Last updated: August 26th, 2026 at 05:52 pm

নিউজ ডেস্ক: ভোরের আলো তখন সবে ফুটছে, হাসপাতালের করিডোরে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে আতঙ্কিত আত্মীয়দের প্রচ্ছায়া। এক-একটি মিনিট যেন এক-একটি যুগ। তার পরই সেই অমোঘ বিষাদের শব্দ— আবার একটি ছোট্ট প্রাণ নিভে যাওয়ার খবর। কোনো অলৌকিকের প্রত্যাশায় যে বাবা-মা রাতের পর রাত জেগেছিলেন, তাঁদের স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে। উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্যে অন্যতম ভরসাস্থল মালদহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বরে নেমে এসেছে এক গভীর শোকের ছায়া। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে একে একে দশ-দশটি সদ্যোজাতের প্রয়াণ কেবল হাসপাতাল প্রাঙ্গণেই নয়, গোটা রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অবোধ শিশুদের এমন করুণ পরিণতিতে এক দিকে যেমন স্বজনহারাদের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, অন্য দিকে প্রশাসনিক স্তরেও উঠছে একগুচ্ছ অস্বস্তিকর প্রশ্ন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, উদ্বেগজনক এই ঘটনাটি ঘটে অগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। এক দিনেই দশটি শিশুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই চাঞ্চল্য ছড়ায় চত্বরে। প্রাথমিক ভাবে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হলেও ঘটনার ব্যাপ্তি এতটাই যে দ্রুত তা নজরে আসে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের। একটি সরকারি হাসপাতালে এক দিনে এত সংখ্যক সদ্যোজাতের প্রাণহানি স্বাভাবিক নিয়মেই কোনো সাধারণ বিষয় নয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই নড়েচড়ে বসেছে কলকাতার স্বাস্থ্যভবন। তড়িঘড়ি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্ণাঙ্গ তদন্তমূলক রিপোর্ট তলব করা হয়েছে।
তবে কি চিকিৎসার গাফিলতি, নাকি অন্য কোনো পরিকাঠামোগত ত্রুটি— এই প্রশ্ন যখন সব মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন মালদহ মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের তরফে উঠে এসেছে এক ভিন্ন দাবি। হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে, মৃত ১০ জন শিশুর মধ্যে মাত্র দু’জনের জন্ম হয়েছিল এই মেডিক্যালে। বাকি আট জন সদ্যোজাতকে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের গ্রামীণ হাসপাতাল, মহকুমা হাসপাতাল কিংবা দূরদূরান্তের নানা বেসরকারি নার্সিংহোম থেকে চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় রেফার করে আনা হয়েছিল মালদহে।
চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানান্তরিত হয়ে আসা এই শিশুদের অধিকাংশেরই শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ছিল। চিকিৎস পরিভাষায় যাকে বলে ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার এনভায়রনমেন্ট’—সেই পরিস্থিতিতে পৌঁছানোর পরই শেষ মুহূর্তে তাঁদের মালদহ মেডিক্যালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকদের একাংশের দাবি, বহু শিশুর ক্ষেত্রেই অত্যন্ত কম ওজন (Low Birth Weight), গুরুতর শ্বাসকষ্ট (Respiratory Distress Syndrome), মারাত্মক জন্ডিস কিংবা জন্মগত হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা ছিল। অনেক ক্ষেত্রে দূরবর্তী স্থান থেকে স্থানান্তরিত করার সময় সঠিক তাপমাত্রায় শিশুদের রাখা সম্ভব হয়নি, যাকে পরিভাষায় ‘কোল্ড অ্যাস্ফিক্সিয়া’ বলা হয়। ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় তাদের অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে যে সব রকম চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
তবে কর্তৃপক্ষের এই সাফাইয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না স্বাস্থ্যভবন। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে তড়িঘড়ি রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের শীর্ষ আধিকারিকরা মালদহ মেডিক্যালের শিশু চিকিৎসা বিভাগের প্রধান এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি ভিডিও কনফারেন্সে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে কোন পরিস্থিতিতে শিশুগুলিকে আনা হয়েছিল, পৌঁছানোর পর তাঁদের কী কী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত জীবনদায়ী পরিকাঠামো উপস্থিত ছিল কি না—সবটাই বিস্তারিত ভাবে জানতে চাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, কী কারণে প্রান্তিক এলাকাগুলি থেকে শেষ মুহূর্তে রোগীদের মেডিক্যালের মতো উন্নততর কেন্দ্রে স্থানান্তর (Refer) করা হচ্ছে, তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
স্বাস্থ্যভবন সূত্রের খবর, প্রাথমিক ভাবে একটি নথিপত্র রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরে পাঠানো হলেও তা যথেষ্ট নয় বলে জানানো হয়েছে। কোন শিশু কত ক্ষণ চিকিৎসাধীন ছিল, তাদের স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় কোনো গলদ ছিল কি না, এবং সংশ্লিষ্ট গ্রামীণ কেন্দ্রগুলিতে প্রাথমিক চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ বিশেষজ্ঞ দল গঠনের ইঙ্গিতও পাওয়া গিয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলে প্রান্তিক স্তরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও নার্সিংহোমগুলি থেকে সময়মতো রেফার না করার যে প্রবণতা রয়েছে, এই ঘটনা হয়তো ফের তার উল্টো পিঠটাকেই স্পষ্ট করে দিল। সংকটজনক অবস্থাকে প্রথম ধাপে চিহ্নিত না করতে পারা এবং একদম শেষ মুহূর্তে রেফার করে দেওয়ার ফলে বহু ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের আর কিছু করার থাকে না।
মালদহ মেডিক্যালের এই ঘটনায় গোটা জেলা জুড়ে দানা বেঁধেছে তীব্র অসন্তোষ। স্বজনহারা পরিবারগুলির অভিযোগ, স্থানান্তরিত শিশু হলেও চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরও তৎপর হওয়া প্রয়োজন ছিল। হাসপাতালের বিশেষ নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্রে (SNCU) স্থান এবং জীবনদায়ী সরঞ্জামের পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী আত্মীয়েরা। ঘটনার পেছনে প্রকৃত কারণ কী, তা জানতে এখন অপেক্ষা স্বাস্থ্যভবনে জমা পড়তে চলা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টের দিকে। তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, এক দিনে দশটি কোল খালি হয়ে যাওয়ার এই করুণ ঘটনা ফের একবার এ রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং আশঙ্কাজনক রোগী স্থানান্তরের পরিকাঠামোকে কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments