
নিউজ ডেস্ক : ট্রেনে বিনা টিকিটে কিংবা নিয়ম না মেনে যাতায়াতের প্রবণতা ঠেকাতে আরও কড়া পদক্ষেপ করল উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে। যাত্রীদের বৈধ টিকিট নিয়ে সফর নিশ্চিত করতে ২০২৬ সালের জুলাই মাস জুড়ে একাধিক বিশেষ ও আকস্মিক টিকিট পরীক্ষার অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানে ধরা পড়েছেন প্রায় ৭৭ হাজার যাত্রী। রেল সূত্রে খবর, টিকিট সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে জুলাই মাসে ভাড়া, জরিমানা এবং অতিরিক্ত মাশুল বাবদ মোট ১০.৯৫ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে।
রেলের দাবি, এই অভিযান শুধুমাত্র রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে চালানো হয়নি। বৈধ টিকিট কেটে যাঁরা নিয়ম মেনে ট্রেনে সফর করেন, তাঁদের যাত্রা যাতে বিঘ্নিত না হয় এবং ট্রেনের ভিতরে তুলনামূলক স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় থাকে, সেই লক্ষ্যেই টিকিট পরীক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ব্যস্ত স্টেশন, গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন এবং যাত্রীদের বেশি চাপ থাকা রুটগুলিতে নিয়মিত ও হঠাৎ পরিদর্শন চালানো হয়।
বিনা টিকিটে সফর, ধরা পড়লেন ৫৫ হাজারের বেশি
জুলাই মাসে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের অভিযানে ধরা পড়া ৭৬,৯৮৯ জনের মধ্যে ৫৫,৯৮৮ জনের কাছে বৈধ টিকিট ছিল না। অর্থাৎ, তাঁরা কোনও টিকিট ছাড়াই ট্রেনে যাতায়াত করছিলেন। এই যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া এবং নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত মাশুল মিলিয়ে মোট ৮.৯৭ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে।
রেলের নিয়ম অনুযায়ী, টিকিট ছাড়া ট্রেনে ওঠা শুধু রাজস্বের ক্ষতি করে না, একইসঙ্গে বৈধ টিকিটধারী যাত্রীদের জন্যও সমস্যার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ভিড়ের সময়ে অতিরিক্ত যাত্রী ট্রেনে ওঠায় বসার জায়গা, চলাচল এবং সামগ্রিক যাত্রী পরিষেবার উপর চাপ তৈরি হয়। তাই এই ধরনের অনিয়ম রুখতে নিয়মিত টিকিট পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রেল কর্তৃপক্ষ।
অনিয়মিত টিকিটেও কড়া নজর
শুধু সম্পূর্ণ বিনা টিকিটের যাত্রীই নন, ভুল বা অনিয়মিত টিকিট নিয়ে যাত্রা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জুলাই মাসে এমন ২১,০০১ জন যাত্রীকে শনাক্ত করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে জরিমানা ও অতিরিক্ত মাশুল বাবদ মোট ১.৯৮ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে।
অনিয়মিত টিকিটের আওতায় একাধিক ধরনের ঘটনা পড়তে পারে। যেমন, নির্দিষ্ট শ্রেণির বদলে অন্য শ্রেণিতে সফর করা, প্রয়োজনীয় শর্ত না মেনে টিকিট ব্যবহার করা অথবা টিকিটের সঙ্গে যাত্রার বাস্তব তথ্যের অসঙ্গতি থাকা। টিকিট পরীক্ষার সময় এই ধরনের বিষয় সামনে এলে রেলের নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট যাত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এ ছাড়াও অন্যান্য অনিয়মের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জুলাই মাসে এই ধরনের জরিমানা থেকে আরও ৬৭.৮৯ লক্ষ টাকা আদায় করেছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে। পাশাপাশি, লাগেজ সংক্রান্ত নিয়ম ভাঙার ঘটনাতেও জরিমানা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জুলাই মাসে আদায় হয়েছে প্রায় ১.৩৮ লক্ষ টাকা।
৩১৩টি বিশেষ অভিযান, পরীক্ষা ২,৩৪৪টি ট্রেনে
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, জুলাই মাসে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের বিভিন্ন প্রান্তে মোট ৩১৩টি বিশেষ টিকিট-চেকিং অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানের আওতায় ২,৩৪৪টি ট্রেনে টিকিট পরীক্ষা করেন রেলের কর্মীরা। শুধু নির্দিষ্ট সময়ে পূর্বঘোষিত পরীক্ষা নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী আকস্মিক অভিযানও চালানো হয়েছে।
রেলের কমার্শিয়াল বিভাগের কর্মী, টিকিট পরীক্ষক এবং মাঠপর্যায়ের অন্যান্য কর্মীদের সমন্বিত উদ্যোগেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনেও যাত্রীদের টিকিট পরীক্ষা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, টিকিট না কেটে অথবা নিয়মবহির্ভূতভাবে সফর করার প্রবণতা কমানো।
রেলের বক্তব্য, এ ধরনের ধারাবাহিক পরীক্ষা যাত্রীদের মধ্যে নিয়ম মেনে সফরের অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করবে। অনেক ক্ষেত্রে আকস্মিক টিকিট পরীক্ষার ফলে যাত্রীরা বুঝতে পারেন যে কোনও স্টেশন বা নির্দিষ্ট ট্রেনে নিয়মিত পরীক্ষা হচ্ছে না ধরে নিয়ে বিনা টিকিটে যাত্রা করার সুযোগ নেই। ফলে টিকিট ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এই অভিযান কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
চার মাসে জরিমানা ৫০ কোটিরও বেশি
শুধু জুলাই মাসের হিসাবেই নয়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম চার মাসেও টিকিট পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য সাফল্যের দাবি করেছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে। এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত চার মাসে টিকিটবিহীন অথবা অনিয়মিত টিকিট নিয়ে যাত্রার মোট ৪,১৪,৭৯৬টি ঘটনা ধরা পড়েছে।
এই সময় ভাড়া ও অতিরিক্ত মাশুল বাবদ মোট ৫০.৫৭ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। অর্থাৎ, জুলাইয়ের অভিযানকে বিচ্ছিন্ন কোনও উদ্যোগ হিসেবে দেখছে না রেল। বরং অর্থবর্ষের শুরু থেকেই টিকিট পরীক্ষার উপর ধারাবাহিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রেল কর্তৃপক্ষের মতে, কমার্শিয়াল বিভাগের কর্মীদের পাশাপাশি টিকিট পরীক্ষক এবং ফিল্ড পর্যায়ের কর্মীদের নিয়মিত দায়িত্ব পালন ও আকস্মিক পরিদর্শনের কারণেই এই ধরনের অনিয়ম চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে। রেলের আয় সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি যাত্রী পরিষেবার মান বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
যাত্রীদের কী পরামর্শ রেলের?
উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের তরফে যাত্রীদের উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—ট্রেনে ওঠার আগে অবশ্যই বৈধ টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। যাত্রার সময় প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথিও সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে লাগেজ নিয়ে সফরের ক্ষেত্রেও রেলের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে বলা হয়েছে। নির্দিষ্ট সীমার বেশি মালপত্র থাকলে তা নিয়ম অনুযায়ী বুক করার আবেদন জানিয়েছে রেল। অতিরিক্ত লাগেজ নিয়ে নিয়ম ভাঙলে জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে বলেও যাত্রীদের সতর্ক করা হয়েছে।
রেলের বক্তব্য, টিকিট পরীক্ষার অভিযানকে শুধুমাত্র শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে চলবে না। এর অন্যতম উদ্দেশ্য যাত্রীদের মধ্যে নিয়ম মেনে সফরের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। বৈধ টিকিট নিয়ে যাত্রা করলে একদিকে যেমন যাত্রী নিজে অযাচিত জরিমানা এড়াতে পারেন, তেমনই অন্য যাত্রীদের অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।
উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের মতে, একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ টিকিট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে রেল এবং যাত্রী—দুই পক্ষের সহযোগিতাই প্রয়োজন। যাত্রীরা নিয়ম মেনে টিকিট কাটলে রেলের রাজস্ব সুরক্ষিত হবে, একইসঙ্গে ট্রেনের পরিষেবা ও যাত্রী ব্যবস্থাপনাও আরও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব হবে।
তাই জুলাইয়ের বিপুল সংখ্যক অনিয়ম ধরা পড়ার পরেও অভিযান থামছে না। বরং নিয়মিত টিকিট পরীক্ষা এবং আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে বিনা টিকিট বা অনিয়মিত টিকিটে সফরের প্রবণতা আরও কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই এগোতে চাইছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments