
নিউজ ডেস্ক; ছবির মতো সাজানো গ্রাম। মাটির দেওয়াল, খড় বা কাঠের ছাউনি, পাথরের মেঝে, চারদিকে পাহাড়-জঙ্গল আর সরু মেঠো পথ। বাড়ির দেওয়ালে ফুটে উঠবে আদিবাসী লোকশিল্পের নানা ছবি। সঙ্গে থাকবে স্থানীয় খাবারের স্বাদ, লোকসংস্কৃতির অনুষ্ঠান, রাত কাটানোর ব্যবস্থা, মাছ ধরার সুযোগ থেকে তিরন্দাজি—সব মিলিয়ে পর্যটকদের জন্য একেবারে নতুন অভিজ্ঞতার দরজা খুলতে চলেছে ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়িতে।
পর্যটন মানচিত্রে ইতিমধ্যেই আলাদা জায়গা করে নিয়েছে ঝাড়গ্রাম। জঙ্গল, পাহাড়, নদী, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবনযাত্রার টানে প্রতি বছর বহু পর্যটক ছুটে আসেন এই জেলায়। বিশেষ করে শীতের মরসুমে পর্যটকদের ভিড় এতটাই বাড়ে যে বিভিন্ন হোটেল ও লজে ঘর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সেই জনপ্রিয়তাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে এবার বেলপাহাড়িতে তৈরি হচ্ছে একটি বিশেষ ‘মডেল ভিলেজ’ বা আদর্শ গ্রাম।
বন দপ্তর সূত্রে খবর, শিমুলপাল এলাকার বালিচুয়া পাহাড়ের উপরে প্রায় দুই হেক্টর জমিতে গড়ে উঠবে এই পর্যটনকেন্দ্র। সেখানে তৈরি করা হবে ১৫টি ছোট মাটির বাড়ি। উদ্দেশ্য শুধু পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করা নয়, বরং একটি আদিবাসী গ্রামের আবহ ও জীবনযাত্রাকে পরিকল্পিত ভাবে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বেলপাহাড়ির পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলেই মনে করছে প্রশাসন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি বাড়িতে থাকবে গ্রামীণ পরিবেশের ছাপ। মাটির দেওয়াল, পাথরের মেঝে এবং কাঠের ছাদ ব্যবহার করে ঘরগুলি তৈরি করা হবে। দেওয়ালের গায়ে আঁকা থাকবে পশু-পাখি, প্রকৃতি এবং আদিবাসী জীবনের নানা দৃশ্য। অর্থাৎ, সেখানে পৌঁছনোর পর পর্যটকের মনে হবে যেন কোনও সাজানো পর্যটনকেন্দ্রে নয়, বরং সত্যিকারের একটি আদিবাসী গ্রামেই এসে পড়েছেন তিনি।
এই মডেল গ্রামের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে আদিবাসী সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সংগ্রহশালা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৫টি মাটির বাড়ির মধ্যে আটটি ঘরকে মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সেখানে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস, জীবনযাপন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন সামগ্রী পর্যটকদের সামনে তুলে ধরা হবে। ফলে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ নয়, স্থানীয় মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগও মিলবে।
খাবারের ক্ষেত্রেও থাকবে স্থানীয় স্বাদের বিশেষ আয়োজন। পর্যটকদের জন্য মেনুতে রাখা হবে আদিবাসী রান্নার নানা পদ। কুরকুটের চাটনি থেকে কুরকুটের ডিমের ওমলেট, শালপোড়া চিকেন, বাম্বু চিকেন, মাংস পিঠে—সবই চেখে দেখার সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি বাঙালির চেনা পান্তাভাতও থাকবে মেনুতে। ফলে একদিকে পাহাড়-জঙ্গলের পরিবেশ, অন্য দিকে স্থানীয় রান্নার স্বাদ—দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটবে এই প্রকল্পে।
খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি সামগ্রী কেনার ব্যবস্থাও থাকবে। বাবুই ঘাস, সাবাই ঘাস, পাথর-সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি হস্তশিল্পের জিনিসপত্র বিক্রির জন্য একটি বিপণনকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এর ফলে পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও কারুশিল্পকেও যুক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি পণ্য বিক্রির মাধ্যমে তাঁদের আয়ের সুযোগও বাড়বে।
পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য থাকবে বিশেষ ফটোশুটের ব্যবস্থাও। দার্জিলিঙে গিয়ে যেমন অনেক পর্যটক পাহাড়ি পোশাক পরে ছবি তোলেন, তেমনই বেলপাহাড়ির মডেল গ্রামেও আদিবাসী সাজে ছবি তোলার সুযোগ থাকবে। উৎসাহীরা পাঞ্চি শাড়ি ও গান্দো ধুতি পরে ছবি তুলতে পারবেন। প্রকৃতির কোলে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ছবি তোলার এই ব্যবস্থা পর্যটকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
শুধু দিনের সফর নয়, চাইলে পর্যটকেরা এই মডেল গ্রামে রাতও কাটাতে পারবেন। থাকার জন্য ছ’টি ঘর রাখার পরিকল্পনা হয়েছে। ফলে পর্যটকেরা সন্ধ্যার পরেও গ্রামের পরিবেশ, পাহাড়ের নৈঃশব্দ্য এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাবেন।
মডেল গ্রামের মাঝখানে একটি মঞ্চও তৈরি করা হবে। সেখানে নির্দিষ্ট সময়ে আদিবাসী শিল্পীদের নাচ ও গানের অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, পর্যটকেরা শুধু দর্শক হয়ে থাকবেন না, তাঁরা স্থানীয় লোকসংস্কৃতির সরাসরি অভিজ্ঞতাও পাবেন। প্রকল্পটির মূল ভাবনাই হল প্রকৃতি, সংস্কৃতি, খাবার এবং স্থানীয় জীবনযাত্রাকে একই পর্যটন-প্যাকেজের মধ্যে নিয়ে আসা।
পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বন দপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মডেল গ্রামে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি বৃষ্টির জল ধরে তা পরিশোধন ও ব্যবহারযোগ্য করার ব্যবস্থাও রাখা হবে। পাহাড়ি পরিবেশে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখেই পর্যটন পরিকাঠামো তৈরি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বালিচুয়া পাহাড়ের উপরে অবস্থিত এই গ্রামে পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করার জন্য পাথরের সিঁড়ি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাহাড়ে ওঠানামার পথও এমন ভাবে তৈরি করা হবে যাতে পর্যটকেরা নিরাপদে পুরো এলাকা ঘুরে দেখতে পারেন। পাহাড়ের পাদদেশেও থাকছে একাধিক আকর্ষণ। সেখানে একটি পুকুর খনন করা হবে। মডেল গ্রাম ঘুরে পাহাড় থেকে নেমে পর্যটকেরা সেই পুকুরে মাছ ধরার অভিজ্ঞতাও নিতে পারবেন।
শিশু ও তরুণ পর্যটকদের জন্যও থাকছে আলাদা ব্যবস্থা। প্রকল্পে একটি আর্চারি জ়োন রাখার পরিকল্পনা হয়েছে। সেখানে পর্যটকেরা তিরন্দাজির অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন। ফলে নিছক দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার বদলে পর্যটকদের অংশগ্রহণমূলক অভিজ্ঞতার উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
পুরো ব্যবস্থাটিকে একটি নির্দিষ্ট প্যাকেজের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বন দপ্তর জানিয়েছে, পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট মূল্যের টিকিট থাকবে। সেই টিকিটের আয় থেকেই মডেল গ্রামের রক্ষণাবেক্ষণের খরচ চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটির জন্য ইতিমধ্যেই ১১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলে বন দপ্তর সূত্রে জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের বরাদ্দ অর্থেই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগোচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে ঘিরে পর্যটন মহলেও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার স্বীকৃত ঝাড়গ্রাম ট্যুরিজ়মের কর্ণধার সুমিত দত্তের মতে, এই আদর্শ গ্রাম চালু হলে ঝাড়গ্রামের পর্যটন আকর্ষণ আরও বাড়বে। একই জায়গায় থাকা, খাওয়াদাওয়া, সংস্কৃতি, বিনোদন এবং স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পর্যটকদের কাছে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে বলেই তাঁর মত।
বিনপুরের বিধায়ক প্রণত টুডুও প্রকল্পটিকে কর্মসংস্থানের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাঁর বক্তব্য, এলাকায় ভারী শিল্পের সুযোগ সীমিত। তাই পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করাই অন্যতম লক্ষ্য। মডেল গ্রাম চালু হলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে এবং তার সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাজের সুযোগও তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বেলপাহাড়ির এই মডেল গ্রাম শুধুমাত্র নতুন একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, স্থানীয় সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে পর্যটনকে যুক্ত করার একটি বড় উদ্যোগ হিসাবেও দেখা হচ্ছে। পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা পরিবেশে মাটির বাড়িতে থাকা, আদিবাসী রান্নার স্বাদ নেওয়া, লোকনৃত্য দেখা, ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ছবি তোলা, হস্তশিল্প কেনা কিংবা তিরন্দাজি ও মাছ ধরার মতো অভিজ্ঞতা—এক সফরেই এত কিছু পাওয়ার সুযোগ ঝাড়গ্রামের পর্যটনকে নতুন পরিচয় দিতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শীতের মরসুমে বেলপাহাড়িতে পর্যটকদের ভিড় আরও বাড়বে বলেই আশা প্রশাসনের।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments