Homeহুগলিবলাগড়নদীর পাড়ে বাস, চিন্তা বারো মাস’, গঙ্গার ভাঙনে তলিয়ে যাচ্ছে বলাগড়ের চরখয়রামারি

নদীর পাড়ে বাস, চিন্তা বারো মাস’, গঙ্গার ভাঙনে তলিয়ে যাচ্ছে বলাগড়ের চরখয়রামারি

নিউজ ডেস্ক; নদীর পাড়ে বাস, চিন্তা বারো মাস’—প্রবাদটি যেন হুগলির বলাগড়ের চরখয়রামারি গ্রামের মানুষের জীবনের নির্মম বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। বর্ষার
Bhangan

নিউজ ডেস্ক; নদীর পাড়ে বাস, চিন্তা বারো মাস’—প্রবাদটি যেন হুগলির বলাগড়ের চরখয়রামারি গ্রামের মানুষের জীবনের নির্মম বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। বর্ষার মরশুমে গঙ্গার জল বাড়তেই ফের ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়েছে নদীভাঙন। একের পর এক বাড়ি, চাষের জমি, রাস্তা—সবই চলে যাচ্ছে নদীগর্ভে। কয়েক মাস আগেই তৈরি হয়েছিল নতুন পিচের রাস্তা। কিন্তু সেই রাস্তাটিও এখন গঙ্গার গ্রাসে। ফলে স্বাভাবিক যাতায়াত কার্যত বন্ধ। ধানের জমির উপর দিয়ে ঘুরে যেতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

শুধু রাস্তা হারানোর সমস্যা নয়, নদীর পাড় বরাবর মাটির নীচ দিয়ে যাওয়া পানীয় জলের পাইপলাইনেও ফাটল ধরেছে বলে অভিযোগ। ফলে ভাঙনের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে পানীয় জলের সঙ্কটও। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যে কোনও সময় গঙ্গার জল রাস্তা পেরিয়ে বসতবাড়ির উঠোনে ঢুকে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বাড়িঘর হারানোর ভয় নিয়ে দিন কাটছে বহু পরিবারের।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, চরখয়রামারি সংলগ্ন এলাকায় কয়েক মিটার জুড়ে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। প্রতিদিন নদীর পাড়ের মাটি ধসে পড়ছে। কোথাও মাটিতে বড় ফাটল দেখা যাচ্ছে, কোথাও আবার পাড়ের অংশ আচমকাই নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে। বর্ষার জলস্তর আরও বাড়লে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়েই এখন চিন্তায় বাসিন্দারা।

এক সময় এই এলাকায় রানিনগর, দুর্লভপুর এবং গৌরনগর—এই তিনটি মৌজা ছিল। কিন্তু গঙ্গার অবিরাম ভাঙনে গৌরনগর মৌজা সম্পূর্ণ ভাবে নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। দুর্লভপুর ও রানিনগরেরও একটা বড় অংশ আর আগের অবস্থায় নেই। স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, একসময় এলাকায় দেড় থেকে দুই হাজার মানুষের বসবাস ছিল। নদী ধীরে ধীরে জমি ও বসতভিটে গ্রাস করায় সেই সংখ্যা কমতে কমতে এখন ৩০০-র কিছু বেশি পরিবারে এসে দাঁড়িয়েছে।

নদী শুধু মানুষের বাড়ি কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে জীবিকার জমিও। চাষের জমি হারিয়ে বহু পরিবার এখন দিনমজুরি কিংবা খেতমজুরির উপরে নির্ভরশীল। যাঁদের একসময় নিজেদের জমি ছিল, তাঁদের অনেকেই এখন অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে নদীভাঙনের প্রভাব শুধু বসতভিটে হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সঙ্কটও।

স্থানীয় বাসিন্দা অসীম ঘোষালের অভিযোগ, মাত্র দু’মাস আগে তৈরি হওয়া পিচের রাস্তাও ইতিমধ্যে নদীতে চলে গিয়েছে। তাঁর কথায়, রাস্তা না থাকায় সাধারণ মানুষের যাতায়াতে ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি পানীয় জলের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে জলের সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

অসীমের দাবি, ভাঙন ঠেকাতে প্রশাসনের তরফে অতীতে একাধিক বার বালির বস্তা ফেলে এবং নদীর পাড়ে মাটি ও অন্যান্য সামগ্রী ডাম্পিং করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু নদীর স্রোতের সামনে সেই সব অস্থায়ী ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তাঁর কথায়, বার বার অস্থায়ী ভাবে কাজ না করে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দা শিউলি সরকার আরও বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বাড়িতে ছোট সন্তানদের নিয়ে রাতে ঘুমোতেও ভয় লাগে। একবার বাঁধ তৈরি হওয়ার পরে তাঁরা ভেবেছিলেন, হয়তো এ বার ভাঙন থামবে। কিন্তু ফের সেই বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

শিউলির কথায়, অন্যত্র জমি বা বাড়ি কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁদের নেই। ফলে নদীর পাড়ে থেকেই প্রতিনিয়ত ভাঙনের আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। সরকারের কাছে তাঁর দাবি, শুধু সাময়িক ভাবে বালির বস্তা ফেলে পরিস্থিতি সামাল না দিয়ে এমন ব্যবস্থা করা হোক যাতে আগামী দিনে নদীর জল বসত এলাকায় ঢুকতে না পারে।

আর এক বাসিন্দা সরস্বতী ঘোষালের বক্তব্যেও একই ক্ষোভ ও অসহায়তার ছবি ফুটে উঠেছে। তাঁর অভিযোগ, গঙ্গার ভাঙনে এলাকার খেলার মাঠও নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। অর্থাৎ বাড়ি ও জমির পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের সামাজিক পরিসরও। তাঁর মতে, সরকার বদলালেও তাঁদের জীবনের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নয়, তাঁদের এখন প্রয়োজন নদীভাঙন রোধের কার্যকর পরিকাঠামো। বিশেষ করে পাকা কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণের দাবি জোরালো হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, বালির বস্তা বা মাটি ফেলে সাময়িক ভাবে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হলেও বর্ষার প্রবল স্রোতে তা ফের ভেসে যায়। ফলে কয়েক মাস পর আবার একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

চরখয়রামার মানুষের আরও অভিযোগ, নদীবাঁধের পাশাপাশি রাস্তা এবং পানীয় জলের পরিকাঠামোকেও ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা জরুরি। রাস্তা নদীতে চলে যাওয়ায় গ্রামের সঙ্গে বাইরের এলাকার যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। অন্য দিকে, জলের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে পানীয় জলের সমস্যা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্ষার বাকি সময়ে গঙ্গার জলস্তর আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে ভাঙনের গতি আরও বাড়লে নতুন করে কত পরিবার ক্ষতির মুখে পড়বে, তা নিয়েই আশঙ্কা স্থানীয়দের। ইতিমধ্যেই যাঁরা ভিটেমাটি হারিয়েছেন, তাঁদের পুনর্বাসন এবং যাঁরা এখনও নদীর পাড়ে রয়েছেন, তাঁদের নিরাপত্তা—দুই বিষয়েই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি উঠেছে।

চরখয়রামার বাসিন্দাদের বক্তব্য, বছরের পর বছর ধরে তাঁরা একই সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। নদীভাঙন কোনও নতুন বিপর্যয় নয়, কিন্তু প্রতিবার বর্ষা এলেই তার ভয়াবহতা নতুন করে সামনে আসে। তাই এ বার তাঁরা চান, সমস্যা দেখা দেওয়ার পরে তৎপরতা নয়—আগেই স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলা হোক।

গঙ্গার স্রোতের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে টিকে থাকা এই গ্রামের মানুষ এখন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে। তাঁদের একটাই দাবি—আর কোনও বাড়ি, জমি, রাস্তা কিংবা মানুষের জীবিকা যেন নদীগর্ভে হারিয়ে না যায়। অস্থায়ী প্রতিরোধের বদলে স্থায়ী কংক্রিটের বাঁধই এখন তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা

No Comments

তাজা খবর

আরও পড়ুন

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved