
নিউজ ডেস্ক : বর্ষা এলেই মালদহের ভূতনিতে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করে গঙ্গার ভাঙন। প্রতি বছরের মতো এ বারও নদীর গ্রাসে পড়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও নদীর পাড় ভেঙে গিয়েছে, কোথাও আবার বসতবাড়ি ও চাষের জমি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে সোমবার ভাঙন কবলিত এলাকায় যান রতুয়ার বর্ষীয়ান তৃণমূল বিধায়ক সমর মুখোপাধ্যায়। বিলাইমারি ও মহানন্দটোলা গ্রাম পঞ্চায়েতের পশ্চিম রতনপুর এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয় ত্রাণসামগ্রীও।
তবে ভূতনির পরিস্থিতি পরিদর্শনের পাশাপাশি এ দিন তাঁর বক্তব্যে বিশেষ ভাবে উঠে আসে গঙ্গাভাঙন প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রসঙ্গ। ভাঙন রোধে অতীতে বিভিন্ন সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূয়সী প্রশংসা করেন সমর। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের বদলে অস্থায়ী এবং ‘অবৈজ্ঞানিক’ বাঁধ নির্মাণের উপরেই জোর দেওয়া হয়েছে। যার ফলেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
সমর মুখোপাধ্যায়ের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে গঙ্গার ভাঙন মালদহ-সহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করলেও সমস্যার মূল কারণ নিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হয়নি। তাঁর বক্তব্য, শুধুমাত্র নদীর পাড়ে বাঁধ তৈরি করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদীর গতিপথ, জলপ্রবাহ এবং ভাঙনের প্রকৃতি—সব দিক বিবেচনা করে বৃহত্তর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সোমবার ভাঙন দুর্গতদের সঙ্গে কথা বলার সময়ই এই প্রসঙ্গে একাধিক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নাম তুলে ধরেন রতুয়ার বিধায়ক। তিনি বলেন, তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু, অজয় মুখোপাধ্যায়, প্রফুল্ল সেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মুখ্যমন্ত্রীদের তিনি দেখেছেন। কিন্তু তাঁর দাবি, ভূতনি এবং আশপাশের এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষের দীর্ঘদিনের ভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কেউই প্রত্যাশিত উদ্যোগ নেননি।
এর পরেই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসায় সরব হন সমর। তাঁর বক্তব্য, গঙ্গাভাঙন প্রতিরোধের জন্য বর্তমান সরকার যে বৃহৎ পরিকল্পনার কথা বলেছে, তা বাস্তবায়িত হলে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুলতে পারে। মুখ্যমন্ত্রীর পরিকল্পনাকে সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, এই উদ্যোগের উপর এলাকার মানুষের আস্থা রয়েছে।
সমর দাবি করেন, গঙ্গাভাঙন রোধে প্রায় ৩৬০০ কোটি টাকার একটি মাস্টার প্ল্যান নিয়ে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মতে, এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু ভূতনি নয়, মালদহের আরও একাধিক ভাঙনপ্রবণ এলাকা উপকৃত হবে। একই সঙ্গে নদীভাঙনের সমস্যা মোকাবিলায় স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরির উপরেও জোর দেন তিনি।
এ দিন নিজের বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রীকে ধর্মীয় উপমাতেও তুলনা করেন সমর। তিনি শুভেন্দুকে ‘শ্রীকৃষ্ণ’-এর সঙ্গে তুলনা করে তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গঙ্গার গতিপথ পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করার আবেদন জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
সমরের বক্তব্য, গঙ্গার গতিপথে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে ভাঙনের প্রকোপ অনেকটাই কমানো যেতে পারে। তাঁর দাবি, এর ফলে শুধু রতুয়া নয়, মানিকচক, কালিয়াচক, মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাও উপকৃত হতে পারে। তবে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মতো বিষয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত নানা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সেই দিকটিও বিশেষজ্ঞদের বিবেচনায় রাখতে হবে বলে মত সংশ্লিষ্ট মহলের।
গঙ্গার ভাঙন নতুন কোনও সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে মালদহের নদী তীরবর্তী এলাকার বহু পরিবারকে ভিটেমাটি হারাতে হয়েছে। নদীর পাড় সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমি, রাস্তা, বসতবাড়ি এমনকি বিভিন্ন সরকারি ও সামাজিক পরিকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্ষার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেয়। ফলে নদীভাঙন প্রতিরোধের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ এবং নদীর গতিপথের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের দাবিও দীর্ঘদিনের।
এ দিনের পরিদর্শনে সমর মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যে রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, ১৯৮২ সালে তিনি প্রথম বার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন শিশির অধিকারীর সঙ্গে। বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাবা শিশির অধিকারীর সঙ্গেই তাঁর রাজনৈতিক পথচলার সেই সময়ের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
শুধু তাই নয়, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বিধানসভায় দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী নিজেও সমর মুখোপাধ্যায়ের সততার প্রশংসা করেছিলেন বলে দাবি করেন বর্ষীয়ান বিধায়ক। ফলে তাঁর সঙ্গে অধিকারী পরিবারের রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গও এ দিনের বক্তব্যে উঠে আসে।
ভূতনির ভাঙন পরিস্থিতি ঘুরে দেখে সমর বলেন, নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষ শুধু ত্রাণ চান না, তাঁরা চান স্থায়ী সমাধান। প্রতি বছর বর্ষা এলেই ভাঙনের আশঙ্কায় ঘরছাড়া হওয়ার আতঙ্কে থাকতে হয় তাঁদের। তাই অস্থায়ী ভাবে মেরামতির বদলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
এ দিনের কর্মসূচিতে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন বিধায়ক। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে থাকার আশ্বাসও দেওয়া হয়। তবে আগামী দিনে ঘোষিত মাস্টার প্ল্যান কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, নদীভাঙন ঠেকাতে কী ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ভূতনি-সহ মালদহের নদী তীরবর্তী এলাকাগুলিতে স্থায়ী সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত করা যায়—সেদিকেই এখন নজর স্থানীয় বাসিন্দাদের।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments