Homeপশ্চিম মেদিনীপুরখড়্গপুরনারায়ণগড়মোবাইলে বার বার দুর্যোগের সতর্কবার্তা, তবু মাঠে! বজ্রাঘাতে প্রাণ গেল নারায়ণগড়ের কৃষকের

মোবাইলে বার বার দুর্যোগের সতর্কবার্তা, তবু মাঠে! বজ্রাঘাতে প্রাণ গেল নারায়ণগড়ের কৃষকের

নিউজ ডেস্ক : মোবাইলে একের পর এক এসে পৌঁছেছিল সরকারি সতর্কবার্তা। জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রবিদ্যুৎ-সহ
Screenshot 2026-09-08 112553

নিউজ ডেস্ক : মোবাইলে একের পর এক এসে পৌঁছেছিল সরকারি সতর্কবার্তা। জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি নামতে পারে। সেই সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের নারায়ণগড়ের বাসিন্দারাও। কিন্তু দুর্যোগের পূর্বাভাসের মধ্যেও থামেনি চাষের কাজ। মাঠে তখন আমন ধানের পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত কৃষকেরা। আর সেই কাজ করতে গিয়েই মর্মান্তিক পরিণতি হল এক প্রান্তিক কৃষকের। সোমবার বিকেলে বজ্রাঘাতে মৃত্যু হল নারায়ণগড়ের পাইখোলার বিম্বল গ্রামের বাসিন্দা স্বপন সিংহের।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত কৃষকের বয়স ৪৩ বছর। হেমচন্দ্র গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত পাইখোলার বিম্বল গ্রামেই তাঁর বাড়ি। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে কৃষিকাজই ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান অবলম্বন। এ বার বর্ষার শুরু থেকেই টানা বৃষ্টির কারণে এলাকার বহু জমিতে চাষের কাজ পিছিয়ে যায়। জমিতে জল জমে থাকায় সময়মতো আমন ধানের চাষ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর জমিতে ধান রোয়া হলেও তার পরিচর্যা নিয়ে চিন্তায় ছিলেন কৃষকেরা।

সোমবার সেই কারণেই নিজের জমিতে গিয়েছিলেন স্বপন। সদ্য রোয়া আমন ধানগাছের জন্য জমিতে রাসায়নিক সার দেওয়ার কাজ করছিলেন তিনি। কৃষকের কাছে জমির প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো সার, জল এবং পরিচর্যা না হলে ফলন কমে যেতে পারে। আর ফলন কমলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতিতে। সেই চিন্তা থেকেই সম্ভবত প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মাঠে নেমেছিলেন স্বপন।

অথচ সেই সময়ই তাঁর মোবাইলে পৌঁছেছিল দুর্যোগের সরকারি সতর্কবার্তা। জানা গিয়েছে, বেলা প্রায় দুটো এবং পরে বিকেল চারটে নাগাদ দু’দফায় সতর্কবার্তা আসে। বার্তায় ঝোড়ো হাওয়া এবং বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে খোলা মাঠে না থাকার পরামর্শ দেওয়া হলেও স্বপন তখন চাষের কাজে ব্যস্ত ছিলেন।

এর পরেই বদলে যায় পরিস্থিতি।

বিকেলের দিকে আচমকাই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। চারপাশ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসে। শুরু হয় মেঘের গর্জন। আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যেই মাঠে কাজ করছিলেন স্বপন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আচমকাই তীব্র বজ্রপাতের শব্দ শোনা যায়। বজ্রাঘাতে জমির মধ্যেই লুটিয়ে পড়েন তিনি।

কিছুক্ষণ ঘটনাস্থলেই অচেতন অবস্থায় পড়েছিলেন ওই কৃষক। বিষয়টি নজরে আসার পর আশপাশের মানুষ দ্রুত সেখানে ছুটে যান। তাঁকে উদ্ধার করে তড়িঘড়ি স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিৎসকেরা স্বপনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছয় পুলিশ। কী ভাবে ঘটনাটি ঘটল এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ কী, তা নিশ্চিত করতে মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশের তরফে ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্তও শুরু হয়েছে।

স্বপনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে বিম্বল গ্রামে। যাঁরা কিছুক্ষণ আগেও তাঁকে মাঠে কাজ করতে দেখেছিলেন, তাঁরাই পরে তাঁর মৃত্যুর খবর পান। পরিবারের কাছে ঘটনাটি যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই। সংসারের প্রয়োজনেই মাঠে যাওয়া, আর সেই মাঠেই প্রাণ হারানো—ঘটনাটি স্থানীয়দেরও গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছে।

এই ঘটনায় ফের সামনে এসেছে কৃষিজীবনের কঠিন বাস্তবতা। আবহাওয়া সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে গেলেও সব সময় সেই সতর্কতা মেনে চলা কৃষকদের পক্ষে সহজ হয় না। চাষের মরসুমে নির্দিষ্ট সময়ে জমিতে সার দেওয়া, কীটনাশক প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার বা অন্যান্য পরিচর্যার কাজ পিছিয়ে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে ফলনের উপর। বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছে একটি ফসলের মরসুমই পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা।

এ বার পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির কারণে কৃষিকাজের সময়সূচি এমনিতেই কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। ফলে জমিতে যখন কাজ করার সুযোগ মিলছে, তখন অনেক কৃষকই দ্রুত সেই কাজ শেষ করতে চাইছেন। কিন্তু বর্ষার মরসুমে আবহাওয়ার আচরণ দ্রুত বদলে যেতে পারে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই পরিষ্কার আকাশ থেকে তৈরি হতে পারে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ প্রবল ঝড়বৃষ্টি।

স্বপন সিংহের মৃত্যু সেই ঝুঁকিরই করুণ উদাহরণ। প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন অনেক দ্রুত মানুষের মোবাইলে আবহাওয়ার সতর্কবার্তা পৌঁছে যায়। প্রশাসনের তরফেও বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, জলাশয় বা উঁচু জায়গায় না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু শুধু সতর্কবার্তা পৌঁছে দিলেই যে বিপদ এড়ানো যায় না, নারায়ণগড়ের এই ঘটনা সেই প্রশ্নও তুলে দিল।

কৃষকের কাছে জমি যেমন জীবিকার জায়গা, তেমনই বর্ষাকালে সেটিই হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত বিপজ্জনক স্থান। বিশেষ করে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টির সময় খোলা মাঠে থাকা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই আবহাওয়ার সতর্কবার্তা পাওয়ার পর কৃষিকাজ সাময়িক ভাবে বন্ধ রেখে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও এক বার সামনে এল।

বিম্বল গ্রামে এখন সেই মাঠ, সেই ধানের চারা আর স্বপনের পরিবার—সবকিছুর সঙ্গেই মিশে রয়েছে এক গভীর শোকের স্মৃতি। যে জমি থেকে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি, সেই জমিই সোমবার তাঁর জীবনের শেষ সাক্ষী হয়ে রইল।

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved