
নিউজ ডেস্ক : কয়েকটি ট্রেডিং সেশনের মধ্যেই ফের চমক দিয়েছে সোনার বাজার। আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম উঠে গিয়েছে তিন মাসের সর্বোচ্চ স্তরে। ভারতের বাজারেও তার প্রভাব স্পষ্ট। ফলে বিনিয়োগকারী থেকে সাধারণ ক্রেতা—সবার নজর এখন সেপ্টেম্বরের দিকে। এই ঊর্ধ্বগতি কি আরও কিছুটা চলবে, নাকি উচ্চ দামের সুযোগ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের একাংশ মুনাফা তুলে নিতে শুরু করবেন? বাজারের একাধিক সূচক বলছে, সামনে একেবারে মসৃণ রাস্তা নয়। বরং সেপ্টেম্বর মাসে সোনার দামে জোরালো ওঠানামা দেখা যেতে পারে।
২৪ অগস্ট আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম প্রতি আউন্সে ৪,৬৫০ ডলারের গণ্ডি পেরিয়েছিল। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের পর এটিই ছিল অন্যতম সর্বোচ্চ স্তর। তার আগের সপ্তাহেও আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম পাঁচ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির এই গতি বাজারে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।
দেশের বাজারেও ছবিটা প্রায় একই। ২৪ অগস্ট মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ বা MCX-এ সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে প্রায় ১,৬৩,৮৭০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছয়। অন্য দিকে, ইন্ডিয়ান বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা IBJA-এর হিসাবে ৯৯৯ বিশুদ্ধতার সোনার সকালের দর ছিল প্রতি ১০ গ্রামে ১,৬২,৬০৩ টাকা। সন্ধ্যার হিসাবে তা ছিল ১,৬২,১৫৪ টাকা। এই দামের মধ্যে অবশ্য জিএসটি এবং গয়না তৈরির মজুরি ধরা হয়নি।
তবে দাম যত দ্রুত উপরে উঠেছে, উচ্চস্তরে এসে ততই কিছুটা সতর্কতার ছবিও দেখা যাচ্ছে। ২৫ অগস্ট আন্তর্জাতিক বাজারে আগের সর্বোচ্চ স্তর থেকে সোনার দাম প্রায় ০.২ শতাংশ নেমে ৪,৬৪০ ডলারের আশপাশে ঘোরাফেরা করে। পতন খুব বড় না হলেও এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেখছেন বাজার পর্যবেক্ষকদের একাংশ। অর্থাৎ, ক্রেতাদের আগ্রহ এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও এই উচ্চ দামে নতুন করে কেনার আগে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
সোনার সাম্প্রতিক উত্থানের পিছনে একাধিক আন্তর্জাতিক কারণ কাজ করছে। শুধু ভারতীয় বাজারে উৎসবের মরসুমে চাহিদা বাড়ার কারণেই এই বৃদ্ধি হচ্ছে—এমনটা বলা ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দুর্বলতা সোনার দাম বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
সাধারণত ডলারের মূল্য কমলে অন্যান্য মুদ্রায় সোনা তুলনামূলক ভাবে সস্তা হয়ে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার চাহিদা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমেরিকার আর্থিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সরকারি বন্ড কেনার পরিকল্পনা এবং সরকারি ঋণের পরিমাণ নিয়ে উদ্বেগ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
এর পাশাপাশি রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা। আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনা, সম্ভাব্য নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার আকর্ষণ বাড়াতে পারে। সাধারণত বিশ্ব অর্থনীতি বা ভূ-রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝোঁকেন। সেক্ষেত্রে সোনা স্বাভাবিক ভাবেই সুবিধা পেতে পারে।
আগামী দিনে সোনার বাজারের গতিপথ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে থাকবে আমেরিকার মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান এবং ফেডারেল রিজ়ার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত অবস্থান।
মূল্যস্ফীতির হার যদি প্রত্যাশার তুলনায় বেশি থাকে এবং ফেড সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলক উচ্চ রাখার ইঙ্গিত দেয়, তা হলে সোনার দামে চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ সোনা কোনও সুদ দেয় না। ফলে সুদ-নির্ভর সম্পদ যেমন সরকারি বন্ডের ফলন বাড়লে বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনার আকর্ষণ সাময়িক ভাবে কমতে পারে।
অন্য দিকে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলেও যদি ফেডের নীতিতে সুদ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা হলে সোনার বাজার ফের শক্তি পেতে পারে। ফলে সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকার অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানগুলির দিকে আন্তর্জাতিক বাজারের নজর থাকবে।
আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য ডলারের তুলনায় টাকার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম খুব বেশি না বাড়লেও যদি টাকার দর ডলারের তুলনায় দুর্বল হয়, তা হলে আমদানি-নির্ভর ভারতীয় বাজারে সোনার দাম বাড়তে পারে।
অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার গতিবিধি এবং দেশে ডলার-টাকার বিনিময় হার—দুইয়ের মিলিত প্রভাব পড়ে ভারতীয় বাজারে। তাই সেপ্টেম্বরের বাজার বুঝতে শুধু MCX-এর দর দেখলেই হবে না, আন্তর্জাতিক সোনার দাম এবং মুদ্রাবাজারের গতিবিধির দিকেও নজর রাখতে হবে।
বাজার সংক্রান্ত বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা যদি প্রতি আউন্স ৪,৭০০ ডলারের উপরে স্থায়ী ভাবে থাকতে পারে, তা হলে আরও উপরের স্তরের দরজা খুলতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সোনার চাহিদা, মার্কিন ঋণ নিয়ে উদ্বেগ, দুর্বল ডলার এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা—এই সমস্ত কারণ সোনার দামের পক্ষে কাজ করতে পারে।
তবে ছবির অন্য দিকটিও রয়েছে। TD Securities-এর মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে সুদের হারকে এখনও বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে সোনার গুরুত্ব থাকলেও সুদের হার বেশি থাকলে সোনার ঊর্ধ্বগতি বাধার মুখে পড়তে পারে। তাই বর্তমান উচ্চস্তর থেকে খুব দ্রুত নতুন রেকর্ড তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশাকে কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকদের একাংশ।
এর ফলে একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি হতে পারে—প্রথমে দাম আরও কিছুটা বাড়বে, তার পরে উচ্চস্তরে থাকা বিনিয়োগকারীদের একাংশ মুনাফা তুলে নেবেন। তাতে সাময়িক পতন দেখা গেলেও পরে ফের নতুন করে কেনাকাটা শুরু হতে পারে।
সোনার সেপ্টেম্বরের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে বাজার বিশ্লেষণের পাশাপাশি জ্যোতিষভিত্তিক কিছু মতও সামনে এসেছে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান থেকে বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই এই অংশটিকে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের ভিত্তি না করে প্রচলিত জ্যোতিষীয় ব্যাখ্যা হিসাবেই দেখা উচিত।
এই জ্যোতিষীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৮ অগস্টের চন্দ্রগ্রহণের পর সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাজারে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যেতে পারে। মাসের প্রথম সপ্তাহে উচ্চস্তর থেকে দ্রুত পতন অথবা হঠাৎ দামের পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।
এর পর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সোনার বাজারে ফের শক্তি দেখা যেতে পারে বলে এই বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বরের আশপাশে সূর্যের কন্যা রাশিতে প্রবেশের পর বাজারের গতিবিধিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেওয়া হচ্ছে। এই সময় থেকে গ্রহগত প্রভাবের বদলে বাস্তব বাজারের তথ্য—মূল্যস্ফীতি, ডলার, সুদের হার এবং বন্ডের ফলন—আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জ্যোতিষীয় ব্যাখ্যায় রাহুকে হঠাৎ উত্থান, গুজব, আতঙ্ক এবং দ্রুত মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সেই কারণে সেপ্টেম্বরের বাজারে একটানা ঊর্ধ্বগতির বদলে হঠাৎ ওঠা-নামার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।
সব দিক মিলিয়ে সেপ্টেম্বরকে সোনার বাজারের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস বলেই মনে করা হচ্ছে। আগস্টের মতো একমুখী ঊর্ধ্বগতি বজায় থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং মাসের শুরুতেই কিছুটা মুনাফা তোলার প্রবণতা দেখা যেতে পারে। আবার মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে দাম ফের শক্তিশালী হতে পারে।
মাসের শেষ দিকেও উচ্চ দামে লাভ তুলে নেওয়ার চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, সেপ্টেম্বর জুড়ে একই দিকে দাম চলার পরিবর্তে একটি ওঠানামার পর্ব তৈরি হতে পারে।
সোনার দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির কেনাকাটা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, মার্কিন ঋণ, ডলারের গতিবিধি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাও সোনাকে সমর্থন করতে পারে। তাই বড় ঊর্ধ্বগতি শেষ হয়ে গিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনোর কারণ নেই।
তবে একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্তর নিজেই একটি ঝুঁকি। দাম দ্রুত বেড়ে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই কিছু বিনিয়োগকারী লাভ তুলে নিতে পারেন। তার ফলে সাময়িক পতন তৈরি হতে পারে। সেই পতন আবার নতুন ক্রেতাদের বাজারে প্রবেশের সুযোগও করে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে সোনা উচ্চস্তরেই থাকতে পারে, কিন্তু পথটা মসৃণ নাও হতে পারে। কখনও দ্রুত পতন, আবার কখনও শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন—দুই ছবিই দেখা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোন দিকে বাজার যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মার্কিন মূল্যস্ফীতি, ফেডের নীতি, ডলারের অবস্থান, বন্ডের ফলন, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং ভারতীয় টাকার গতিপথের উপর।
তাই নতুন রেকর্ডের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, আবার বড়সড় সংশোধনের ঝুঁকিও রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য সেপ্টেম্বর হতে পারে সতর্কতা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাস।
নোট: জ্যোতিষভিত্তিক বাজারের পূর্বাভাস বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত নয়। সোনা বা অন্য কোনও সম্পদে বিনিয়োগের আগে বর্তমান বাজারদর, ঝুঁকি, সুদের হার এবং নিজের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা উচিত।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments