
নিউজ ডেস্ক : ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর খাবারের তালিকা নিয়ে অনেকের মনেই তৈরি হয় একের পর এক প্রশ্ন। ভাত কতটা খাবেন, রুটি খাওয়া যাবে কি না, কোন আটা তুলনামূলক ভাল—এই নিয়ে দ্বিধা থাকেই। বিশেষ করে রুটি যেহেতু বহু ভারতীয় পরিবারের প্রতিদিনের খাবারের অংশ, তাই সেটিকে একটু স্বাস্থ্যকর ভাবে তৈরি করা যায় কি না, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে অনেকের। পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী, শুধু একটি খাবার বাদ দেওয়া নয়, বরং খাবারে ফাইবার, গোটা শস্য ও ডালজাতীয় উপাদানের পরিমাণ বাড়ানো এবং মোট কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। (Diabetes UK)
এই জায়গা থেকেই গমের আটার সঙ্গে রাগি, বার্লি এবং ছোলার আটা বা বেসনের মতো উপাদান মেশানোর কথা উঠে আসে। এই উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে ফাইবার ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার—কোনও বিশেষ মিশ্রণের রুটি খেলেই ব্লাড সুগার ‘জব্দ’ হয়ে যাবে, এমন দাবি বৈজ্ঞানিক ভাবে ঠিক নয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাবারের ধরন, মোট কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ, রুটির আকার, শারীরিক পরিশ্রম, ওষুধ এবং ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য—সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে।
রাগি বা ফিঙ্গার মিলেট গোটা শস্যের একটি জনপ্রিয় উৎস। এতে খাদ্যতালিকাগত ফাইবার রয়েছে। ফাইবারযুক্ত খাবার তুলনামূলক বেশি সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং খাবারের কার্বোহাইড্রেট শরীরে শোষিত হওয়ার গতি ধীর হতে পারে। উচ্চ ফাইবারযুক্ত গোটা শস্যকে ডায়াবেটিসের খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়। (Diabetes UK)
তাই সাধারণ গমের আটার সঙ্গে কিছুটা রাগির আটা মিশিয়ে রুটি তৈরি করা যেতে পারে। এতে রুটিতে বৈচিত্র্য আসার পাশাপাশি ফাইবারের পরিমাণও বাড়তে পারে। তবে রাগি যোগ করলেই রুটিটি ‘ডায়াবেটিক রুটি’ হয়ে যায় না। কতটা রুটি খাওয়া হচ্ছে এবং সঙ্গে কী খাওয়া হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বার্লি বা যব soluble fibre-এর একটি ভাল উৎস। বিশেষ করে এতে থাকা বিটা-গ্লুকান নামের ফাইবার নিয়ে পুষ্টিবিজ্ঞানে যথেষ্ট আলোচনা রয়েছে। বার্লি, ওটস, ডাল, বাদাম-সহ একাধিক খাবারে soluble fibre পাওয়া যায়। এই ধরনের ফাইবার হজম প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং সামগ্রিক ভাবে হৃদ্স্বাস্থ্য ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। (Diabetes UK)
তাই গমের আটার সঙ্গে অল্প পরিমাণ বার্লির আটা মিশিয়ে রুটি বানানো যেতে পারে। তবে বাজারে পাওয়া যে কোনও ‘বার্লি পাউডার’ কিনে নেওয়ার আগে প্যাকেটের উপাদান তালিকা দেখে নেওয়া উচিত। অতিরিক্ত চিনি বা অন্য অপ্রয়োজনীয় উপাদান রয়েছে কি না, তা খেয়াল করা দরকার।
ছোলা বা chickpea হল ডালজাতীয় খাবারের অন্তর্ভুক্ত। ছোলায় ফাইবার এবং উদ্ভিজ্জ প্রোটিন রয়েছে। ডালজাতীয় খাবার সাধারণত তুলনামূলক কম GI-যুক্ত এবং এতে থাকা ফাইবার ও প্রোটিন কার্বোহাইড্রেট ভাঙার গতি ধীর করতে সাহায্য করতে পারে। ফলে অনেকের ক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজের দ্রুত ওঠানামা কম হতে পারে। (Diabetes UK)
এই কারণে গমের আটার সঙ্গে কিছুটা ছোলার আটা মিশিয়ে রুটি তৈরি করা যেতে পারে। তবে ছোলার আটার নির্দিষ্ট কোনও GI-সংখ্যা সব ক্ষেত্রে একই থাকবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। খাবারের ধরন, প্রক্রিয়াকরণ, রান্নার পদ্ধতি এবং অন্য খাবারের সঙ্গে কী ভাবে খাওয়া হচ্ছে, তার উপরেও রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়া বদলাতে পারে। (Diabetes UK)
ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি হল portion size বা খাবারের পরিমাণ। কম GI-যুক্ত খাবার হলেও বেশি পরিমাণে খেলে মোট কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রায় তার প্রভাব পড়তে পারে। Diabetes UK-ও ডায়াবেটিসে স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট বেছে নেওয়ার পাশাপাশি portion size-এর দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেয়। (Diabetes UK)
তাই রুটির সঙ্গে শুধু আটা বদলালেই হবে না। প্লেটে সবজি, ডাল বা উপযুক্ত প্রোটিনের উৎস রাখা এবং অতিরিক্ত ভাজাভুজি, মিষ্টি ও চিনি-যুক্ত খাবার কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাবারের একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্লেট তৈরি করাই বেশি কার্যকর পদ্ধতি।
গোটা শস্য বা wholegrain সাধারণত পরিশোধিত শস্যের তুলনায় বেশি ফাইবার ধরে রাখে। ডায়াবেটিসের খাদ্যতালিকায় refined carbohydrate-এর বদলে wholegrain ও high-fibre carbohydrate বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। (Diabetes UK)
তবে রুটির ক্ষেত্রে শুধু ‘আটা’ লেখা রয়েছে বলেই সেটি সবসময় সমান স্বাস্থ্যকর হবে, এমন নয়। কতটা প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে, ফাইবার কত রয়েছে এবং রুটির সঙ্গে আর কী খাওয়া হচ্ছে—এসব বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সহজ ভাবে চাইলে গমের আটার সঙ্গে রাগি, বার্লি এবং ছোলার আটা অল্প অল্প করে মিশিয়ে নিতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট অনুপাত প্রত্যেকের জন্য একই হবে না। বিশেষ করে যাঁরা ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ ব্যবহার করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে খাবারে বড় পরিবর্তন করার আগে চিকিৎসক বা রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া ভাল।
রুটি তৈরির সময় অতিরিক্ত তেল বা ঘি ব্যবহার না করাই ভাল। সঙ্গে প্রচুর সবজি, ডাল কিংবা উপযুক্ত প্রোটিনের উৎস রাখা যেতে পারে। আর একসঙ্গে অনেকগুলি রুটি খাওয়ার বদলে নিজের দৈনিক খাদ্যপরিকল্পনা অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনও একটি ‘ম্যাজিক’ খাবার নেই। রাগি, বার্লি বা ছোলার আটা মিশিয়ে তৈরি রুটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে, কিন্তু এটি ওষুধের বিকল্প নয় এবং শুধু এই রুটি খেলেই রক্তে শর্করা স্বাভাবিক হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যক্তিভেদে ডায়াবেটিসের ধরন, ওষুধ, বয়স, ওজন ও দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম অনুযায়ী খাদ্যপরিকল্পনাও বদলাতে পারে। তাই নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। (Diabetes UK)
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments