
বিশেষ প্রতিনিধি : রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ— সর্বত্র সাধারণ মানুষের পাসপোর্ট পাওয়ার মৌলিক অধিকারকে কীভাবে কার্যত জিম্মি করে রেখেছিল দালাল ও সিভিক ভলান্টিয়ারদের এক অসাধু সিন্ডিকেট, তা গত ৮ সেপ্টেম্বর প্রথমবার জনসমক্ষে তুলে ধরেছিল এনজিটিভি নিউজ (NGTV News)। সেই রাজ্য কাঁপানো ধারাবাহিক অনুসন্ধানী খবরের জেরে এবার আক্ষরিক অর্থেই নড়েচড়ে বসল প্রশাসন। রাজ্যজুড়ে শুরু হওয়া কড়া নজরদারি এবং গোপন তদন্তের মাঝেই এবার নদীয়া জেলার হরিণঘাটা ডিআইবি (DIB) অফিসে হাতেনাতে গ্রেফতার হলো দুই দুর্নীতিগ্রস্ত সিভিক ভলান্টিয়ার। অভিযোগকারীর কাছ থেকে রাসায়নিক মেশানো ১০ হাজার টাকার ঘুষের নোটে হাত পড়তেই দুর্নীতি দমন শাখা বা এসিবি (ACB)-র পাতা ফাঁদে পা দেয় ওই দুই অভিযুক্ত। এনজিটিভি নিউজের সেই ঐতিহাসিক খবরের অভিঘাত যে কেবল সংবাদমাধ্যমের পর্দাতেই আটকে থাকেনি, বরং প্রশাসনিক স্তরে এক বিরাট তোলপাড় সৃষ্টি করেছে, এদিনের এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারি তারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৮ সেপ্টেম্বর। যখন রাজ্যের অন্যান্য সংবাদমাধ্যম নানা চটুল খবরে মেতে ছিল, তখন পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের (Passport Verification) নামে গোটা বাংলাজুড়ে চলা এক সুসংগঠিত তোলাবাজির রুটম্যাপ প্রথমবার ফাঁস করে এনজিটিভি নিউজ। তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে স্পষ্ট দেখানো হয়েছিল, কীভাবে থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারেরা পাসপোর্টের ফাইলে ছাড়পত্র দেওয়ার বিনিময়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কীভাবে দিনের পর দিন টাকা আদায় করছিল , সেই নগ্ন সত্যটি সামনে আসতেই রাজ্যজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়।
এই চাঞ্চল্যকর খবরের পরেই টনক নড়ে রাজ্য পুলিশের শীর্ষ মহল এবং রাজ্য ভিজিল্যান্স ও দুর্নীতি দমন শাখার। প্রতিটি জেলার ডিআইবি অফিস এবং থানাগুলিতে শুরু হয় কড়া ও গোপন নজরদারি। আর সেই প্রক্রিয়ারই প্রথম বড়সড় ও হাতেনাতে সাফল্য এল নদীয়ার হরিণঘাটায়। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, হরিণঘাটার নিমতলা বাজার এলাকার এক বাসিন্দা সম্প্রতি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছিলেন। তাঁর পুলিশ ভেরিফিকেশনের দায়িত্ব পড়েছিল হরিণঘাটা ডিআইবি অফিসে। অভিযোগ, ভেরিফিকেশনের ফাইলে ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য ওই ব্যক্তির কাছে সরাসরি ১০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করে হরিণঘাটা ডিআইবি-তে কর্মরত দুই সিভিক ভলান্টিয়ার— বন্ধন দেবনাথ এবং রাজু কীর্তনীয়া। টাকা না দিলে ফাইলে ত্রুটি দেখিয়ে পাসপোর্ট আটকে দেওয়া হবে বলে প্রচ্ছন্ন হুমকিও দেওয়া হয়।
কিন্তু খবরের জেরে আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন সাধারণ মানুষ এবং প্রশাসন। অভিযোগকারী ওই ব্যক্তি বিষয়টি গোপন না রেখে সরাসরি দুর্নীতি দমন শাখার (ACB) দ্বারস্থ হন। এরপরই এসিবি কর্তারা অত্যন্ত সুকৌশলে একটি ফাঁদ পাতেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওই ১০ হাজার টাকার নোটগুলিতে এক বিশেষ ধরনের রাসায়নিক পাউডার (ফেনলপ্থ্যালিন) মাখিয়ে অভিযোগকারীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। সোমবার দুপুরে অভিযোগকারী যখন হরিণঘাটা ডিআইবি অফিসে গিয়ে ওই দুই সিভিক ভলান্টিয়ারকে ঘুষের টাকা দিতে যান, তখন আগে থেকেই সেখানে সাদা পোশাকে ওত পেতে ছিলেন এসিবি-র দুঁদে আধিকারিকরা। বন্ধন দেবনাথ এবং রাজু কীর্তনীয়া অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেই টাকা নিজেদের হাতে নেওয়া মাত্রই তাঁদের হাতেনাতে পাকড়াও করেন তদন্তকারীরা। রাসায়নিক মাখানো টাকায় হাত দেওয়ার অকাট্য প্রমাণ মেলার পর আর পালানোর কোনও পথ ছিল না অভিযুক্তদের সামনে।
হরিণঘাটায় এই দুই সিভিক ভলান্টিয়ার গ্রেফতার হলেও, অনুসন্ধানী মহলের মতে, এটি গোটা রাজ্যের পাসপোর্ট দুর্নীতির সুবিশাল সিন্ডিকেটের কেবল একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ বা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। কলকাতা থেকে শুরু করে শিলিগুড়ি— রাজ্যের প্রান্ত থেকে প্রান্তে বহু সাধারণ পরিবারের নিত্যদিনের অভিযোগ, পাসপোর্টের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি ফি জমা দেওয়ার পরও পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে তাঁদের হয়রানির শিকার হতে হয়। অতিরিক্ত ‘ঘুষের’ টাকা বা নজরানা না দিলে দিনের পর দিন ঝুলিয়ে রাখা হয় গুরুত্বপূর্ণ ফাইল। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে চিকিৎসার জন্য ভিনদেশে পাড়ি দিতে চাওয়া অসুস্থ রোগী— দালালচক্রের হাত থেকে রেহাই মেলে না কারও।
পাসপোর্ট মানুষের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত ও আইনি নথি। এটি পাওয়ার ক্ষেত্রে অহেতুক দীর্ঘসূত্রিতা এবং হয়রানি একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য চরম মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই ভয়ে মুখ খোলেন না, পাছে তাঁদের পাসপোর্টটি চিরতরে বাতিল হয়ে যায়। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মীরা সাধারণ মানুষের এই ভীতি ও আইনি অজ্ঞতাকেই নিজেদের মূলধন হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু হরিণঘাটার নিমতলা বাজারের ওই যুবকের সাহসিকতা এবং এসিবি-র এই তৎপরতা প্রমাণ করল যে, ভয় না পেয়ে প্রতিবাদ করলে আইনের চোখে দুর্নীতিগ্রস্তদের সাজা পেতেই হয়। আইনি মহলের মতে, ধৃতদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি নিবারণ আইনের একাধিক কড়া ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত এগোবে। একইসঙ্গে, ডিআইবি অফিসের মতো একটি স্পর্শকাতর জায়গায় সিভিক ভলান্টিয়ারদের এমন অবাধ বিচরণ ও নথিপত্র ঘাঁটার অধিকার নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
হরিণঘাটার ধৃত দুই সিভিক ভলান্টিয়ারকে হেফাজতে নিয়ে বর্তমানে ম্যারাথন জেরা করছেন এসিবি-র তদন্তকারী আধিকারিকরা। তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য এখন এই দুর্নীতির শিকড় পর্যন্ত পৌঁছনো। তাঁরা জানতে চাইছেন, চুক্তিভিত্তিক সামান্য বেতনের কর্মী হয়ে এই দুই অভিযুক্ত কার বা কাদের সাহসে এমন অবাধে তোলাবাজির কারবার চালাচ্ছিল? এই ঘুষের টাকার ভাগ কি কেবল নিচুতলায় সীমাবদ্ধ থাকত, নাকি তা জেলার পুলিশ প্রশাসনের আরও ওপরতলা বা রাঘববোয়ালদের পকেট পর্যন্ত পৌঁছত? রাজ্যজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা এই পাসপোর্টের কালো সিন্ডিকেটের আর কোন কোন শিকড় এবার উপড়ে ফেলা হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজ্যবাসীর কাছে।
এনজিটিভি নিউজ কেবল দুর্নীতির কথা বলে চুপ করে থাকেনি, বরং চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল গোটা রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষতটিকে। হরিণঘাটায় সিভিকদের এই আকস্মিক গ্রেফতারি তারই অকাট্য প্রমাণ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন এবং জনস্বার্থের এই লড়াইয়ে সংবাদমাধ্যম যে তার চতুর্থ স্তম্ভের দায়িত্ব পালনে একচুলও পিছপা হবে না, তা ফের একবার প্রমাণিত হলো। খবর এখানে শুধু হেডলাইনে বা টিআরপি-র চমকে আটকে থাকে না, বরং তা পৌঁছে যায় আসল সত্যের গভীরে। সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় আগামী দিনেও এই ধরনের বেনিয়মের পর্দাফাঁস করতে বদ্ধপরিকর আমরা।
একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, যার লক্ষ্য শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়— মানুষের কথা, মানুষের অধিকার এবং সমাজের বাস্তব চিত্রকে নির্ভীকভাবে তুলে ধরা।
Copyright 2026 NGTV News. All rights reserved
No Comments