Last updated: August 26th, 2026 at 11:13 pm

নিউজ ডেস্ক: রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো এবং চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে যখন প্রায়শই নানা অভিযোগ ও বিতর্কের ঝড় ওঠে, ঠিক সেই আবহেই এক অভাবনীয় এবং বিরল সাফল্যের সাক্ষী থাকল গোটা বাংলা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে আক্ষরিক অর্থেই ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক ঘটনা বলা যেতে পারে, ঠিক তেমনই এক অসাধ্য সাধন করলেন নদিয়া জেলার শান্তিপুর স্টেট জেনারেল হাসপাতালের (Shantipur State General Hospital) চিকিৎসকরা। একই দিনে, একই হাসপাতালে দুই প্রসূতির অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার করে একসঙ্গে ছ’টি সন্তানকে নিরাপদে পৃথিবীর আলো দেখালেন তাঁরা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই দুই মহিলার প্রত্যেকেই গর্ভে একসঙ্গে তিনটি করে সন্তান ধারণ করেছিলেন। এই নজিরবিহীন সাফল্যের খবর প্রকাশ্যে আসতেই চিকিৎসকমহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ— সর্বত্রই এক বিপুল চাঞ্চল্য ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। জেলা স্তরের একটি সাধারণ সরকারি হাসপাতালে এমন বিশ্বমানের চিকিৎসা পরিষেবা যে সম্ভব, তা আরও একবার প্রমাণ করে দিলেন সেখানকার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, একজন মায়ের গর্ভে একসঙ্গে একাধিক সন্তান বা ‘মাল্টিপল প্রেগনেন্সি’ (Multiple Pregnancy) থাকা এমনিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়। সেখানে যমজ সন্তানের বদলে যদি একসঙ্গে তিনটি সন্তান (Triplets) থাকে, তবে মা এবং গর্ভস্থ শিশু— উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রাণসংশয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। শান্তিপুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ওই দুই প্রসূতির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল আরও কয়েক কদম বেশি জটিল। হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই দুই মায়ের গর্ভধারণের সময়কাল বা জেস্টেশনাল এজ (Gestational Age) ছিল একেবারেই প্রাথমিক বা মধ্যবর্তী পর্যায়ে। তাঁদের মধ্যে এক প্রসূতির গর্ভকাল ছিল মাত্র ১৮ থেকে ১৯ সপ্তাহ এবং অপরজনের প্রায় ২২ সপ্তাহ। চিকিৎসকদের মতে, এত কম সময়ের গর্ভকালে শিশুদের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে না, ফলে এই সময়ে প্রসব করানো হলে শিশুদের বাঁচিয়ে রাখাটা কার্যত এক অসম্ভব লড়াই হয়ে দাঁড়ায়। ডাক্তারি ভাষায় এটি একটি ‘এক্সট্রিমলি হাই-রিস্ক’ (Extremely High-Risk) বা চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি।
সাধারণত এই ধরনের জটিলতা দেখা দিলে জেলা বা মহকুমা স্তরের হাসপাতালগুলি থেকে রোগীদের কলকাতায় বড় কোনো মেডিক্যাল কলেজ বা অত্যাধুনিক পরিকাঠামো যুক্ত কর্পোরেট হাসপাতালে স্থানান্তরিত (Refer) করে দেওয়াটাই দস্তুর। কারণ, এমন অস্ত্রোপচারের জন্য যে ধরনের নিবিড় পর্যবেক্ষণ, দক্ষ সার্জন এবং অত্যাধুনিক নিওনেটাল কেয়ার বা নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রয়োজন হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই প্রান্তিক হাসপাতালগুলিতে থাকে না। কিন্তু শান্তিপুর স্টেট জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা সেই চেনা পথে না হেঁটে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। রোগীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে দেখে এবং স্থানান্তরের সময়কালীন ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে, তাঁরা হাসপাতালেই এই জটিল অস্ত্রোপচার করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন।
জানা গিয়েছে, এই অসাধ্য সাধনের জন্য হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ (Gynecologist), শল্য চিকিৎসক (Surgeon), আ্যনেস্থেটিস্ট (Anesthetist) এবং শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের (Pediatrician) নিয়ে একটি বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। অস্ত্রোপচারের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করা হয়। অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে তখন চরম উৎকণ্ঠা। চিকিৎসকদের ভাষায়, প্রতিটি সেকেন্ড ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। মায়ের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ রোধ করা এবং অপরিণত শিশুদের নিরাপদে বের করে আনা— এই জোড়া ফলায় বিদ্ধ ছিলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু তাঁদের অসামান্য দক্ষতা, ধৈর্য এবং হাসপাতালের নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত সফল হয় এই জোড়া অস্ত্রোপচার। একই দিনে দুই মায়ের গর্ভ থেকে মোট ছ’টি শিশু নিরাপদে জন্মগ্রহণ করে। চিকিৎসকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মা এবং সদ্যোজাতরা বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে। তবে অপরিণত হওয়ার কারণে শিশুদের আপাতত বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এই খবর হাসপাতালের বাইরে পৌঁছাতেই দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ও আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। যে পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছিল, তারা চিকিৎসকদের কার্যত ভগবানের আসনে বসাচ্ছেন। আনন্দে আত্মহারা এক শিশুর আত্মীয় জানান, “আমরা তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম মা এবং বাচ্চা কাউকে হয়তো বাঁচাতে পারব না। কিন্তু এখানকার ডাক্তারবাবুরা যা করলেন, তা কোনোদিন ভোলার নয়। সরকারি হাসপাতালেও যে এত যত্ন নিয়ে এমন বড় অপারেশন হতে পারে, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছেও এটি একটি বিশাল গর্বের দিন। এই বিরল সাফল্যের পর হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট এবং অন্যান্য আধিকারিকরা চিকিৎসক দলের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। চিকিৎসকমহলের একাংশের মতে, একই দিনে একই সরকারি হাসপাতালে দুজন ট্রিপলেট (Triplets) মায়ের সফল অস্ত্রোপচার এবং ছ’টি শিশুর জন্ম— এটি শুধু নদিয়া জেলা নয়, গোটা রাজ্যের চিকিৎসা পরিকাঠামোর ইতিহাসেই এক বিরলতম ঘটনা। এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকাঠামো এবং চিকিৎসকদের সদিচ্ছা থাকলে জেলা স্তরের সরকারি হাসপাতালগুলিও কর্পোরেট হাসপাতালের সঙ্গে সমানে সমানে পাল্লা দিতে পারে। শান্তিপুরের এই ঘটনা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে যে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আপাতত ছ’টি ফুটফুটে শিশুর কান্নার আওয়াজে মুখরিত শান্তিপুর হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগ, আর সেই শব্দেই লুকিয়ে রয়েছে চিকিৎসকদের এক অদম্য লড়াইয়ের জয়গাথা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments