
নিউজ ডেস্ক : রাখি তো কম-বেশি সকলেই দেখেছেন। সুতো, পুঁতি, রঙিন কাপড় কিংবা নানা রকম সাজসজ্জায় তৈরি রাখির সঙ্গে পরিচিতিও নতুন নয়। কিন্তু পেস্তার খোসা, কুমড়োর বীজ, শসার বীজ, কচুরিপানা কিংবা কলাগাছের কাণ্ড দিয়ে তৈরি রাখি? শুনতে অবাক লাগলেও এমনই অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা। তাঁদের তৈরি এই পরিবেশবান্ধব রাখিতে যেমন রয়েছে নান্দনিকতার ছোঁয়া, তেমনই রয়েছে প্রকৃতি রক্ষার বার্তাও।
ফেলে দেওয়া বা অব্যবহৃত জিনিসকে নতুন করে কাজে লাগানোর ভাবনাকে সামনে রেখে প্রতি বছরই রাখির নতুন সম্ভার তৈরি করেন কৃষ্ণগঞ্জের চন্দননগর সমবায় সমিতির স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা। এ বার তাঁদের উদ্যোগে যোগ হয়েছে আরও বড় পরিবেশবান্ধব বার্তা। বাজারচলতি কৃত্রিম উপকরণের বদলে প্রকৃতি থেকে পাওয়া নানা সামগ্রী এবং দৈনন্দিন জীবনে ফেলে দেওয়া জিনিসকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হচ্ছে একের পর এক অভিনব রাখি।
এই রাখিগুলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ব্যবহৃত উপকরণের বৈচিত্র্য। পেস্তা খাওয়ার পর যে খোসা সাধারণত ডাস্টবিনে চলে যায়, সেই খোসাই তাঁদের হাতে পেয়েছে নতুন জীবন। একই ভাবে কুমড়োর বীজ, শসার বীজ, ধানের শিষ এবং ভুট্টার খোসাকেও ব্যবহার করা হয়েছে রাখি তৈরিতে।
কচুরিপানার মতো জলজ উদ্ভিদ, যা অনেক সময় পরিবেশের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সেটিও কাজে লাগানো হয়েছে এই উদ্যোগে। পাট, কাঠের গুঁড়ো, তালপাতা এবং কাপড়ের মতো উপকরণ দিয়েও তৈরি হয়েছে নানা ধরনের রাখি। ফলে প্রতিটি রাখির নকশা ও গঠনেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
শুধু যে দেখতে আকর্ষণীয়, তা নয়—এই রাখিগুলির পিছনে রয়েছে পুনর্ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। সাধারণত যে সমস্ত উপকরণ ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়, সেগুলিকে কী ভাবে নতুন কোনও প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহার করা যায়, তারই উদাহরণ তৈরি করেছেন তাঁরা।
পরিবেশবান্ধব এই রাখিগুলির আর একটি বড় আকর্ষণ হল দাম। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই রাখা হয়েছে প্রতিটি রাখির মূল্য। মাত্র ৫ টাকা, ১০ টাকা এবং ২০ টাকা দামে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন নকশার রাখি।
ফলে শুধু পরিবেশ সচেতন মানুষই নন, সাধারণ ক্রেতারাও সহজেই এই রাখি কিনতে পারবেন। উৎসবের বাজারে কম খরচে কিছুটা অন্য রকম রাখি উপহার দেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের এই উদ্যোগের ফলে তাঁদের নিজেদের আয় করার পথও তৈরি হচ্ছে। বাড়িতে বসে বা স্থানীয় পরিসরে পাওয়া উপকরণ কাজে লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে পণ্য। সেই পণ্য বাজারে বিক্রি করে উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন তাঁরা। অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষার বার্তার পাশাপাশি মহিলাদের স্বনির্ভরতার ভাবনাটিও এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
প্রথম দিকে স্থানীয় বাজারকে কেন্দ্র করেই এই ধরনের রাখি তৈরি ও বিক্রির কাজ চললেও এখন তার চাহিদা বাড়ছে বলে উদ্যোক্তাদের দাবি। নদিয়া জেলার গণ্ডি পেরিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের দোকানেও পৌঁছে যাচ্ছে তাঁদের তৈরি পরিবেশবান্ধব রাখি।
প্রতি বছর নতুন নকশা ও নতুন উপকরণ নিয়ে বাজারে হাজির হওয়ার চেষ্টা করেন তাঁরা। আগের বছরগুলিতে তৈরি রাখির সংগ্রহও রয়েছে। ফলে ক্রেতাদের সামনে একই ধরনের রাখির বদলে থাকছে বিভিন্ন সময়ের নানা নকশা ও উপকরণের সম্ভার।
এ বারের উদ্যোগে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে। গাছের পাতা, কাণ্ড, ধানের শিষ কিংবা প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে রাখি তৈরি করে মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে প্রকৃতিকে ভাল রাখার একটি বার্তাই তুলে ধরতে চাইছেন তাঁরা।
এ বারের রাখিতে ব্যবহার করা হয়েছে কলাগাছের কাণ্ড ও পাতা। পাশাপাশি বট এবং অশ্বত্থ গাছের পাতা ও কাণ্ডের মতো প্রাকৃতিক উপকরণও কাজে লাগানো হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে উলের তৈরি রাখি।
এক একটি রাখি তৈরির পিছনে তাই শুধু কারিগরি দক্ষতা নয়, রয়েছে সৃজনশীল চিন্তাভাবনাও। সাধারণ উপকরণকে নতুন ভাবে সাজিয়ে উৎসবের সামগ্রী তৈরি করার এই পদ্ধতি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের কাজকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
বিশেষ করে পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন উৎসবের সামগ্রীর মধ্যেও সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা তাৎপর্যপূর্ণ। রাখি মূলত ভাই-বোনের সম্পর্কের প্রতীক হলেও, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সেই বন্ধনের সঙ্গে প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
পেস্তার খোসা, বীজ, কচুরিপানা কিংবা ভুট্টার খোসা—সাধারণ চোখে এগুলি হয়তো ফেলে দেওয়ার সামগ্রী। কিন্তু একটু সৃজনশীল চিন্তা থাকলে সেই উপকরণগুলিই যে নতুন কোনও পণ্যের কাঁচামাল হয়ে উঠতে পারে, কৃষ্ণগঞ্জের মহিলাদের এই উদ্যোগ তারই উদাহরণ।
তাঁদের তৈরি রাখি তাই শুধু একটি উৎসবের সামগ্রী নয়। এর মধ্যে রয়েছে বর্জ্য কমানোর চেষ্টা, পুনর্ব্যবহারের বার্তা এবং স্থানীয় স্তরে মহিলাদের স্বনির্ভর হয়ে ওঠার গল্প। একই সঙ্গে বাজারের চেনা রাখির বাইরে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের পণ্য তৈরির মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের আলাদা জায়গাও তৈরি করছেন।
প্রকৃতির প্রতি ভালবাসা এবং মানুষের মধ্যে সম্পর্কের বন্ধন—এই দুই ভাবনাকে এক সুতোয় বেঁধেই তৈরি হচ্ছে তাঁদের রাখি। তাই এ বার রাখির বাজারে যদি একটু অন্য রকম কিছু খুঁজতে চান, তা হলে কৃষ্ণগঞ্জের এই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের তৈরি পরিবেশবান্ধব রাখি হতে পারে আকর্ষণীয় বিকল্প।
উৎসবের আনন্দের সঙ্গে যদি পরিবেশের কথাও মনে রাখা যায়, তা হলে সেই বন্ধন হয়তো আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। আর সেই বার্তাই পাঁচ, দশ কিংবা কুড়ি টাকার ছোট্ট রাখির মাধ্যমে মানুষের হাতে তুলে দিতে চাইছেন নদিয়ার এই মহিলারা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments