Homeপূর্ব মেদিনীপুরকাঁথিকাঁথির কাজু এবার হবে আরও আধুনিক, প্রক্রিয়াকরণ-বিপণনে নতুন উদ্যোগ

কাঁথির কাজু এবার হবে আরও আধুনিক, প্রক্রিয়াকরণ-বিপণনে নতুন উদ্যোগ

নিউজ ডেস্ক; কাঁথির কাজুবাদাম শিল্পে এ বার আধুনিকীকরণ এবং সরাসরি বিপণনের নতুন উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে মূলত অসংগঠিত পরিকাঠামোর উপর নির্ভর
cashew–kaju—whole-114906_l

নিউজ ডেস্ক; কাঁথির কাজুবাদাম শিল্পে এ বার আধুনিকীকরণ এবং সরাসরি বিপণনের নতুন উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে মূলত অসংগঠিত পরিকাঠামোর উপর নির্ভর করে চলা এই শিল্পকে আরও পরিকল্পিত ভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে বৃহস্পতিবার মাজনায় চালু হল নতুন পরিষেবা কেন্দ্র। যৌথ প্রকল্পের আওতায় তৈরি এই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকছে কাঁথি কবিগুরু ইন্ডাস্ট্রিয়াল কো-অপারেটিভ সোসাইটি। কাজু প্রক্রিয়াকরণের পাশাপাশি এবার বিপণনের কাজও করবে এই সমবায়। ফলে কাঁথির তৈরি কাজু সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন শিল্পের সঙ্গে যুক্তরা।

এক সময়ে পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় কাজুবাদামের বাগান ছিল। স্থানীয় পরিবেশ ও অর্থনীতির সঙ্গে এই চাষের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে বছরের পর বছর ধরে কাজুবাদামের বাগানের পরিমাণ কমেছে। তার সঙ্গে কমেছে স্থানীয় উৎপাদনও। ফলে কাঁথির বহু প্রসেসিং ইউনিটকে এখন কাজুবাদামের কাঁচামালের জন্য বাইরের রাজ্য বা আমদানির উপর নির্ভর করতে হয়।

কাঁচামালের এই নির্ভরতা সত্ত্বেও কাঁথিতে কাজুবাদামকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় শিল্পভিত্তি। কাঁথি সংলগ্ন এলাকায় বর্তমানে একশোরও বেশি কাজু প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। শুধু মাজনা এলাকাতেই প্রত্যক্ষ ভাবে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। গোটা কাঁথি মহকুমা ধরলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে কাজুবাদাম শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা এক লক্ষেরও বেশি। ফলে এই শিল্পের পরিকাঠামো উন্নয়ন শুধু ব্যবসার ক্ষেত্রেই নয়, স্থানীয় কর্মসংস্থানের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এত দিন কাজু প্রক্রিয়াকরণকে ঘিরে একাধিক ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ থাকলেও উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত একটি সুসংহত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। নতুন পরিষেবা কেন্দ্র চালুর ফলে সেই জায়গাতেই পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশা। কাঁচামাল প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং এবং বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে সমবায়ের ভূমিকা বাড়লে কাঁথির কাজুকে আরও বড় বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন।

বৃহস্পতিবার মাজনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন কেন্দ্রটির উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সেচমন্ত্রী অরূপকুমার দাস, কাঁথির সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী, পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক নিরঞ্জন কুমার, কাঁথির মহকুমাশাসক প্রতীক অশোক ধুমাল, মাঝারি ও ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প ও বস্ত্র দফতরের যুগ্ম অধিকর্তা মৌ সেন এবং কাঁথি কবিগুরু ইন্ডাস্ট্রিয়াল কো-অপারেটিভ সোসাইটির সম্পাদক কুমারেশ দাস-সহ প্রশাসন ও শিল্পক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কাজুবাদাম শিল্পের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন সেচমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, কাঁথিতে এই শিল্পের সঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়িত থাকলেও এত দিন শিল্পটির জন্য আলাদা করে তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সমবায়ের মাধ্যমে নতুন ইউনিট চালু হলে কাজের পরিধি বাড়বে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারীও কাঁথির কাজুবাদাম শিল্পকে স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কাজুবাদাম কাঁথির পরিচিতির একটি অংশ। ছোট এবং মাঝারি শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে রাজ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যেই স্থানীয় শিল্পগুলিকে আরও সংগঠিত করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জানান।

শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের বক্তব্য, কাঁথির কাজুর আলাদা পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ এবং বাজারজাতকরণের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে সেই পরিচিতিকে আরও বড় বাজারে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। অনেক ছোট ইউনিট নিজেদের মতো করে কাজ করলেও বৃহত্তর বাজারে পৌঁছনোর জন্য প্রয়োজনীয় বিপণন পরিকাঠামো সব ক্ষেত্রে ছিল না। নতুন পরিষেবা কেন্দ্র সেই ঘাটতি পূরণে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও আঞ্চলিক শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হয় না। কাঁচামালের জোগান, আধুনিক প্রযুক্তি, গুণমান বজায় রাখা, প্যাকেজিং এবং বিপণন— প্রতিটি ক্ষেত্রেই উন্নতি প্রয়োজন। কাঁথির কাজুবাদাম শিল্পের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্থানীয় বাগানের সংখ্যা কমে যাওয়ায় কাঁচামালের সমস্যা যেমন রয়েছে, তেমনই ছোট প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটগুলির সামনে বাজার সম্প্রসারণের চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

নতুন কেন্দ্রের মাধ্যমে সেই সমস্যাগুলির কিছুটা সমাধান হবে বলে আশাবাদী কাজুশিল্পের সঙ্গে যুক্তরা। বিশেষ করে সমবায়ের মাধ্যমে একাধিক ছোট উদ্যোগকে একটি ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা গেলে উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে সমন্বয় বাড়তে পারে। পাশাপাশি সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছনোর ব্যবস্থা তৈরি হলে মধ্যস্বত্বভোগীর উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।

কাজুবাদাম শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যার দিকে তাকালে এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। মাজনা এলাকায় যেখানে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল, সেখানে শিল্পটির সামান্য সম্প্রসারণও স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন ইউনিটের মাধ্যমে কাজের সুযোগ বাড়লে তরুণ প্রজন্মের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের দরজা খুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে শুধু একটি পরিষেবা কেন্দ্র চালু করলেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। কাঁথিতে কাজুবাদামের স্থানীয় চাষ ফের বাড়ানো, প্রসেসিং ইউনিটগুলিকে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা, শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজার সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে বাইরের উৎসের উপর নির্ভরতা কমবে এবং শিল্পের ভিত আরও শক্ত হবে।

এই পরিস্থিতিতে মাজনায় নতুন পরিষেবা কেন্দ্র চালু হওয়াকে কাঁথির কাজুবাদাম শিল্পের জন্য একটি নতুন সূচনা হিসাবেই দেখছেন অনেকে। দীর্ঘদিনের অসংগঠিত কাঠামো থেকে বেরিয়ে প্রক্রিয়াকরণ এবং বিপণনকে একই ব্যবস্থার মধ্যে আনার চেষ্টা শুরু হল। আগামী দিনে এই উদ্যোগ কতটা সফল হয় এবং কাঁথির কাজু কতটা বড় বাজারে পৌঁছতে পারে, তার উপরই অনেকটা নির্ভর করবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ভবিষ্যৎ।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved