
নিউজ ডেস্ক; নেপালে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর থেকেই কোনও খোঁজ মিলছে না বাঁকুড়ার ইন্দপুর থানার মুদুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা অশোক পালের। প্রায় ৩৫ বছরের অশোক গত এক দশক ধরে নেপালের রাসুয়া এলাকায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছেন। নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর কোনও ভাবে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ফোন বন্ধ। ফলে নেপালে ঠিক কী পরিস্থিতির মধ্যে তিনি রয়েছেন, তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাঁর পরিবারের সদস্যদের।
অশোকের স্ত্রী জবা বর্তমানে ছেলে নিয়ে বীরভূমের ময়ূরেশ্বর-১ ব্লকের মল্লারপুর কোড়াপাড়ায় থাকেন। স্বামীর সঙ্গে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় ফোনে কথা বলাই ছিল তাঁর অভ্যাস। কিন্তু মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শেষ বার কথা হওয়ার পর আচমকাই সেই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
জবার কথায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্বামীর সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই কথা হয়েছিল। বুধবার সকালে ছেলের খবর জানতে অশোক একটি মেসেজও করেছিলেন। কিন্তু তার পর থেকেই তাঁর ফোন বন্ধ। এরপর যত সময় গিয়েছে, ততই উদ্বেগ বেড়েছে পরিবারের। অশোকের স্ত্রী জানিয়েছেন, প্রতিদিন যে মানুষটির সঙ্গে নিয়মিত কথা হত, তাঁর আচমকা কোনও খোঁজ না পাওয়ায় পরিবারের প্রত্যেকেই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে শুক্রবার অশোকের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন ময়ূরেশ্বর-১ ব্লকের বিডিও নিবিড় মণ্ডল এবং পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি ধীরেন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন এবং অশোকের কর্মস্থল, যোগাযোগের তথ্য-সহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রশাসনের তরফে পরিবারকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, অশোকের সন্ধান পেতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিডিও নিবিড় মণ্ডল বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে অশোক পালের সন্ধান পাওয়ার জন্য সমস্ত রকমের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্যে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও পরিবারের দুশ্চিন্তা অবশ্য কাটেনি।
অশোকের কর্মস্থল নেপাল হলেও বাংলায় ফিরলে তিনি সাধারণত বর্ধমান শহরের কাছাকাছি লাকুডিতে তাঁর বোন কবিতা দাসের বাড়িতে থাকেন। শুক্রবার সেই বাড়িতেও পৌঁছন পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকেরা। ডিএসপি এবং আইসি গিয়ে অশোকের বোনের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর কাছ থেকেও নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
এর মধ্যেই অশোকের বোন কবিতা দাসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরিবারের দাবি, অশোককে খুঁজে বের করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই ফোনালাপে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন কবিতা।
কবিতার কথায়, অশোককে উদ্ধারের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। প্রশাসনের তরফে যে ভাবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে, তাতে পরিবারের উদ্বেগ কিছুটা কমেছে। তবে যতক্ষণ না অশোকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না তাঁরা।
অন্য দিকে, অশোকের নিজের গ্রাম মুদুনিয়াতেও পৌঁছেছে প্রশাসন। শুক্রবার তালড্যাংরার বিধায়ক সৌভিক পাত্র সেখানে গিয়ে অশোকের মা-বাবার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। সঙ্গে ছিলেন ইন্দপুর থানার ওসি শ্রীমন্ত চক্রবর্তী। পরিবারের সদস্যদের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি নেপালে চলা পরিস্থিতি এবং উদ্ধারকাজের বিষয়ে তাঁদের আশ্বস্ত করেন বিধায়ক।
সৌভিক পাত্র জানান, ভারত সরকার নেপাল সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। নিখোঁজদের সন্ধানে তথ্য সংগ্রহ এবং উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। দ্রুত অশোককে খুঁজে পাওয়া যাবে বলেই আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
অশোকের ঘটনা একা নয়। নেপালের বিপর্যয়ের পরে দুর্গাপুরের আরও পাঁচ বাসিন্দার নিখোঁজ হওয়ার খবর সামনে এসেছে। শুক্রবার রাত পর্যন্ত তাঁদের কারও সন্ধান মেলেনি। ফলে দুর্গাপুরের বিভিন্ন পরিবারেও উৎকণ্ঠা ক্রমশ বাড়ছে।
বেনাচিতির শ্রীনগরপল্লির বাসিন্দা সুভাষচন্দ্র ঘোষ এবং সিটি সেন্টারের অম্বুজানগরীর বাসিন্দা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় নেপাল হয়ে মানসসরোবর যাওয়ার জন্য বেরিয়েছিলেন। তাঁদের সঙ্গে আরও পর্যটক ছিলেন বলে পরিবারের দাবি। কিন্তু বিপর্যয়ের পর থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সুভাষচন্দ্র ঘোষের ভাই বিভাস ঘোষ মুম্বই থেকে শুক্রবার ভোরে দুর্গাপুরে ফিরে এসেছেন। পরিবারের তরফে প্রশাসনের কাছে বার বার যোগাযোগ করা হলেও এখনও পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনও তথ্য হাতে আসেনি বলে অভিযোগ তাঁর। বিভাসের দাবি, কলকাতার একটি ভ্রমণ সংস্থার মাধ্যমে যাওয়া পর্যটকদের কয়েক জন ঘটনার আগে ইমিগ্রেশন সেন্টারে উপস্থিত ছিলেন। তার পর থেকেই তাঁদের সম্পর্কে আর কোনও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
নেপাল সরকারের কাছ থেকেও ভারতীয় পর্যটকদের বিষয়ে স্পষ্ট কোনও তথ্য না পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের একটাই দাবি—নিখোঁজ প্রত্যেকের অবস্থান সম্পর্কে দ্রুত নিশ্চিত তথ্য জানানো হোক এবং সম্ভব হলে তাঁদের উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।
এ দিকে বামুনাড়ার বাসিন্দা মৌসুমি গঙ্গোপাধ্যায় এবং অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়েরও কোনও সন্ধান এখনও মেলেনি। তাঁদের মেয়ে অঙ্কিতা বাবা-মায়ের খবরের অপেক্ষায় রয়েছেন। একদিকে নেপালের বিপর্যয়ের ভয়াবহতা, অন্য দিকে প্রিয়জনের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে উদ্বেগের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে নিখোঁজদের পরিবারগুলির।
প্রশাসনের তরফে বার বার বলা হচ্ছে, নেপালের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিখোঁজ ভারতীয়দের সন্ধান এবং উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। কিন্তু যতক্ষণ না প্রত্যেকের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ উদ্বেগ কাটছে না পরিবারগুলির। বাঁকুড়ার অশোক পাল থেকে দুর্গাপুরের নিখোঁজ পর্যটক—প্রিয়জনদের এখন একটাই অপেক্ষা, ফোনের ওপারে ফের এক বার পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments