Homeমালদাট্রেনে গাঁজা পাচারের বড় চক্র! মালদহে ৪২ কেজি মাদক উদ্ধার, আটক ৩

ট্রেনে গাঁজা পাচারের বড় চক্র! মালদহে ৪২ কেজি মাদক উদ্ধার, আটক ৩

নিউজ ডেস্ক : রেলপথকে ব্যবহার করে মাদক পাচারের চেষ্টা রুখে বড়সড় সাফল্য পেল রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (RPF) এবং গভর্নমেন্ট রেলওয়ে
img202205160827245653960

নিউজ ডেস্ক : রেলপথকে ব্যবহার করে মাদক পাচারের চেষ্টা রুখে বড়সড় সাফল্য পেল রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (RPF) এবং গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ (GRP)-এর যৌথ দল। গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মালদহ টাউন স্টেশনে চালানো আকস্মিক অভিযানে উদ্ধার হল বিপুল পরিমাণ সন্দেহভাজন গাঁজা। রেল সূত্রে খবর, তিন যাত্রীর কাছ থেকে মোট ৪২.০১৯ কেজি নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সামগ্রীর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২১ লক্ষ টাকা বলে প্রাথমিক ভাবে জানানো হয়েছে।

রেল পুলিশের এই অভিযানের পর মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় চক্রের গতিবিধি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পাচারের রুট এবং সম্ভাব্য গ্রাহকদের বিষয়ে আরও তথ্য জানার চেষ্টা চলছে। রেলপথকে ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বিহার এবং সংলগ্ন এলাকায় মাদক পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান।

ঘটনাটি ঘটেছে ২৫ এবং ২৬ অগস্টের মধ্যবর্তী রাতে। ওই রাতে মালদহ টাউন রেলওয়ে স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ায় আনন্দ বিহার টার্মিনালগামী তেজস রাজধানী এক্সপ্রেস। ট্রেনটির B-04 কোচে তখন নজরদারি চালাচ্ছিল যৌথ বাহিনী। আগাম পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কোচে তল্লাশি শুরু হতেই সন্দেহজনক কিছু লাগেজের দিকে নজর পড়ে আধিকারিকদের।

তল্লাশির সময় তিন যাত্রীকে আটক করা হয়। তাঁদের সঙ্গে থাকা একটি ট্রলি ব্যাগ এবং দু’টি লাগেজ ব্যাগ পরীক্ষা করতেই উদ্ধার হয় একাধিক প্যাকেট। সেই প্যাকেটগুলির ভিতরে লুকিয়ে রাখা ছিল সন্দেহভাজন গাঁজা। ওজন করার পর মোট ৪২.০১৯ কেজি মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়। বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ সামগ্রী উদ্ধারের পরই তিনজনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, অভিযুক্তরা আগরতলা থেকে ওই মাদকদ্রব্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। তাঁদের গন্তব্য ছিল বিহারের ভাগলপুর এবং জামালপুর। সেখানে মাদক পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ফলে এই ঘটনার সঙ্গে শুধু ধৃত তিনজনই যুক্ত, নাকি এর পিছনে আরও বড় কোনও নেটওয়ার্ক রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রেলপুলিশের আধিকারিকদের মতে, মাদক পাচারের ক্ষেত্রে দূরপাল্লার ট্রেনকে অনেক সময় পরিবহণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যাতায়াতকারী ট্রেনগুলিতে বিপুল সংখ্যক যাত্রী থাকায় পাচারকারীরা সেই ভিড়ের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ রুট এবং দূরপাল্লার ট্রেনগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

মালদহ টাউনে এই অভিযানের সাফল্যের পর পূর্ব রেলওয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার উপর গুরুত্ব দিয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বিহার এবং সংলগ্ন রাজ্যগুলির দিকে যাতায়াতকারী দূরপাল্লার ট্রেনগুলিতে বিশেষ নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক গতিবিধি, লাগেজ এবং যাত্রীদের আচরণের উপর নজর রাখার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আকস্মিক তল্লাশির উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

রেলের তরফে জানানো হয়েছে, মাদক পাচার এবং নিষিদ্ধ সামগ্রী পরিবহণের বিরুদ্ধে কোনও রকম আপস করা হবে না। নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে এই ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করার চেষ্টা চালানো হবে।

পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজার গীতিকা পাণ্ডে যৌথ বাহিনীর এই অভিযানের প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্কতা এবং দ্রুত পদক্ষেপের কারণেই বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ সামগ্রী উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। একইসঙ্গে রেলপথকে মাদক পাচারের করিডর হিসেবে ব্যবহার করার যে কোনও চেষ্টা ব্যর্থ করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।

পূর্ব রেলের IG-cum-Principal Chief Security Commissioner অমিয় নন্দন সিনহাও নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতার প্রশংসা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অবৈধ মাদক এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রী পরিবহণের চেষ্টা রুখতে সমস্ত ডিভিশনের নিরাপত্তা দলকে সতর্ক রাখা হয়েছে। সন্দেহজনক গতিবিধি নজরে এলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।

অন্যদিকে, মালদহ ডিভিশনের ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার মনীশ কুমার গুপ্তা জানিয়েছেন, এই ঘটনায় NDPS Act, 1985-এর ২০(b)(ii)(C) এবং ২৯ ধারায় GRPS মালদহ টাউন থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তদন্ত আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে আদালতের কাছে অভিযুক্তদের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছে।

তদন্তকারীরা এখন মূলত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখছেন। উদ্ধার হওয়া মাদক কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, আগরতলায় এর উৎস কোথায়, ভাগলপুর ও জামালপুরে কার হাতে তা পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল এবং এই পাচারের সঙ্গে আরও কোনও ব্যক্তি বা সংগঠিত চক্র যুক্ত রয়েছে কি না—এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। ধৃতদের মোবাইল ফোন, যোগাযোগের তথ্য এবং যাত্রাপথও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, একটি বড় পরিমাণ মাদক উদ্ধার হওয়া নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। তবে এর পাশাপাশি পাচারের গোটা নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়াও তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য। কারণ শুধুমাত্র বাহককে আটক করলেই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের উৎস এবং গন্তব্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা গেলে চক্রটির বিরুদ্ধে আরও বড় পদক্ষেপ করা সম্ভব হবে।

পূর্ব রেলের চিফ পাবলিক রিলেশনস অফিসার শিবরাম মাঝি জানিয়েছেন, রেলপথের নিরাপত্তা নিয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখা হচ্ছে। বিভিন্ন নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং ধারাবাহিক নজরদারির মাধ্যমেই রেলপথকে আরও নিরাপদ রাখার চেষ্টা চলছে।

মালদহ টাউন স্টেশনের এই অভিযান তাই শুধু একটি মাদক উদ্ধারের ঘটনা নয়, বরং আন্তঃরাজ্য মাদক পাচারের সম্ভাব্য রুটগুলির উপর রেলের নজরদারি কতটা বাড়ানো হয়েছে, তারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী দিনে উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে দেশের অন্য প্রান্তে চলাচলকারী দূরপাল্লার ট্রেনগুলিতে এমন তল্লাশি আরও বাড়তে পারে বলেই রেল সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved