Homeউত্তর ২৪ পরগনানিমতায় ঘুমের মধ্যেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু বৃদ্ধ দম্পতির, খাটেই পুড়ে গেলেন বৃদ্ধা

নিমতায় ঘুমের মধ্যেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু বৃদ্ধ দম্পতির, খাটেই পুড়ে গেলেন বৃদ্ধা

নিউজ ডেস্ক; সাতসকালে জানলা দিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পেয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কিন্তু ততক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে। ঘরের ভিতরে তখন নিথর হয়ে পড়ে রয়েছেন বৃদ্ধ দম্পতি। দমকলের কর্মীরা ঘটনাস্থলে
resizeplus_Screenshot 2026-09-11 152311_edited (1)

নিউজ ডেস্ক; সাতসকালে জানলা দিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পেয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কিন্তু ততক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে। ঘরের ভিতরে তখন নিথর হয়ে পড়ে রয়েছেন বৃদ্ধ দম্পতি। দমকলের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার করলেন দু’জনের অগ্নিদগ্ধ দেহ। মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর ২৪ পরগনার নিমতা কালচার মোড় এলাকায়। ঘুমন্ত অবস্থাতেই আগুনে পুড়ে ওই দম্পতির মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে।

মৃতদের নাম ননীগোপাল দাস (৯৬) এবং তৃপ্তি দাস (৮৭)। কালচার মোড়ের কাছেই একটি দোতলা বাড়িতে থাকতেন তাঁরা। বাড়ির দোতলার একটি ঘরেই বৃদ্ধ দম্পতির থাকার ব্যবস্থা ছিল। বয়সের ভারে দু’জনেই অনেকটাই নির্ভরশীল ছিলেন। বৃহস্পতিবার ভোরে আচমকা সেই ঘরেই আগুন লাগে। কী ভাবে আগুনের সূত্রপাত, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সকাল ছ’টা বাজতে তখনও কয়েক মিনিট বাকি। আচমকাই কয়েক জন বাসিন্দার নজরে আসে, বৃদ্ধ দম্পতির বাড়ির দোতলার একটি ঘরের জানলা দিয়ে ধোঁয়া এবং আগুন বেরোচ্ছে। প্রথমে বিষয়টি বুঝে উঠতে না পারলেও মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। প্রতিবেশীরা চিৎকার করে অন্যদের খবর দেন। পাশাপাশি দমকল ও পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

বৃদ্ধ দম্পতির বাড়ির কাছেই থাকেন তৃপ্তিদেবীর ভাইপো সুরজিৎ রায়চৌধুরী। খবর পেয়েই তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং প্রতিবেশীরাও সেখানে জড়ো হন। ততক্ষণে আগুনের তীব্রতা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। দ্রুত দমকলের একটি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে।

প্রায় ৪০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর দমকলের কর্মীরা ঘরের ভিতরে ঢোকেন। সেখানেই দেখা যায় ভয়াবহ দৃশ্য। আগুনে ঘরের খাটটি প্রায় সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে। খাটের পোড়া কাঠামোর মধ্যেই পড়ে ছিল বৃদ্ধা তৃপ্তি দাসের অগ্নিদগ্ধ দেহাংশ। অন্য দিকে, ঘরের দরজার কাছে উপুড় হয়ে পড়েছিলেন বৃদ্ধ ননীগোপাল দাস। তাঁর দেহও আগুনে পুড়ে গিয়েছিল।

ঘরের পরিস্থিতি দেখে দমকলকর্মীদের প্রাথমিক অনুমান, আগুন লাগার পর অন্তত এক বার ঘর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন ননীগোপালবাবু। সম্ভবত আগুনের তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে দরজার দিকে এগিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাইরে বেরোতে পারেননি। দরজার কাছেই তাঁর মৃত্যু হয়।

অন্য দিকে, তৃপ্তিদেবী সম্ভবত খাট থেকে নেমে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাননি। বয়সজনিত কারণে তাঁর পক্ষে দ্রুত নড়াচড়া করা কঠিন ছিল বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে খাটের উপরেই আগুনের মধ্যে আটকে পড়েন তিনি। দমকলকর্মীরা যে দৃশ্য দেখেছেন, তাতে সেই আশঙ্কাই আরও জোরালো হয়েছে।

ননীগোপাল দাস ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষ করে স্ত্রীকে নিয়ে নিমতার বাড়িতেই থাকতেন তিনি। তাঁদের একমাত্র ছেলে সুব্রত দাস রেলের কর্মী ছিলেন। গত বছর চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি। বর্তমানে স্ত্রী ও পরিবারকে নিয়ে নাগপুরে থাকেন সুব্রত। ফলে বৃদ্ধ বাবা-মা কলকাতার বাড়িতে একাই থাকতেন।

পরিবারের জন্য এই দুর্ঘটনা যে কতটা মর্মান্তিক, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। জানা গিয়েছে, ননীগোপালবাবু ও তৃপ্তিদেবীর একমাত্র মেয়েরও মৃত্যু হয়েছিল কয়েক বছর আগে। ২০২১ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। সেই ঘটনার পর বৃদ্ধ দম্পতির জীবনে একমাত্র ছেলে ও তাঁর পরিবারের সঙ্গই ছিল প্রধান ভরসা। কিন্তু কর্মসূত্রে ছেলে নাগপুরে থাকায় নিয়মিত তাঁদের সঙ্গে থাকা সম্ভব হত না।

পড়শি এক আত্মীয়ের পরিবারের তরফে জানা গিয়েছে, দম্পতি সাধারণত দোতলার একটি ঘরেই থাকতেন। বৃহস্পতিবার রাতেও তাঁরা ওই ঘরেই ছিলেন। রাতের কোনও এক সময়ে ঘরে আগুন লাগে বলে অনুমান। কিন্তু সেই সময় বাড়ির আশপাশের কেউ বিষয়টি টের পাননি। ভোরের দিকে জানলা দিয়ে আগুন বেরোতে দেখা যাওয়ার পরেই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে।

আগুন লাগার কারণ নিয়ে এখনও নিশ্চিত ভাবে কিছু জানা যায়নি। রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, কোনও বৈদ্যুতিক গোলযোগ হয়েছিল কি না, নাকি অন্য কোনও কারণে আগুন ছড়ায়—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দমকল এবং পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।

বিশেষ করে ঘরের ভিতরে আগুন কী ভাবে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘরের আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী আগুনের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে। আগুন লাগার সময় দম্পতি ঘুমিয়ে ছিলেন বলেই প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে। সেই কারণেই আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগে তাঁরা কোনও ভাবে সাহায্য চাইতে পারেননি বলে অনুমান।

বৃদ্ধ ননীগোপালের দেহ দরজার কাছে পাওয়া যাওয়ায় তাঁর শেষ মুহূর্তের পরিস্থিতি নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। তিনি সম্ভবত আগুন দেখতে পেয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ঘর ধোঁয়ায় ভরে যাওয়ায় বা আগুনের তাপে অসুস্থ হয়ে পড়ে যেতে পারেন। তবে এই বিষয়টি নিশ্চিত ভাবে জানতে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

অন্য দিকে, বৃদ্ধার দেহ খাটের উপর পাওয়া যাওয়ায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগুন লাগার পর তিনি ঘর থেকে বেরোতে পারেননি। বয়সের কারণে তাঁর চলাফেরার সমস্যা ছিল কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশীদের অনেকেই জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে ওই বৃদ্ধ দম্পতিকে তাঁরা এলাকায় দেখে আসছেন। এমন মর্মান্তিক ভাবে দু’জনের একসঙ্গে মৃত্যু স্থানীয়দেরও গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছে।

একটি ঘর, একটি খাট—আর সেখানেই শেষ হয়ে গেল ৯৬ বছরের ননীগোপাল ও ৮৭ বছরের তৃপ্তির দীর্ঘ দাম্পত্যজীবন। আগুনের সূত্রপাত ঠিক কোথা থেকে, তা এখনও রহস্য। তবে পুলিশের তদন্ত ও দমকলের রিপোর্টেই পরিষ্কার হবে কী ভাবে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল এবং কেন শেষ মুহূর্তে ওই বৃদ্ধ দম্পতি ঘর থেকে বেরোতে পারলেন না।

No Comments

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved