
নিউজ ডেস্ক; নার্সিং পরিষেবার পরিধি ক্রমশ বদলাচ্ছে প্রযুক্তির হাত ধরে। রোগীর পরিচর্যা থেকে শুরু করে নার্সিং শিক্ষায় প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য-সাক্ষরতা বৃদ্ধি, গবেষণার ফলকে চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কী ভাবে নার্সিং পরিষেবাকে আরও কার্যকর, নিরাপদ এবং রোগীকেন্দ্রিক করে তুলতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হল কলকাতায় আয়োজিত দ্বিতীয় নার্সিং সম্মেলনে।
শনিবার আলিপুরের ধনধান্য প্রেক্ষাগৃহে শুরু হয়েছে দু’দিনের এই বিশেষ সম্মেলন। চন্দ্রকান্ত ইনস্টিটিউট অফ নার্সিং অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সেস এবং লিভার ফাউন্ডেশন-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনের নলেজ পার্টনার ছিল গ্লোবাল পেশেন্ট সেফটি নার্সেস ফোরাম। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নার্সিং শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা এই সম্মেলনে অংশ নেন।
সম্মেলনের মূল বিষয় ছিল—‘ইনোভেশনস ইন নার্সিং এডুকেশন, প্র্যাকটিস অ্যান্ড রিসার্চ: এমফাসাইজ়িং হেলথ লিটারেসি’। অর্থাৎ নার্সিং শিক্ষা, পরিষেবা ও গবেষণায় নতুন পদ্ধতির ব্যবহার এবং একই সঙ্গে স্বাস্থ্য-সাক্ষরতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়াই ছিল আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
সম্মেলনে আলোচনায় উঠে আসে, একজন রোগী নিজের অসুস্থতা, চিকিৎসা পদ্ধতি, ওষুধ এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ কতটা বুঝতে পারছেন, তার উপর চিকিৎসার ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করে। ফলে শুধু চিকিৎসা পরিষেবা দিলেই হবে না, রোগী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য বোঝানো জরুরি।
এই জায়গাতেই নার্সদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা। রোগীর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় সরাসরি যোগাযোগ রাখেন নার্সরাই। ফলে রোগীর স্বাস্থ্য-সাক্ষরতা বাড়ানো, চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য সহজ ভাষায় বোঝানো এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা সম্পর্কে সচেতন করার ক্ষেত্রে নার্সরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
স্বাস্থ্য-সাক্ষরতা কী ভাবে পরিমাপ করা যায়, রোগীর চিকিৎসায় তার প্রভাব কতটা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিষেবার যুগে নার্স ও রোগী—দু’পক্ষকেই কী ভাবে আরও ক্ষমতায়িত করা যায়, তা নিয়েও সম্মেলনে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সম্মেলনের প্রথম দিনের আলোচনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাস্তব রোগীর উপর সরাসরি প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি সিমুলেশন বা কৃত্রিম পরিস্থিতি তৈরি করে নার্সিং শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীকে কী ভাবে সামলাতে হবে, কী ভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে কিংবা কোনও চিকিৎসা প্রক্রিয়া কী ভাবে নিরাপদে সম্পন্ন করতে হবে—এই ধরনের দক্ষতা তৈরিতে সিমুলেশন পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এর নৈতিক ও আইনি দিকগুলিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। নার্সিং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাই এবং প্রশিক্ষণের মান নির্ধারণে শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়।
এর পাশাপাশি উঠে আসে ‘এআই-এনেবল্ড সিমুলেশন অ্যান্ড ইমার্সিভ টেকনোলজিস’-এর প্রসঙ্গ। আধুনিক এআই এবং ইমার্সিভ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ভবিষ্যতে প্রচলিত নার্সিং দক্ষতা তৈরির পদ্ধতির বিকল্প হয়ে উঠতে পারে কি না, তা নিয়েও মতবিনিময় করেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য পরিষেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে গোটা বিশ্বেই আলোচনা চলছে। রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ, ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ, চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গেও এআই-সহায়ক নার্স-নির্ভর পরিষেবার আরও বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা সম্মেলনে উঠে আসে।
তবে প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প নয়, বরং নার্সদের কাজকে আরও দক্ষ করে তোলার একটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত—এমন দৃষ্টিভঙ্গিও আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। রোগীর নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিক দিকগুলিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়।
নার্সিং গবেষণা শুধুমাত্র গবেষণাপত্র বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার ফল কী ভাবে বাস্তব স্বাস্থ্য পরিষেবায় ব্যবহার করা যায়, সেই বিষয়টিও সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব পায়।
গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য ও ফলাফলকে নীতি নির্ধারণ, হাসপাতালের পরিষেবা উন্নত করা এবং রোগীর চিকিৎসার মান বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে। গবেষণাভিত্তিক নার্সিং পরিষেবা জোরদার হলে রোগীর নিরাপত্তা এবং চিকিৎসার সামগ্রিক ফলাফল আরও উন্নত হতে পারে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, আগামী দিনে নার্সিং পেশাকে শুধু রোগীর পরিচর্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রযুক্তি, গবেষণা, স্বাস্থ্য-সাক্ষরতা এবং রোগীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে নার্সিং পরিষেবাকে আরও ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত করতে হবে। সেই পরিবর্তনের পথেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
দু’দিনের এই সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিশেষজ্ঞদের মতবিনিময়ের ফলে নার্সিং শিক্ষা ও পরিষেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। বিশেষ করে রোগীর নিরাপত্তা এবং উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিক দক্ষতার সমন্বয়ের উপরই যে আগামী দিনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, কলকাতার এই সম্মেলনের আলোচনায় তারই ইঙ্গিত মিলেছে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments