Last updated: August 31st, 2026 at 03:57 pm

নিউজ ডেস্ক: হিমালয়ের পার্বত্য কোলে প্রকৃতির আকস্মিক ও রুদ্র তাণ্ডবে লন্ডভন্ড নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। নেপালের ভোটকোশী নদীতে নজিরবিহীন হিমবাহ বিস্ফোরণের (Glacial Outburst Flood) ফলে সৃষ্ট বিধ্বংসী হড়পা বান এবং কাদামাটির ধসে কার্যত চোখের নিমেষে মানচিত্র থেকে মুছে গিয়েছে একের পর এক সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম। সরকারি হিসেবে ইতিমধ্যেই মৃত্যুমিছিলের আকার ধারণ করেছে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়; এখনও পর্যন্ত আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ। এই ভয়াবহ ধ্বংসলীলার রেশ এসে পৌঁছেছে পশ্চিমবঙ্গেও। একদিকে যখন নিজের প্রাণ বাজি রেখে নিখোঁজ পরিজনের সন্ধানে দিশেহারা পরিবার কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছে, অন্যদিকে তখন মৃত্যুপুরীর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরে আসার রোমহর্ষক কাহিনী শোনাচ্ছেন প্রবীণ পুণ্যার্থীরা।
‘ফোনটা আর বাজল না!’ নিখোঁজ বাংলার সন্দীপ, অজানার উদ্দেশ্যে রওনা পরিবারের নেপালের রুশাইয়ের একটি বিখ্যাত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ২০১৯ সাল থেকে ‘স্টোর ম্যানেজার’ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা সন্দীপ কুমার গড়াই। গত বুধবার সকাল ৮টা ১০ থেকে ৮টা ১৫ মিনিটের মধ্যে শেষবারের মতো পরিবারের লোকজনের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল তাঁর। তার পরেই নেমে আসে সেই অভিশপ্ত কাদা-জলের গ্রাস। সেই ফোন বা বার্তার পর থেকে আর কোনওভাবেই সন্দীপবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে মোবাইলের নেটওয়ার্ক।
সন্দীপবাবুর পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, উদ্ভব হওয়া চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মাঝে শুক্রবার রাত ৯টা নাগাদ রাজ্য সরকারের তরফে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রশাসনের শীর্ষস্তর থেকে নিখোঁজ যুবকের সন্ধানে নেপাল সরকার ও ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্ত রকমের সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক আশ্বাসেও মন মানছে না পরিবারটির। প্রিয়জনকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেতে এবার নিজেদের উদ্যোগেই নেপালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন সন্দীপবাবুর শ্যালক রিন্টু সেন ও অন্যান্য আত্মীয়রা।
রওনা দেওয়ার পূর্বে কান্নাভেজা গলায় রিন্টু সেন বলেন, “জামাইবাবুর খোঁজে আমরা বাধ্য হয়ে নেপাল যাচ্ছি। ওঁকে যদি ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে পুরো পরিবারটাই একেবারে ভেসে যাবে, শেষ হয়ে যাবে। কোথায় যাব, কার কাছে সাহায্য চাইব— কিচ্ছু জানা নেই। তবুও এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেই জামাইবাবুকে খুঁজতে আমরা বেরোচ্ছি।”
চা পানের বিরতিতেই সাক্ষাৎ মৃত্যু নিশ্চিত! উত্তরপাড়ার শিক্ষিকার অলৌকিক প্রত্যাবর্তন অন্য দিকে, ভোটকোশী নদীর এই প্রলয়ঙ্করি হড়পা বানের হাত থেকে অল্পের জন্য প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে এসেছেন হুগলির উত্তরপাড়ার বাসিন্দা, ৬৯ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষিকা অঞ্জনা সান্যাল। কলকাতার একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ১৭ জনের একটি পুণ্যার্থী দলের সঙ্গে কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের উদ্দেশ্যে গত ২৬ আগস্ট কাঠমান্ডু থেকে চীনের ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের দিকে বাসে রওনা দিয়েছিলেন তিনি।
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় কিছুটা দূর যাওয়ার পর চালক বাসটি দাঁড় করিয়ে সবাইকে চা খাওয়ার বিরতি দেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বাসচালকের ফোনে আসে ভোটকোশী নদীর বাঁধ ভেঙে হড়পা বান আসার সেই আতঙ্কজনক খবর। বিপদ বুঝতে পেরে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে বিচক্ষণ বাসচালক তড়িঘড়ি বাস ঘুরিয়ে কাঠমান্ডুর নিরাপদে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
অঞ্জনাদেবী শিউরে উঠে সেই মুহূর্তের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “আকাশ পুরো পরিষ্কার ছিল। হঠাৎ দূরে দেখি বিশালাকার ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর নদীর জল যেন মেগের মতো পাহাড় ডিঙিয়ে নেমে আসছে। চালক যদি তৎক্ষণাৎ বাসটি না ঘোরাতেন, আমরা মাঝরাস্তায় জ্যামে আটকে যেতাম। তাহলে আর জীবনেও হয়তো বাড়ি ফেরা হতো না।”
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেও কৈলাস-মানস সরোবরের দর্শন অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার আক্ষেপ রয়েছে এই প্রবীণ মহিলার। তবে প্রাণের রক্ষা পাওয়াকে ঈশ্বরের পরম আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছেন তিনি। অঞ্জনাদেবী সাফ জানিয়েছেন, বয়স ৭০ স্পর্শ করলেও এই আতঙ্ক কাটিয়ে আগামী দিনে প্রয়োজনে হেলিকপ্টারে চেপে আকাশপথেই কৈলাস দর্শনে যাবেন তিনি।
নেপালের এই ভয়াবহ বিপর্যয় কেবল ভৌগোলিক সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই; ওপারের পাহাড়ের এই ধ্বংসলীলা এপারেও বহু পরিবারের রাতের ঘুম ও মানসিক শান্তি কেড়ে নিয়েছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments