Homeঝাড়গ্রাম১০ মাসেই বেহাল ৫৫ লক্ষের রাস্তা! খানাখন্দে জল, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ঝাড়গ্রামে

১০ মাসেই বেহাল ৫৫ লক্ষের রাস্তা! খানাখন্দে জল, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ঝাড়গ্রামে

নিউজ ডেস্ক; মাত্র দশ মাস আগে পিচ ঢেলে নতুন করে তৈরি হয়েছিল রাস্তা। বরাদ্দ হয়েছিল প্রায় ৫৫ লক্ষ টাকা। কিন্তু
resizeplus_Screenshot 2026-09-02 171028_edited

নিউজ ডেস্ক; মাত্র দশ মাস আগে পিচ ঢেলে নতুন করে তৈরি হয়েছিল রাস্তা। বরাদ্দ হয়েছিল প্রায় ৫৫ লক্ষ টাকা। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সেই রাস্তার চেহারা দেখে প্রশ্ন উঠছে কাজের গুণমান নিয়ে। কোথাও পিচ উঠে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত, কোথাও আবার খানাখন্দে জমে রয়েছে বৃষ্টির জল। বর্ষার জলে সেই গর্তগুলি কার্যত ছোট ছোট পুকুরের আকার নিয়েছে। ফলে প্রতিদিন ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগের মুখে পড়তে হচ্ছে। স্কুলপড়ুয়া থেকে নিত্যযাত্রী—সকলেরই অভিযোগ, কয়েক মাস আগেই সংস্কার হওয়া রাস্তার এমন দশা মেনে নেওয়া যায় না।

ঘটনাটি ঝাড়গ্রাম শহরের। শহর থেকে বাছুরডোবা হয়ে মেদিনীপুরের দিকে যাওয়ার পথে পুর এলাকার প্রায় তিন কিলোমিটার রাস্তার বিভিন্ন অংশ এখন বেহাল। গুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তা ঝাড়গ্রাম-বাঁকুড়া ৫ নম্বর রাজ্য সড়কের সঙ্গে শহরকে যুক্ত করার পাশাপাশি মেদিনীপুরমুখী মূল সড়কের সঙ্গেও সংযোগ তৈরি করে। ফলে প্রতিদিন প্রচুর ছোট-বড় গাড়ি এই রাস্তা ব্যবহার করে। রাস্তার বর্তমান পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

ঝাড়গ্রাম পুর এলাকার বেহাল রাস্তা সংস্কারের জন্য গত বছর অগস্টে পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের তরফে প্রায় তিন কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। ওই অর্থে পুরসভার মোট ১০টি রাস্তা সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তার মধ্যে অন্যতম ছিল ঝাড়গ্রাম শহরের সাত নম্বর ওয়ার্ডের ঝাড়গ্রাম বার্তার মোড় থেকে তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাছুরডোবা হয়ে দুই নম্বর ওয়ার্ডের শালতলা মোড় পর্যন্ত রাস্তাটি।

এই রাস্তা সংস্কারের জন্য প্রায় ৫৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল বলে পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ রাস্তার কাজ শুরু হয়। কাজ শেষ হওয়ার পর স্থানীয়দের একাংশের আশা ছিল, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ এবার অন্তত কমবে। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কয়েক মাস যেতে না যেতেই বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার পিচ উঠে যেতে শুরু করে। বর্ষা নামার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

বৃষ্টির জল রাস্তার গর্তে জমে থাকায় কোথায় রাস্তা শেষ আর কোথায় গর্ত শুরু, তা বোঝাই কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বিশেষ করে দু’চাকার গাড়ি নিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে সমস্যার মাত্রা আরও বেশি। গর্তে চাকা পড়ে ভারসাম্য হারানোর আশঙ্কা থাকছে। পথচারীদেরও জল-কাদা পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জয়দেব গিরির অভিযোগ, বহুদিন ধরে রাস্তার অবস্থা খারাপ থাকার পরে শেষ পর্যন্ত সেটি সংস্কার করা হয়েছিল। তাঁর কথায়, নতুন রাস্তা দেখে মনে হয়েছিল এবার হয়তো দীর্ঘদিনের সমস্যা মিটবে। কিন্তু দশ মাসের মধ্যেই ফের রাস্তা খানাখন্দে ভরে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত কার্যত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তাঁর প্রশ্ন, এত টাকা খরচ করে তৈরি করা রাস্তা যদি এক বছরের মধ্যেই ফের নষ্ট হয়ে যায়, তা হলে সেই কাজের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না কেন?

তবে রাস্তা দ্রুত নষ্ট হওয়ার কারণ হিসেবে অন্য যুক্তি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি সংস্থা। তাদের দাবি, এই রাস্তার উপর দিয়ে নিয়মিত ভারী যানবাহন চলাচল করে। ফলে রাস্তার উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। বিশেষ করে জাতীয় সড়ক থেকে ঝাড়গ্রাম শহর হয়ে মেদিনীপুরের দিকে যাওয়া বহু দূরপাল্লার লরি এই রাস্তা ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, কংসাবতী নদীর বালি খাদান থেকে বালি বহনকারী ট্রাক ও লরিও এই পথ দিয়ে ঝাড়গ্রাম-বাঁকুড়া ৫ নম্বর রাজ্য সড়কে ওঠে।

ঠিকাদারি সংস্থার যুক্তি, ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের ক্রমাগত চলাচল এবং বর্ষার জল—দুইয়ের প্রভাবেই রাস্তার বিভিন্ন অংশ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয়দের একাংশ সেই যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন। তাঁদের প্রশ্ন, রাস্তা তৈরির সময় যদি ওই পথে ভারী যান চলাচল সম্পর্কে প্রশাসন ও নির্মাণকারী সংস্থার জানা থাকে, তা হলে সেই অনুযায়ী রাস্তার কাঠামো এবং নির্মাণসামগ্রীর মান নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

রাস্তার এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোরও। তৎকালীন তৃণমূল পরিচালিত ঝাড়গ্রাম পুরবোর্ডের সময় এই রাস্তার কাজ হয়েছিল। ফলে রাস্তার দ্রুত বেহাল হয়ে যাওয়ার জন্য তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলেছে বিজেপি।

জেলা বিজেপির সহ-সভাপতি দেবাশিস কুণ্ডুর অভিযোগ, রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তাঁর দাবি, তৃণমূল আমলের দুর্নীতি এবং কাটমানির অভিযোগের প্রভাব এখন সাধারণ মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, রাস্তার কাজের গুণমান নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তার তদন্ত হওয়া দরকার। বর্ষার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই তাঁদের প্রশাসন রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নেবে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

যদিও রাস্তার দ্রুত ক্ষয়ের পেছনে শুধুমাত্র নির্মাণকাজের গুণমানকেই দায়ী করা হচ্ছে না। ভারী যানবাহনের চাপ, বৃষ্টির জল জমে থাকা এবং নিকাশি ব্যবস্থার সমস্যাও রাস্তার ক্ষতির অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ। ফলে প্রকৃত কারণ জানতে রাস্তার নির্মাণসামগ্রীর মান, পিচের স্তর, রাস্তার নীচের ভিত্তি এবং জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা—সবকিছু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এদিকে ঝাড়গ্রাম শহর থেকে মেদিনীপুরের দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে রাস্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এর দুরবস্থার প্রভাব পড়ছে বৃহত্তর এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও। প্রতিদিন কাজের প্রয়োজনে যাঁরা মেদিনীপুর বা ঝাড়গ্রামের মধ্যে যাতায়াত করেন, তাঁদের অনেকেই এই রাস্তা ব্যবহার করেন। স্কুল ও কলেজের পড়ুয়া, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রোগী নিয়ে যাতায়াতকারী পরিবার—সকলকেই এই রাস্তার উপর নির্ভর করতে হয়।

বর্ষাকালে রাস্তার গর্তে জল জমে যাওয়ায় গাড়ির গতি কমিয়ে চলতে হচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে যানজটও। আবার গর্ত এড়াতে গিয়ে গাড়ি রাস্তার অন্য অংশে চলে যাওয়ায় মুখোমুখি সংঘর্ষ বা ছোটখাটো দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, রাতের দিকে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত আলো না থাকায় জল জমে থাকা গর্ত সহজে চোখে পড়ে না।

প্রশাসনের তরফে অবশ্য বিষয়টি নজরে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ঝাড়গ্রাম মহকুমা প্রশাসনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, রাস্তার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশাসন অবগত। বর্ষার মরসুম শেষ হলে রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু সাময়িক ভাবে গর্ত বুজিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন করে রাস্তার কাজ হলে এবার নির্মাণের গুণমানের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে ভারী যানবাহনের চাপ সামলানোর মতো পরিকাঠামো তৈরি করা এবং রাস্তার দু’পাশে জল বেরিয়ে যাওয়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করাও জরুরি। না হলে কয়েক মাস পর ফের একই ছবি দেখা দিতে পারে।

সব মিলিয়ে ৫৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে সংস্কার হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা মাত্র দশ মাসের মধ্যে ফের বেহাল হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে। রাস্তার কাজের মান ঠিক ছিল কি না, নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত মানদণ্ড মেনে চলা হয়েছিল কি না এবং অতিরিক্ত ভারী যানবাহনের চাপের বিষয়টি পরিকল্পনার মধ্যে রাখা হয়েছিল কি না—এই সব প্রশ্নের উত্তর চান স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রশাসনের তরফে বর্ষা শেষে সংস্কারের আশ্বাস মিললেও, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলে ঝাড়গ্রাম শহর ও মেদিনীপুরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগপথ নিয়ে সমস্যা থেকেই যাবে। এখন দেখার, বর্ষা কাটার পর রাস্তা মেরামতের কাজ কত দ্রুত শুরু হয় এবং আগের মতো অল্প সময়ের মধ্যে যাতে ফের রাস্তা নষ্ট না হয়, তার জন্য কী ব্যবস্থা নেয় প্রশাসন।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved