
নিউজ ডেস্ক; দিনের আলোয় সব কিছুই স্বাভাবিক। কিন্তু সূর্য ডুবলেই নাকি বদলে যায় গোটা গ্রামের চেহারা। নিস্তব্ধতার মধ্যে ভেসে আসে কান্নার আওয়াজ। কখনও শোনা যায় নূপুরের ঝনঝন শব্দ। আবার আচমকাই মড়মড় করে গাছ ভেঙে পড়ার মতো শব্দ। তার সঙ্গে বাড়ির ছাদে এসে পড়ে ঢিল। এমনই নানা অস্বাভাবিক শব্দ এবং ঘটনাকে ঘিরে একসময় আতঙ্ক ছড়িয়েছিল বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের চালিবাড়িডিহি গ্রামে। সেই ভয় এতটাই গভীর হয়েছিল যে, এক দশকেরও বেশি সময় আগে কার্যত জনশূন্য হয়ে যায় গোটা বসতি। এখন সেখানে মাত্র দু’টি পরিবার বসবাস করে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
বাঁকুড়া শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের এই গ্রাম। স্থানীয়দের মুখে মুখে জায়গাটির পরিচিতি এখন ‘ভূতুড়ে গ্রাম’ হিসেবে। সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের যে কয়েকটি বাড়িতে মানুষজন রয়েছেন, সেখানেও দরজা বন্ধ হয়ে যায়। চারপাশে ঝোপঝাড়, আগাছা এবং জঙ্গল। দিনের বেলাতেও গ্রামের নির্জনতা চোখে পড়ার মতো। অথচ একসময় এই এলাকাতেই ছিল মানুষের বসতি, সংসার, কাজকর্ম এবং দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা।
গ্রামের বাসিন্দা লক্ষ্মণ বাউড়ির কাছ থেকে জানা যায়, চালিবাড়িডিহির ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। গঙ্গাজলঘাটির বড়জুড়ি গ্রামের কাছাকাছি জঙ্গলঘেরা একটি উঁচু জমিতে একসময় কয়েকটি পরিবার বসতি গড়ে তুলেছিল। বড়জুড়ি এলাকা থেকে উঠে এসে প্রায় ১৮টি পরিবার সেখানে বসবাস শুরু করে। নতুন সেই বসতির নাম হয় চালিবাড়িডিহি। প্রথম দিকে সেখানে কোনও সমস্যা ছিল না বলেই স্থানীয়দের দাবি। স্বাভাবিক ছন্দেই চলছিল মানুষের জীবন।
কিন্তু প্রায় ১২ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সেই গ্রামের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে দেয় বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। অভিযোগ ওঠে, গ্রামের এক মহিলা নিজের শিশুসন্তানকে পাশের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুন করেছিলেন। সেই ঘটনার পর থেকেই নাকি এলাকায় একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে শুরু করে। সন্ধ্যা নামলেই নানা ধরনের শব্দ শোনার দাবি করতে থাকেন স্থানীয়েরা। ধীরে ধীরে সেই ঘটনাগুলির সঙ্গে শিশুহত্যার ঘটনার যোগসূত্র তৈরি করে শুরু হয় নানা গুজব।
ভয়ের সেই আবহ ক্রমশ গ্রাস করতে থাকে গ্রামবাসীদের। বিশেষ করে রাত নামার পর বাড়ির বাইরে বেরোনো প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের শিশু ও মহিলাদের নিয়ে আতঙ্ক আরও বাড়তে থাকে। দিনের পর দিন এই ভয় চলতে থাকায় শেষ পর্যন্ত অনেক পরিবার নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এক সময় যে চালিবাড়িডিহিতে ১৮টি পরিবার বাস করত, সেই বসতি ক্রমে ফাঁকা হতে শুরু করে। একে একে মানুষজন ফিরে যেতে থাকেন পুরোনো বড়জুড়ি গ্রামে। পড়ে থাকে তাঁদের ফেলে যাওয়া ঘরবাড়ি। দীর্ঘদিন মানুষের বসবাস না থাকায় সেই বাড়িগুলির অনেকটাই জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনবসতির জায়গাটি আরও নির্জন হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতির কথা প্রশাসন এবং পুলিশের কাছেও পৌঁছয়। গ্রামবাসীদের ভয় কাটিয়ে তাঁদের আবার চালিবাড়িডিহিতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এলাকার পরিকাঠামো উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়। গ্রামে বিদ্যুতের সংযোগও দেওয়া হয়। প্রশাসনের তরফে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, ভয় পাওয়ার মতো কোনও কারণ নেই। কিন্তু সেই উদ্যোগ সত্ত্বেও অধিকাংশ পরিবার আর নিজেদের পুরোনো ভিটেতে ফিরে আসেনি।
বর্তমানে মাত্র দু’টি পরিবার সেখানে বসবাস করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। তাঁদেরই একজন লক্ষ্মণ বাউড়ি। প্রশাসনের উদ্যোগে গ্রামে ফিরে এলেও তাঁর পরিবারের আতঙ্ক এখনও পুরোপুরি কাটেনি। বরং সন্ধ্যার পর থেকেই তাঁদের মনে ভয় তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন লক্ষ্মণ।
তাঁর কথায়, গ্রামের অন্য বাসিন্দারা মূলত ভূতের ভয়েই জায়গাটি ছেড়ে চলে গিয়েছেন। এখন রাতে গ্রামের চারপাশের নিস্তব্ধতা আরও বেশি করে আতঙ্ক তৈরি করে। দিন কোনও রকমে কেটে গেলেও রাত নামার পর পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে বলে তাঁর দাবি।
রাতে ঠিক কী ধরনের ঘটনা ঘটে? লক্ষ্মণের দাবি, বিভিন্ন সময় তিনি নানা ধরনের শব্দ শুনতে পান। কখনও মনে হয় কেউ যেন কাঁদছে। আবার কখনও শোনা যায় নূপুরের আওয়াজ। তার সঙ্গে মড়মড় করে গাছপালা ভেঙে পড়ার মতো শব্দও আসে। এমনকি বাড়ির চালের উপরেও ঢিল পড়ার মতো ঘটনা ঘটে বলে তাঁর অভিযোগ। এই সমস্ত ঘটনায় রাতের অন্ধকারে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তবে স্থানীয়দের এই দাবির সঙ্গে একমত নয় বিজ্ঞানমনস্ক সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ। সংগঠনের রাজ্য কমিটির সহ-সম্পাদক জয়দেব চন্দ্রের বক্তব্য, চালিবাড়িডিহি নিয়ে ভূতুড়ে গল্পের পিছনে বাস্তব কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, বেশ কিছু পরিবার কর্মসংস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার কারণে আগেই বড়জুড়িতে চলে গিয়েছিল এবং সেখানেই স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেছিল।
জয়দেবের মতে, একটি পুরোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞান মঞ্চের জেলার কর্মীরা এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখে এসেছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, সেখানে আতঙ্কের কোনও বাস্তব পরিবেশ বা পরিস্থিতি তাঁরা দেখতে পাননি।
বিজ্ঞান মঞ্চের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, এ ধরনের গুজবের বিরুদ্ধে সংগঠনটি নিয়মিত ভাবে সচেতনতা তৈরি করে। কোনও অস্বাভাবিক শব্দ বা ঘটনা ঘটলেই তার সঙ্গে অতিপ্রাকৃত শক্তির যোগ খোঁজা ঠিক নয়। প্রাকৃতিক কারণ, বন্যপ্রাণীর চলাচল, গাছপালার শব্দ, বাতাস, পরিত্যক্ত বাড়ির বিভিন্ন আওয়াজ কিংবা মানুষের তৈরি বিভ্রান্তি— সবকিছু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ফলে চালিবাড়িডিহিকে ঘিরে ‘ভূতুড়ে গ্রাম’-এর যে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, তার সত্যতা নিয়ে রয়েছে মতভেদ। স্থানীয়দের একাংশ এখনও রাতের নানা শব্দ এবং ঘটনার কথা বলছেন। অন্য দিকে বিজ্ঞানমনস্কদের দাবি, পুরোনো একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ভয় এবং গুজবই দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
তবে একটি বিষয় নিয়ে দ্বিমত নেই— একসময় মানুষের বসতিতে ভরা চালিবাড়িডিহি এখন প্রায় জনশূন্য। ১৮টি পরিবারের জায়গায় মাত্র দু’টি পরিবার সেখানে রয়েছে। সন্ধ্যা নামলে চারপাশের নীরবতা আরও ঘন হয়ে ওঠে। পরিত্যক্ত বাড়ি, জঙ্গল আর অন্ধকারের মধ্যে সেই নীরবতাই যেন গ্রামের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভূত সত্যিই আছে কি না, তার উত্তর বিজ্ঞানের কাছে নেই— কারণ অতিপ্রাকৃত অস্তিত্বের এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু মানুষের মনে ভয় যে বাস্তব, চালিবাড়িডিহির গল্প তারই একটি উদাহরণ। একটি ভয়াবহ অতীত ঘটনা, তার পরবর্তী গুজব এবং দীর্ঘদিনের আতঙ্ক কী ভাবে একটি গোটা জনবসতিকে ফাঁকা করে দিতে পারে, বাঁকুড়ার এই গ্রাম যেন তারই এক অদ্ভুত নজির।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments