Homeরাজ্যসাইবার প্রতারণা রুখতে রাজ্যজুড়ে ‘অপারেশন সাইবার প্রহার’, গ্রেফতার ১৯৯

সাইবার প্রতারণা রুখতে রাজ্যজুড়ে ‘অপারেশন সাইবার প্রহার’, গ্রেফতার ১৯৯

নিউজ ডেস্ক; মোবাইলে আসা একটি ফোন কল, অচেনা কোনও লিঙ্কে সামান্য একটি ক্লিক কিংবা যাচাইয়ের নামে ওটিপি শেয়ার—অসতর্কতার মুহূর্তেই খালি
Screenshot 2026-08-26 113605

নিউজ ডেস্ক; মোবাইলে আসা একটি ফোন কল, অচেনা কোনও লিঙ্কে সামান্য একটি ক্লিক কিংবা যাচাইয়ের নামে ওটিপি শেয়ার—অসতর্কতার মুহূর্তেই খালি হয়ে যেতে পারে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। বহু ক্ষেত্রে প্রতারকদের হাতে চলে যাচ্ছে মানুষের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়। কেউ হারাচ্ছেন কয়েক লক্ষ টাকা, আবার কোনও কোনও ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে যাচ্ছে কোটি টাকার গণ্ডি। ক্রমবর্ধমান এই ডিজিটাল প্রতারণা রুখতে এবার আরও বড় পরিসরে অভিযান শুরু করল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। রাজ্যজুড়ে চালু করা হয়েছে বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন সাইবার প্রহার’

রাজ্য পুলিশের সমস্ত জেলা, বিভিন্ন পুলিশ কমিশনারেট এবং কলকাতা পুলিশ একযোগে এই বিশেষ অভিযানে অংশ নিচ্ছে। পুলিশের লক্ষ্য শুধু প্রতারণার অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করা নয়, বরং সাইবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত সংগঠিত চক্রের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। একই সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের গতিপথ অনুসরণ করে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

রাজ্য পুলিশের সাইবার ক্রাইম উইং সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত এই অভিযানে রাজ্যজুড়ে ৮৭টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। প্রায় ৯৩.৭৫ কোটি টাকার সাইবার প্রতারণার অভিযোগের তদন্তে নেমে ইতিমধ্যেই ১৯৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। অভিযান আরও জোরদার হলে এই সংখ্যা বাড়তে পারে বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা।

পুলিশের বক্তব্য, সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নিজেদের প্রতারণার পদ্ধতি বদলাচ্ছে। পুরনো কৌশল কিছুটা পরিচিত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন ভয়, প্রলোভন এবং জরুরি পরিস্থিতির আবহ তৈরি করে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে প্রতারকরা। ফলে শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকলেই হবে না, অনলাইন লেনদেনের সময় সামান্য অসতর্কতাও বড় আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত প্রতারণার কৌশলগুলির মধ্যে রয়েছে তথাকথিত ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’। পুলিশ বা তদন্তকারী সংস্থার পরিচয় দিয়ে ফোন করে কোনও ব্যক্তিকে ভয় দেখানো হয়। বলা হয়, তাঁর নাম কোনও অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে অথবা তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বেআইনি কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এরপর মামলা, গ্রেফতার বা আইনি পদক্ষেপের ভয় দেখিয়ে টাকা পাঠাতে বাধ্য করা হয়। আতঙ্কে অনেকেই প্রতারকদের নির্দেশ মেনে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে দেন।

এর পাশাপাশি কেওয়াইসি বা Know Your Customer তথ্য আপডেট করার নাম করেও প্রতারণার অভিযোগ আসছে। গ্রাহককে জানানো হচ্ছে, তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল পরিষেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেই সমস্যা এড়াতে নির্দিষ্ট লিঙ্কে গিয়ে তথ্য আপডেট করতে বলা হচ্ছে। লিঙ্কে ক্লিক করার পর ব্যক্তিগত বা ব্যাঙ্কিং তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অনেক সময় আবার অ্যাকাউন্ট বা UPI পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভুয়ো বার্তা পাঠিয়েও একই ধরনের ফাঁদ পাতা হচ্ছে।

ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত প্রতারণাও তদন্তকারীদের কাছে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। ফোন করে বলা হচ্ছে, ক্রেডিট কার্ড ব্লক হয়ে যাবে বা কোনও সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে। সমস্যা সমাধানের নামে কার্ডের তথ্য, পিন, ওটিপি কিংবা অন্য গোপন তথ্য জানতে চাওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়েও একই কায়দায় ব্যাঙ্কিং তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসছে।

শুধু ব্যাঙ্কিং প্রতারণাতেই থেমে নেই সাইবার অপরাধীদের কৌশল। বর্তমানে অনলাইন বিনিয়োগের নামেও বড় ধরনের প্রতারণা চলছে। বিশেষ করে শেয়ার বাজার বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে দ্রুত বিপুল লাভের টোপ দেখিয়ে মানুষকে বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের গ্রুপে যুক্ত করা হচ্ছে। টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে ভুয়ো বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ, ট্রেডিং গ্রুপ বা সংস্থার পরিচয়ে বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা হয়। প্রথম দিকে সামান্য বিনিয়োগে লাভ দেখিয়ে পরে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করানো হয়। টাকা জমা দেওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রেই সেই অর্থ আর ফেরত পাওয়া যায় না।

এছাড়াও পার্টটাইম চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার অভিযোগও বাড়ছে। বাড়িতে বসে অল্প সময়ে মোটা টাকা উপার্জনের সুযোগ রয়েছে—এমন বার্তা পাঠিয়ে প্রথমে ছোটখাটো কাজ দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা জমা দিতে বলা হয়। একসময় প্রতারিত ব্যক্তি বুঝতে পারেন, তিনি আসলে একটি পরিকল্পিত সাইবার প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

অনলাইন লোন অ্যাপ ঘিরেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। দ্রুত ঋণ দেওয়ার নাম করে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের পর সেই তথ্যের অপব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। ই-কমার্স প্রতারণা, ভুয়ো অফার, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক এবং সেক্সটরশন-এর মতো অপরাধও সাইবার পুলিশের নজরে রয়েছে। অর্থাৎ প্রতারণার ধরন যত বদলাচ্ছে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে পুলিশের তদন্তের ক্ষেত্রও তত বিস্তৃত হচ্ছে।

পুলিশ সূত্রের দাবি, ‘অপারেশন সাইবার প্রহার’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আর্থিক লেনদেনের গতিপথ অনুসরণ করা। প্রতারণার টাকা কোন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে, সেখান থেকে কোথায় সরানো হয়েছে এবং কোন কোন অ্যাকাউন্ট বা ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থ ঘুরেছে—এই সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত তথ্য এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করে প্রতারণা চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।

তদন্তকারীদের মতে, সাইবার প্রতারণা এখন আর বিচ্ছিন্ন কয়েকজনের কাজ নয়। বহু ক্ষেত্রে এর পিছনে একাধিক স্তরে কাজ করা সংগঠিত চক্র রয়েছে। কেউ ফোন করে, কেউ ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ব্যবস্থা করে, কেউ অর্থ স্থানান্তরের কাজ করে, আবার কেউ প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো পরিচালনা করে। ফলে একজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করার পাশাপাশি গোটা নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের খুঁজে বের করাও পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

রাজ্য পুলিশের সাইবার ক্রাইম উইংয়ের এক আধিকারিকের বক্তব্য, অভিযান যত এগোবে, ততই সাইবার প্রতারণার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসবে। সংগঠিত চক্রগুলিকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়াই এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য।

তবে পুলিশের অভিযান চলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। অচেনা ফোনে ব্যক্তিগত বা ব্যাঙ্কিং তথ্য না দেওয়া, সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক না করা, কাউকে ওটিপি বা পিন না জানানো এবং অনলাইন বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্ল্যাটফর্মের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। কারণ প্রযুক্তির সুবিধা যেমন দ্রুত জীবনকে সহজ করেছে, তেমনই সামান্য অসতর্কতাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা মুহূর্তে বড় আর্থিক ক্ষতি করতে পারে।

‘অপারেশন সাইবার প্রহার’-এর মাধ্যমে রাজ্য পুলিশ সেই ক্রমবর্ধমান সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকরভাবে নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে পারে, এখন সেদিকেই নজর। ৮৭টি মামলা এবং ১৯৯ জন গ্রেফতারের প্রাথমিক পরিসংখ্যান অবশ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই অভিযানকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই এগোচ্ছে প্রশাসন।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved