক চাপ, পারিবারিক সমস্যা বা অন্য কোনও কারণে তাঁরা মানসিক ভাবে চাপে ছিলেন কি না, তা জানার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা কোনও হুমকি বা ভয়ভীতির মুখে পড়েছিলেন কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে।

স্থানীয়দের কাছ থেকে পরিবারের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাঁরা কত দিন আগে বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন, কোথায় কাজ করতেন, কার কার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং সাম্প্রতিক সময়ে তাঁদের আচরণে কোনও পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।

এই ঘটনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মৃত পরিবারের ১৭ বছরের মেয়ে অঙ্কিতার মৃত্যু। বাবা-মায়ের সঙ্গে একই ঘর থেকে তাঁর দেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই এলাকায় আরও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কী পরিস্থিতিতে একটি কিশোরী-সহ পরিবারের তিন সদস্য একই সঙ্গে এমন চরম সিদ্ধান্ত নিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

প্রতিবেশীদের বক্তব্যে অবশ্য পরিবারের কোনও অস্বাভাবিক আচরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলেনি। তাঁরা জানিয়েছেন, পরিবারটি খুব বেশি সামাজিক যোগাযোগ রাখত না। কয়েক মাস আগে এলাকায় আসার পর থেকেই নিজেদের মতো থাকতেন। ফলে তাঁদের ব্যক্তিগত সমস্যা বা পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দারা কার্যত অন্ধকারেই ছিলেন।

এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, পরিবারটি কয়েক মাস আগে এলাকায় এসেছিল। পাড়ার মানুষের সঙ্গে তাঁদের তেমন মেলামেশা ছিল না। কী কারণে এমন ঘটনা ঘটল, সে সম্পর্কে তাঁরাও কিছু বলতে পারছেন না। পুলিশের তদন্তেই প্রকৃত কারণ সামনে আসবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া দেওয়ালের লেখাই এখন তদন্তকারীদের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। সেখানে উল্লেখ করা নামগুলির সঙ্গে মৃতদের যোগাযোগ কী ছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে কেন এমন অভিযোগ লেখা হল এবং মৃত্যুর আগে পরিবারের কেউ কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ওই ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হতে পারে।

পুলিশ একই সঙ্গে পরিবারের মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগ এবং অন্যান্য নথি পরীক্ষা করতে পারে। মৃত্যুর আগে তাঁদের মধ্যে বা বাইরে কারও সঙ্গে কোনও যোগাযোগ হয়েছিল কি না, তা জানা গেলে ঘটনার পটভূমি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। বাড়িতে অন্য কোনও নথি, চিঠি বা বার্তা পাওয়া গিয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ময়নাতদন্তের রিপোর্ট। তিনটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে শারীরিক প্রমাণ এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ করবে পুলিশ। পাশাপাশি দেওয়ালে লেখা নামগুলির বিষয়েও বিস্তারিত তদন্ত হবে।

একই পরিবারের তিন সদস্যের একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনায় ইতিমধ্যেই এলাকায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। সত্যিই কি পারিবারিক বা আর্থিক সমস্যার জেরে তাঁরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন, নাকি দেওয়ালে লেখা নামগুলির পিছনে রয়েছে অন্য কোনও ঘটনা—এই রহস্যের উত্তর এখনও মেলেনি। ধনিয়াখালি থানার তদন্তেই সেই উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

No Comments

    একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

    LINKS

    ABOUT US

    ফোন নম্বর

    +৯১ ৮৪২০৬৫৮৯৯৯

    আমাদের ঠিকানা

    আর্চ স্কোয়ার X2 বিল্ডিং
    কলেজ মোড়, সেক্টর ৫
    কলকাতা - ৭০০০৯১

    Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved