
নিউজ ডেস্ক; নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর থেকেই হাওড়া ও হুগলি জেলার একাধিক পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েক জনের শেষ অবস্থান ছিল নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি এলাকা। বার বার ফোন করেও পরিবারের সদস্যরা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। পর্যটন সংস্থাগুলির কাছ থেকেও সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট কোনও তথ্য না মেলায় উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে। নিখোঁজ পর্যটকদের খোঁজ পেতে ভারতীয় দূতাবাস এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন পরিবারের সদস্যরা।
নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন হাওড়ার সাঁকরাইলের ৬৮ বছরের অনিতা দাস। তাঁর বাড়ি আন্দুল হাটগাছা এলাকায়। পরিবারের তরফে জানা গিয়েছে, গত ২১ অগস্ট কলকাতার একটি পর্যটন সংস্থার মাধ্যমে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। যাত্রার পর কয়েক দিন পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। কিন্তু নেপালে বিপর্যয়ের খবর আসার পর থেকেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
পরিবার সূত্রে খবর, গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা নাগাদ ছেলের সঙ্গে শেষ বার কথা হয়েছিল অনিতার। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁদের দল নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি কোনও এলাকায় রয়েছে। সেই কথোপকথনের কিছুক্ষণের মধ্যেই নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খবর পান পরিবারের সদস্যরা। এরপর থেকেই অনিতার মোবাইল ফোন বন্ধ। বার বার ফোন করেও কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
যে পর্যটন সংস্থার মাধ্যমে অনিতা যাত্রা করেছিলেন, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে পরিবার। কিন্তু তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সংস্থার পক্ষ থেকেও নিশ্চিত কোনও তথ্য দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে পরিবারের দাবি। ফলে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
পরিস্থিতির কথা জানতে বৃহস্পতিবার সকালে অনিতার বাড়িতে যায় সাঁকরাইল থানার পুলিশ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জানার চেষ্টা করেন পুলিশকর্মীরা। পরিবারের লোকজনকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, অনিতার বিষয়ে কোনও খবর পাওয়া গেলে দ্রুত তাঁদের জানানো হবে।
শুধু অনিতা নন, হুগলির তারকেশ্বরের আরও দুই বাসিন্দার সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাঁরা হলেন স্নেহাশিস দত্ত এবং জয়ন্ত সান্যাল। দু’জনেই কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে নেপালে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে জয়ন্ত ট্যুর ম্যানেজার হিসেবে দলের সঙ্গে ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২২ অগস্ট দু’জন কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছিলেন। এরপর থেকেই তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কিন্তু বিপর্যয়ের পর থেকে ফোনে আর কোনও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যরা ভারতীয় দূতাবাস এবং রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
তারকেশ্বরে স্নেহাশিস দত্তের বাড়িতে বৃহস্পতিবার দেখা যায় উদ্বেগের ছবি। পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষায় রয়েছেন কোনও একটি ফোন বা খবরের জন্য। স্নেহাশিসের স্ত্রী সোমা জানান, বুধবার সকালে তাঁদের শেষ কথা হয়েছিল। তাঁর কথায়, সে দিন সকাল সাড়ে ৭টা নাগাদ কাঠমান্ডু থেকে চিনের দিকে রওনা হয়েছিল দলটি। সকাল ৯টার দিকে বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। তার পর থেকেই আর স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
হুগলির আরও এক বাসিন্দার নিখোঁজ হওয়ার খবর সামনে এসেছে। চন্দননগর পুরনিগমের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হরিদ্রাডাঙা পূর্বপাড়ার বাসিন্দা শিপ্রা রায় পাটারিরও কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি সিঙ্গুর গোলাপ মোহিনী স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষিকা। গত ২১ অগস্ট একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে নেপালে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর বাড়ি ফেরার কথা ছিল।
শিপ্রার পরিবারের সদস্যরাও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শিপ্রার ভাই অখিল রায় জানিয়েছেন, বুধবার রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। তারপর আর কোনও খবর পাওয়া যায়নি। ফলে পরিবারের সদস্যরা চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
উত্তরপাড়ার ভদ্রকালী পানপাড়া বাই লেনের বাসিন্দা ক্ষিতীশ বিশ্বাস এবং তাঁর স্ত্রী মমতা বিশ্বাসের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। দু’জনেই নেপালে বেড়াতে গিয়েছিলেন। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জানা গিয়েছে, তাঁদের একমাত্র মেয়ে ১৮ বছর বয়সে পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। এরপর থেকেই ক্ষিতীশ ও তাঁর স্ত্রী অনেকটা সময় পূজার্চনা ও ধর্মীয় কাজে কাটাতেন।
ক্ষিতীশ রেলে চাকরি করতেন। চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্বেচ্ছাবসর নেন তিনি। অবসরের পর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতেন। নেপাল সফরও ছিল সেই ভ্রমণেরই অংশ। কিন্তু বিপর্যয়ের পর থেকে তাঁদের কোনও সন্ধান না পাওয়ায় উদ্বেগে রয়েছেন পরিবারের সদস্য এবং প্রতিবেশীরা।
ক্ষিতীশ ও মমতার বাড়িতেও বিপর্যয়ের পর পুলিশ গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে। নিখোঁজ দম্পতির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে কোনও খবর পাওয়া গেলে দ্রুত পরিবারকে জানানো হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ দিকে নিখোঁজ পর্যটকদের খোঁজ পেতে প্রশাসনের তরফেও তৎপরতা শুরু হয়েছে। হুগলি জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যেই অনুসন্ধানের জন্য একটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে। প্রশাসনের তরফে দেওয়া হেল্পলাইন নম্বর ৭০০৩১৯০৫০৭। নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য জানতে বা তাঁদের সন্ধান সংক্রান্ত খবর জানাতে এই নম্বরে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
তবে হুগলি ও হাওড়ার সব পর্যটকের পরিস্থিতি যে বিপজ্জনক, এমনটা নয়। আরামবাগ থেকে একটি বাসে করে প্রায় ৫০ জন পর্যটক নেপালে বেড়াতে গিয়েছিলেন। বিপর্যয়ের সময় তাঁরা ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে চেতন পার্ক এলাকায় ছিলেন। ফলে তাঁরা বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাবের মধ্যে পড়েননি বলে জানা গিয়েছে। বাসের যাত্রীদের সবাই সুস্থ ও নিরাপদ রয়েছেন বলে খবর মিলেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে ওই পর্যটক দলটি নারায়ণগড়ের কাছাকাছি এলাকায় ছিল। তাঁদের নিরাপদ থাকার খবর কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে পরিবারগুলিকে। তবে যাঁদের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না, তাঁদের পরিবারগুলির উদ্বেগ কাটেনি।
নেপালে বিপর্যয়ের পর একের পর এক পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে বাংলায়। বিশেষ করে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় থাকা পর্যটকদের ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে দ্রুত নিশ্চিত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন প্রশাসন, পুলিশ এবং ভারতীয় দূতাবাসের তৎপরতার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারের সদস্যরা।
পরিবারগুলির একটাই অপেক্ষা—কখন আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত ফোন। প্রিয়জনেরা নিরাপদে রয়েছেন, এই খবরটুকুই এখন তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তি।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments