Homeঅন্যান্যডুয়ার্সের অচেনা রূপকথা! ঘুরে আসুন চা-বাগান, জঙ্গল আর পাহাড়ি নদীর মায়ায় ‘বুড়িখোলা’

ডুয়ার্সের অচেনা রূপকথা! ঘুরে আসুন চা-বাগান, জঙ্গল আর পাহাড়ি নদীর মায়ায় ‘বুড়িখোলা’

নিউজ ডেস্ক : ছুটির দিনে পাহাড়-জঙ্গল দেখতে বেরিয়ে পর্যটকদের ভিড়ে যদি মনটাই খারাপ হয়ে যায়, তা হলে এবার একটু অন্য
1725290920_dooars-main-1

নিউজ ডেস্ক : ছুটির দিনে পাহাড়-জঙ্গল দেখতে বেরিয়ে পর্যটকদের ভিড়ে যদি মনটাই খারাপ হয়ে যায়, তা হলে এবার একটু অন্য পথে হাঁটতে পারেন। ডুয়ার্স মানেই শুধু চেনা পর্যটনকেন্দ্র, ব্যস্ত বাজার কিংবা মরসুমে হোটেল-রিসর্টের ভিড় নয়। উত্তরবঙ্গের এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের আনাচেকানাচে এখনও ছড়িয়ে রয়েছে এমন বহু জায়গা, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ মেলে অনেক বেশি নিরিবিলিতে। তেমনই এক অপেক্ষাকৃত অচেনা ঠিকানা হল কালিম্পং জেলার গরুবাথান ব্লকের ছোট্ট গ্রাম বুড়িখোলা

একদিকে সবুজে মোড়া চা-বাগান, অন্যদিকে ঘন অরণ্য। তার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী। কোথাও পাথরের উপর দিয়ে ছুটে চলা স্বচ্ছ জল, কোথাও আবার জঙ্গলের নীরবতার মধ্যে শুধু নদীর কুলকুল শব্দ। শহুরে জীবনের ব্যস্ততা থেকে কয়েক দিনের জন্য দূরে সরে গিয়ে এমন কোনও জায়গাতেই যদি মনটা রাখতে চান, তা হলে বুড়িখোলা হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য।

ডুয়ার্সের ভিড় থেকে দূরে অন্য এক ঠিকানা

ডুয়ার্সের নাম শুনলেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলির ছবি। ছুটির মরসুমে সেই সব জায়গায় পর্যটকদের আনাগোনাও থাকে যথেষ্ট। পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া হোক কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কয়েক দিনের পরিকল্পনা—পরিচিত জায়গাগুলির জনপ্রিয়তার কারণে অনেক সময় প্রকৃতির নির্জন সৌন্দর্য উপভোগ করাই কঠিন হয়ে পড়ে।

বুড়িখোলার বিশেষত্ব ঠিক সেখানেই। এখনও এই গ্রাম সেই অর্থে বাণিজ্যিক পর্যটনের ভিড়ে ঢেকে যায়নি। ফলে প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার পাশাপাশি কিছুটা নিভৃত সময় কাটানোর সুযোগও রয়েছে। বড় কোনও পর্যটনকেন্দ্রের মতো এখানে কোলাহল, দোকানের সারি কিংবা মানুষের ভিড় চোখে পড়বে না। বরং চারপাশের সবুজ আর পাহাড়ি পরিবেশই হয়ে উঠবে ভ্রমণের মূল আকর্ষণ।

জঙ্গল আর নদীর মেলবন্ধন

বুড়িখোলার অন্যতম আকর্ষণ শাকাম ফরেস্ট। ঘন জঙ্গলের বুক চিরে বয়ে চলেছে বুড়িখোলা নদী। নদীর পাথুরে পাড়ে বসে কিছুটা সময় কাটানোই এখানে আলাদা অভিজ্ঞতা হতে পারে। চারপাশে গাছপালার ঘন সবুজ, তার মাঝখানে পাহাড়ি নদীর স্রোত এবং দূরে জঙ্গলের নীরবতা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্য রকম পরিবেশ।

নদীর পাশে বসে জলধারার শব্দ শোনা কিংবা প্রকৃতির ছবি ক্যামেরাবন্দি করা—দুটিই হতে পারে ভ্রমণের অন্যতম মুহূর্ত। শহরের হর্ন, যানজট আর ব্যস্ততার বদলে এখানে কানে আসবে জলের শব্দ, পাখির ডাক এবং জঙ্গলের নিজস্ব নীরবতা।

যাঁরা প্রকৃতির মধ্যে বসে দীর্ঘ সময় কাটাতে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এই জায়গা বিশেষ ভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিভৃতে বসে পাহাড়-জঙ্গল দেখা—সবকিছুর জন্যই পরিবেশটা বেশ আলাদা।

শুধু গন্তব্য নয়, পথও সুন্দর

বুড়িখোলার আর একটি আকর্ষণ হল সেখানে পৌঁছনোর রাস্তা। অফবিট জায়গার ক্ষেত্রে অনেক সময় গন্তব্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যাত্রাপথ। বুড়িখোলার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।

এই গ্রামে পৌঁছনোর জন্য মূলত দু’টি রুটের কথা বলা হয়। একটি পথে মালবাজার পেরিয়ে সোনগাছি চা-বাগান এবং নাকটি ডিভিশনের রাস্তা ধরে এগোতে হয়। চা-বাগানের সবুজের মধ্যে দিয়ে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গাড়ি যত এগোবে, ততই বদলাতে থাকবে চারপাশের দৃশ্য।

অন্য একটি পথ রয়েছে গরুবাথানের ভুট্টাবাড়ি বনাঞ্চলের দিক দিয়ে। ঘন অরণ্যের ভিতর দিয়ে এগিয়ে পৌঁছনো যায় বুড়িখোলায়। শহুরে রাস্তার পরিচিত দৃশ্য ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে যায়। সামনে আসে পাহাড়, গাছপালা, চা-বাগান এবং অরণ্যের বিস্তৃত সবুজ।

তাই যাঁরা শুধুমাত্র গন্তব্যে পৌঁছনোর জন্য ভ্রমণ করেন না, বরং রাস্তার প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি দৃশ্য উপভোগ করতে চান, তাঁদের কাছেও এই যাত্রাপথ আলাদা আনন্দ দিতে পারে।

কম দিনের ছুটিতেও ঘুরে আসা সম্ভব

বুড়িখোলার আর একটি বড় সুবিধা হতে পারে ছোট ছুটির পরিকল্পনা। অফিস থেকে দীর্ঘ ছুটি পাওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। তার উপর অনেকেরই বাজেট থাকে সীমিত। সেই জায়গা থেকে খুব বড় ট্যুরের বদলে কয়েক দিনের ছোট ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে চাইলে এই ধরনের অফবিট গন্তব্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

এখানে মূল আকর্ষণ কোনও বিলাসবহুল বিনোদন নয়, বরং প্রকৃতি। ফলে ভ্রমণের আনন্দ অনেকটাই নির্ভর করবে চারপাশের পরিবেশকে উপভোগ করার উপর। নিরিবিলি থাকার জন্য স্থানীয় হোমস্টের বিকল্পও পাওয়া যেতে পারে। পাহাড়ি পরিবেশে স্থানীয় আতিথেয়তার সঙ্গে মোমো, থুকপার মতো জনপ্রিয় খাবারের স্বাদ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় আরও একটি মাত্রা যোগ করতে পারে।

তবে যাওয়ার আগে থাকার জায়গা, রাস্তার পরিস্থিতি এবং স্থানীয় যাতায়াতের ব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে নেওয়া ভাল। বিশেষ করে বর্ষার সময়ে পাহাড়ি রাস্তা ও নদীর পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তাই স্থানীয়দের পরামর্শ মেনে চলা এবং প্রকৃতির কোনও অংশে ঝুঁকি না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

ছবি নয়, স্মৃতিতে রাখার মতো জায়গা

বুড়িখোলার সৌন্দর্য শুধু ক্যামেরার ফ্রেমে আটকে রাখার মতো নয়। বরং কিছুটা সময় ফোন দূরে রেখে প্রকৃতিকে উপভোগ করাই হতে পারে এই সফরের আসল উদ্দেশ্য। সকালে চা-বাগানের সবুজ, দুপুরে জঙ্গলের ছায়া আর বিকেলে পাহাড়ি নদীর পাশে বসে থাকা—একটি ছোট সফরেই ডুয়ার্সের একাধিক রূপ দেখা সম্ভব।

প্রকৃতিপ্রেমী, ফটোগ্রাফির শখ রয়েছে এমন পর্যটক কিংবা শহরের কোলাহল থেকে সাময়িক মুক্তি চান—সবার কাছেই বুড়িখোলা হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় একটি অফবিট গন্তব্য। তবে জায়গাটির নিরিবিলি পরিবেশই যেহেতু সবচেয়ে বড় সম্পদ, তাই পর্যটকদেরও সেই পরিবেশের মর্যাদা রাখা জরুরি। প্লাস্টিক বা আবর্জনা না ফেলা, নদী ও জঙ্গলের ক্ষতি না করা এবং স্থানীয় পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ডুয়ার্সের চেনা রাস্তা ছেড়ে একটু অন্য অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে বুড়িখোলা হতে পারে তালিকায় রাখার মতো একটি জায়গা। চা-বাগানের সবুজ, জঙ্গলের নিস্তব্ধতা আর পাহাড়ি নদীর স্রোত—এই তিনের মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এমন এক পরিবেশ, যেখানে কয়েক দিনের জন্য হলেও শহরের ব্যস্ততা ভুলে থাকা যায়। বড় কোনও পর্যটনকেন্দ্রের চাকচিক্য নেই, নেই উপচে পড়া ভিড়। আছে শুধু প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সুযোগ। আর সেই কারণেই হয়তো ডুয়ার্সের এই অচেনা গ্রামটি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে ধীরে ধীরে হয়ে উঠতে পারে এক নতুন ‘রূপকথার ঠিকানা’।

No Comments

তাজা খবর

একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।

Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved