Homeরাজ্যভয় নয়, ভরসার ভোট! বাংলার ভোট-সংস্কৃতি বদলের প্রতিশ্রুতি শুভেন্দুর

ভয় নয়, ভরসার ভোট! বাংলার ভোট-সংস্কৃতি বদলের প্রতিশ্রুতি শুভেন্দুর

নিউজ ডেস্ক; বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। দীর্ঘ দিনের শাসক এখন বিরোধী শিবিরে, আর ক্ষমতার কেন্দ্রে বিজেপি। কিন্তু সরকার বদলের সঙ্গে
Screenshot 2026-08-28 140007_edited

নিউজ ডেস্ক; বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। দীর্ঘ দিনের শাসক এখন বিরোধী শিবিরে, আর ক্ষমতার কেন্দ্রে বিজেপি। কিন্তু সরকার বদলের সঙ্গে কি বদলাবে বাংলার ভোটের চেনা ছবিও? রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সেটিই। কারণ পশ্চিমবঙ্গের ভোট মানেই এক সময় ছিল সংঘর্ষ, বোমা-গুলির শব্দ, বুথ দখলের অভিযোগ এবং রক্তপাতের আশঙ্কা। সেই সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করানোই এখন শুভেন্দু অধিকারী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের কাছে বড় পরীক্ষা।

মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য এই বিষয়ে যথেষ্ট আশাবাদী। তাঁর দাবি, আগামী দিনে বাংলায় কোনও নির্বাচনের সময় আর বোমা-গুলির আওয়াজ শোনা যাবে না। ভোটকে কেন্দ্র করে হিংসার যে দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস বাংলায় তৈরি হয়েছে, তা বদলানো সম্ভব বলেই মনে করছেন তিনি। বৃহস্পতিবার একটি বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের কনক্লেভে যোগ দিয়ে ভোট-সন্ত্রাস নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

শুভেন্দুর কথায়, আগামী দিনে রাজ্যে যে কোনও নির্বাচন হলেও বোমা বা গুলির আওয়াজ শোনা যাবে না। তাঁর বক্তব্য, ভোট-সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেছেন ডায়মন্ড হারবারের ফলতায় হওয়া উপনির্বাচনকে।

পুলিশমন্ত্রী হিসেবে সেটিই ছিল তাঁর প্রথম পরীক্ষা বলে উল্লেখ করেছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, ফলতায় ভোটের দিন গোটা পরিস্থিতি ছিল শান্তিপূর্ণ। টেলিভিশন খুলে সারা দিন ধরে খোঁজ করেও কোনও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলেই তাঁর বক্তব্য। তাঁর মতে, এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে বাংলায় ভোটকে ঘিরে পুরনো আতঙ্কের পরিবেশ বদলাতে শুরু করেছে।

তবে শুধু একটি উপনির্বাচনের সাফল্য দিয়ে বাংলার ভোট-সংস্কৃতি বদলে গিয়েছে, এমনটা মানতে নারাজ রাজনৈতিক মহলের একাংশ। সামনে রয়েছে আরও বড় পরীক্ষা। বছরের শেষ দিকে কলকাতা এবং হাওড়া পুরসভার নির্বাচন হওয়ার কথা। পাশাপাশি নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর বিধানসভাতেও উপনির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এই ভোটগুলিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন থাকে, বুথে ভোটাররা কতটা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন এবং কোনও হিংসার ঘটনা ঘটে কি না— তার উপরেই অনেকটা নির্ভর করবে নতুন সরকারের ভাবমূর্তি।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিই ছিল ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোট। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রচারে এসে ‘ভয় আউট’ এবং ‘ভরসা ইন’-এর বার্তা দিয়েছিলেন বলে বিজেপি সূত্রে দাবি করা হয়। একই ভাবে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও প্রচারের সময় বারবার বাংলায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কথা বলেছিলেন। তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ভোটের পরিবেশ বদলানোর প্রতিশ্রুতিও বিজেপির প্রচারের অন্যতম সুর ছিল।

এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। তৃণমূল বিরোধী দলের আসনে এবং বিজেপি সরকারে। ফলে এত দিন যে অভিযোগগুলি নিয়ে বিজেপি সরব ছিল, ক্ষমতায় এসে সেই একই অভিযোগ যেন তাদের বিরুদ্ধে না ওঠে, সেটিই এখন দলের কাছে বড় দায়িত্ব। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিরোধী অবস্থায় ভোট-সন্ত্রাস নিয়ে প্রশ্ন তোলা যতটা সহজ, ক্ষমতায় থেকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করানো তার চেয়ে অনেক কঠিন।

বিজেপির অন্দরেও সেই বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা রয়েছে। সম্প্রতি দলের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য পদ্ম নেতৃত্বকে ভোটারদের আস্থা ধরে রাখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন বলে সূত্রের খবর। সল্টলেকে রাজ্য বিজেপি দফতরে হওয়া সেই বৈঠকে তিনি দলের নেতা-কর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

দলীয় সূত্রের খবর, শমীক বলেছেন, রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মানুষ বিজেপির উপর আস্থা রেখেছেন। সেই আস্থার মর্যাদা রাখতে হবে। কোনও ভোটার বুথে গিয়ে যেন জানতে না পারেন যে তাঁর ভোট আগেই পড়ে গিয়েছে— এমন ঘটনা আর কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। ভোটারদের স্বাধীন ভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিজেপি নেতৃত্বেরই বলে তিনি বার্তা দিয়েছেন।

রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বক্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এত দিন ভোটে কারচুপি, বুথ দখল বা ভোট লুটের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বিজেপি। এবার সরকারে এসে সেই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি হলে রাজনৈতিক ভাবে তার খেসারত দিতে হতে পারে। বিজেপির এক শীর্ষ নেতার বক্তব্যও সেই আশঙ্কার দিকেই ইঙ্গিত করছে। তাঁর মতে, মানুষ যদি দেখেন পুরনো মস্তানি, দাদাগিরি বা ভোট লুটের অভিযোগ নতুন সরকারের আমলেও ফিরে এসেছে, তা হলে তাঁরা ক্ষমতার পরিবর্তন করতেও পিছপা হবেন না।

অর্থাৎ বিজেপির সামনে শুধু প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নয়, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষাও রয়েছে। যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে দল ক্ষমতায় এসেছে, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর করা যায়, তা বোঝা যাবে আগামী নির্বাচনগুলিতে। বিশেষ করে কলকাতা ও হাওড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পুরসভা নির্বাচন এবং একাধিক বিধানসভা উপনির্বাচন হতে চলেছে সেই পরীক্ষার মঞ্চ।

শুভেন্দুও বিষয়টি যে বুঝতে পারছেন, তাঁর বক্তব্যে তার ইঙ্গিত রয়েছে। বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে তিনি বিপুল জনসমর্থনের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, রাজ্যের ২ কোটি ৯৩ লক্ষ মানুষ বিজেপিকে সমর্থন করেছেন এবং দল পেয়েছে ৪৬ শতাংশ ভোট। সেই জনসমর্থনের মর্যাদা রক্ষা করতেই হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এখন দেখার, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়। বাংলার ভোটের সঙ্গে হিংসার যে দীর্ঘ ছায়া জড়িয়ে রয়েছে, তা এক দিনে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশাসন যদি ধারাবাহিক ভাবে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ভোট পরিচালনা করতে পারে এবং প্রতিটি ভোটারকে নিরাপদে বুথে পৌঁছনোর সুযোগ দিতে পারে, তা হলে রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

সামনের নির্বাচনগুলিই তাই শুভেন্দু সরকারের কাছে আসল পরীক্ষা। ভোটের দিন বুথের বাইরে যদি বোমা-গুলির বদলে শুধু ভোটারদের লাইন দেখা যায়, আতঙ্কের বদলে যদি তৈরি হয় আস্থা, তা হলে মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাবে। আর সেই পরিবর্তন স্থায়ী করতে পারলেই বাংলার ভোট-সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ দিনের অভিযোগের অবসানের পথে এগোনো সম্ভব হবে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved